মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

যুগসন্ধিকালে বিশ্ব মুসলিমের কর্মকৌশল কী হওয়া চাই?

আবু সাঈদ
প্রকাশিত: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম

শেয়ার করুন:

said
আবু সাঈদ। ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীতে আটশ কোটির উপরে মানুষ। এর মধ্যে মাত্র সোয়া দুশো কোটি মুসলমান। এই সংখ্যা শুধু মৌলবাদী বা প্র্যাক্টিসিং মুসলিমের না। বরং শিয়া-সুন্নি, খারেজি-ওয়াহাবি, মৌলবাদী-মডারেট, ফাসেক-ফাজের সালাফি-আহলে হাদিস, দেওবন্দি ও অন্যান্য ঘরানার সব মিলিয়ে। আজও বিশ্বে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। অনুসারীর সংখ্যার বিবেচনায় দ্বিতীয় পর্যায়ে আছে ইসলাম। বিশ্বে স্বাধীন দেশ আছে প্রায় দুশো। এর মধ্য থেকে একটিও পূর্ণাঙ্গ ইসলামি রাষ্ট্র নেই। মাত্র পঞ্চাশটি দেশে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ। অর্থাৎ মোট জনগোষ্ঠীর ৫০% এর বেশি মুসলমান। এই দেশগুলোর বেশির ভাগই আবার আয়তনে খুবই ক্ষুদ্র। খেলাফত আমলে যেগুলো ছিল একেকটি গ্রামের পর্যায়ে। এই যে ছয় শ কোটি মানুষ অমুসলিম; তাদের দেশ, পরিচয়, ধর্ম, দর্শন, ভিন্ন ভিন্ন হলেও ইসলাম বিরোধিতায় বা ইসলামকে নির্মূলে তারা সবাই কিন্তু এক ও অভিন্ন। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘গোটা কুফুরি শক্তি এক জাতিভুক্ত’। ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড গ্রাস করেছে ইসরাইল। আল আকসাও তাদের দখলে। কাশ্মীর জ্বলছে যুগের পর যুগ। আরাকানে জাতিগত উচ্ছেদ হয়েছে। উইঘুরে মুসলমানরা নির্যাতিত হচ্ছে। এভাবে বিশ্বের সর্বত্রই আমরা বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত।

এই যখন অবস্থা, তখনও আমরা নিজেদের মাঝে পরস্পরে মারামারি, বিরোধ, কাঁদা ছোড়াছুড়ি, ভুল ধরাধরি, সমালোচনা, অ্যাটাক, কাউন্টার অ্যাটাক, দলবাজি, মুখোশ উন্মোচন ইত্যাদি মানসিক সঙ্কীর্ণতায় লিপ্ত। শত্রুর কি অভাব পড়েছে ভাই? এত এত শত্রু রেখে ঘরের মানুষকে পর করার চেষ্টায় কেন আমরা নিজেদের শক্তি ক্ষয় করছি। আপনার নজর যদি থাকে সঠিক প্রতিপক্ষ, বড় শত্রু ও ইসলামের বাইরের দুশমনের দিকে, তাহলে দেখবেন ‘মুসলমান’ শব্দটা বলা যায় যাদের ক্ষেত্রে, তাদের সাথে আপনার মতভেদ আছে; কিন্তু শত্রুতা নেই। চিন্তার ভিন্নতা আছে; তবে বিভেদ নেই। কারণ মতভিন্নতার পরেও এরা সবাই মুসলমান। সবারই সামনে রয়েছে কমন এক বৃহৎ শত্রুগোষ্ঠী।


বিজ্ঞাপন


কেমনে নির্ণয় করবেন, আপনার আসল প্রতিপক্ষ কে? কায়দা বলে ‘বিপরীত জিনিস দ্বারা একটি জিনিসের সঠিক পরিচয় নির্ণিত হয়’।  (تعرف الأشياء بأضدادها)। ইসলামের বিপরীত শব্দ কুফুর। তাওহিদের বিপরীত শব্দ শিরিক। অতএব যে কুফুর বা শিরিকের শিবিরে আছে সেই একজন মুসলমানের প্রকৃত প্রতিপক্ষ। যারা কাফের বা মুশরিক না, তাদের সাথে কোনো বিষয়ে আপনার মতভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু ইসলাম ও তাওহিদের প্রশ্নে তারা আপনার মূল প্রতিপক্ষ নয়। কুফুর ও শিরকের পর্যায়ের শত্রুতা বা ঘৃণা ওই ব্যক্তির সাথে রাখা যাবে না, যে কাফের বা মুশরিক নয়।

আপনি যখন নির্ণয় করতে পারবেন আপনার প্রধান প্রতিপক্ষ কে, তখন আপনার শক্তি, আপনার শত্রুতা সব জমা থাকবে এবং প্রয়োজনে ব্যবহৃত হবে শুধু সেই প্রধান প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। আপনার দেশের বাইরের শত্রুর ব্যাপারে যদি সঠিক জ্ঞান থাকে, তাহলে দেশের নাগরিক সবাইকেই বন্ধু মনে হবে। জ্ঞান বল, অস্ত্র বল ও অর্থ বলের ব্যবহার হবে কেবল মুসলিমদের বিরুদ্ধে সক্রিয় অমুসলিমদের বিনাশে। নিজেদের পরস্পরের বিরুদ্ধে এসব অস্ত্র ব্যবহার করে শক্তির ক্ষয় হবে না। কুদস বিজেতা সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রহ. সবসময় বলতেন, ‘আমি আমার যাবতীয় শক্তি ও শত্রুতা সঞ্চয় করে রাখতে চাই ক্রুসেডারদের জন্য।’ এজন্য তিনি কোনো মুসলিম ফেরকার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতেন না। এটাকে শক্তির অপচয় মনে করতেন।

আসল শত্রু ও প্রধান প্রতিপক্ষ নির্ণয় করতে না পারার ফলাফল কী হয়, তা ওঠে এসেছে জাহেলি যুগের চিত্র সম্বলিত একটি কবিতায়। কবি বলেন, أحيانا على بكر أخينا، إذا لم نجد إلا أخانا ‘আমাদের শত্রুতার নেশা, রক্ত পিপাসা এবং বিরোধিতার প্রবণতা এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে, সামনে কোনো শত্রু না থাকলে স্বগোত্রীয় ভাইদেরকেই দুটি পক্ষ বানিয়ে যুদ্ধের পিপাসা নিবারণ করতাম’। আগুন সবসময় জ্বালানি চায়। পোড়ার জন্য। ভস্ম করার জন্য। জ্বালানি না পেলে আগুন নিজেকেই জ্বালানি বানিয়ে পুড়তে থাকে। فالنار تأكل بعضه إن لم تجد ما تأكله ‘মনের উপনিবেশ মনের মুক্তি’ বইয়ে মুসা আল হাফিজ এর এক বক্তব্যেও বিষয়টি ওঠে এসেছে। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতা এবং শক্তি সবসময় প্রতিপক্ষ চায়। সে চায় পৃথিবীতে কৃত্রিমভাবে হলেও উত্তেজনা জিইয়ে রাখতে। আর উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন প্রতিপক্ষ। তাই সে কাউকে না কাউকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করায়। প্রতিপক্ষ না পেলে ছায়ার সাথে যুদ্ধ করে। যুদ্ধ ও শক্তিবাজি সাম্রাজ্যবাদের রুটিন কর্মসূচি।’

আরও পড়ুন

ইসলামফোবিয়া: ঘৃণা ও বৈষম্যের এক বিশ্বব্যাপী সংকট

তো মূলত দেখার বিষয়, আপনার নজর এবং দৃষ্টি। আপনার নজরটা কোথায়? কাছে নাকি দূরে? আপনি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নাকি সংকীর্ণ দৃষ্টির মানুষ? ইসলামের বাইরের মূল প্রতিপক্ষের দিকে যদি আপনার নজর থাকে, তার আক্রমণ ও অনিষ্টতার ব্যাপারে যদি আপনার ধারণা থাকে, তাহলে দেখবেন, নিজেদের পারস্পরিক ভেদাভেদ দূর হয়ে গেছে। বৃহৎ শত্রুর মোকাবিলায় নিজেদের মতভিন্নতাকে তুচ্ছ ও নস্যি মনে হচ্ছে। عند الحفيظة تذهب الأحقاد পিঠ বাঁচানোর প্রয়োজন দেখা দিলে নিজেদের মধ্যকার শত্রুতা দূর হয়ে যায়। তখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে শত্রুর মোকাবিলাই মুখ্য হয়ে ওঠে। বিপদাপদ বিপদগ্রস্তদের এক কাতারে দাঁড় করায়। إن المصائب تجمع المصابين। তবে বিপদ চলে আসার আগেই বিপদগ্রস্ততার অনুভূতি নিয়ে যারা ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে বা ঐক্যবদ্ধ থেকে বিপদ মোকাবিলা করে; তারাই তো প্রকৃত বুদ্ধিমান।

RR1

আমরা এখন একটি যুগসন্ধিকালে অবস্থান করছি। এই সময়ে আমাদের সামনের পথচলা খুবই সুচিন্তিত ও পরিকল্পিত হওয়া চাই। ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধে এমন কর্মপন্থা গ্রহণ করা চাই, যার কারণে পরবর্তীতে আর মানুষকে জুলুম-নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হতে না হয়। এদেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ বটে। লেবাসে-পোশাকে কিংবা বংশপরিচয়ে মুসলমানের সংখ্যা অনেক হলেও ধর্মের জন্য নিবেদিত প্রাণ এবং ঈমানী শক্তিতে বলীয়ান মুমিনের সংখ্যা খুবই কম। আবেগি মানুষ বেশি। বিবেকবান কম। যেকোনো ইস্যুতে স্লোগান প্রদান আর মাঠ গরম করার লোকের অভাব পড়বে না। কিন্তু প্রতিকূলতার সময়ে বুক টান করে সীসা ঢালা প্রাচীরের মতো অটল ও অবিচল থাকার মতো নির্ভীক দুঃসাহসী লোক খোঁজে পাওয়া যাবে না। তাই নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নিয়েই অগ্রসর হতে হবে।  قدر لرجلك قبل الخطو موضعها + فمن علا زلقا عن غر زلج.  ‘কদম ফেলার আগে পায়ের নিচের মাটি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নাও, কারণ পিচ্ছিল পথ বেয়ে ওপরে ওঠার ক্ষেত্রে যে অন্যমনস্ক থাকে সে আছাড় খায়।’ অতএব বুঝেশুনে খুব সতর্কতার সাথে কদম বাড়াতে হবে।

বিজাতীয় সংস্কৃতি, পশ্চিমা প্রভাব ও ওরিয়েন্টালিজমের অব্যাহত প্রচার-প্রচারণার কারণে মানুষ ইসলামি মৌল বিশ্বাস এবং চেতনা থেকে দূরে সরে গেছে অনেক। এরসাথে যুক্ত হয়েছে জাগতিক মোহ, ক্ষমতার প্রভাব। এতদূর থেকে ইচ্ছা করলেই জাতিকে এক লাফে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম বা ইসলামের তাকওয়ার স্তরে প্রবেশ করানো সম্ভব নয়। এর জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সাধারণ-বিশেষ সর্বশ্রেণির মধ্যে ইসলামি জাগরণ সৃষ্টি করতে হবে। এই উদ্দেশ্যে ৫০ বছরের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ভিশন ঘোষণা করতে হবে। এসব বিষয়ের সাথে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। মক্কা বিজয়ের মতো ‘ফাতহে মুবিন’ এর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সারাবিশ্বেই মুসলিমদের মাঝে আজ আদর্শ নেতৃত্বের খরা চলছে। তাদের সামনে কোনো নেতা নেই। নেই কোনো দরদি অভিভাবক। নেই সুপরিকল্পিত লিডারশিপ। ফলে রাখালবিহীন বিরাট ভেড়ার পাল থেকে সিংহের বা বাঘের নির্বিঘ্নে শিকার বধ করার মতোই প্রতিপক্ষরা মুসলমানদেরকে একে একে ঘায়েল করছে।

আরও পড়ুন

ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্ব শক্ত অবস্থান নিতে পারে না কেন?

অতএব, ঘরানার মাঝে আটকে না থেকে গণমুখী হোন। মানবসেবা ও গণমানুষের সমস্যা-সুবিধাকে বিবেচনায় রাখুন। ভাষণ সর্বস্বতা বর্জন করুন। ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠে জাতীয় স্বার্থ, সমস্যা ও প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিন। উদার হোন! ইতিবাচক ভাবতে শিখুন! মানবতার কল্যাণে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করুন! দুঃসংবাদ নয়; সুসংবাদ দিন! কঠিন নয় সহজ করুন! নিষেধাজ্ঞা বা প্রতিরোধ নয় বরং মন্দকে ভালো দ্বারা প্রতিহত করুন! দূরে সরানো নয়, মানুষকে কাছে টানুন! আপন করে নিন। ভালোবাসা দিয়ে মন জয় করুন! মানুষকে মানুষ ভাবুন! অতিমানব নয়। তাহলে তার ভুলটা অস্বাভাবিক কিংবা ক্ষমার অযোগ্য মনে হবে না। ছোটখাটো বিষয়কে কেন্দ্র করে বিচ্ছিন্নতার পথ বেছে না নিয়ে বৈচিত্রের মাঝেই ঐক্য খুঁজুন! অন্যের গুণটা দেখুন! নিজের দোষের দিকে নজর দিন! আতঙ্ক না ছড়িয়ে মানুষকে অভয়ের বাণী শোনান।

লেখক: মুহাদ্দিস, মাদরাসা দারুর রাশাদ, মিরপুর; এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর