বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

যুক্তরাষ্ট্রের পথেই হাটছে রাশিয়া, একই পথে চীন?

জাকির মজুমদার
প্রকাশিত: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম

শেয়ার করুন:

যুক্তরাষ্ট্রের পথেই হাটছে রাশিয়া, একই পথে চীন?

সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্বের উপনিবেশিক আগ্রাসনের দিকে সরাসরি পা বাড়াচ্ছে। যদিও এই সম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র বিশ্বের অনেক দেশেই ছায়া উপনিবেশ গড়েছে। তবে এবার মনে হয় যুক্তরাষ্ট্র কোনো রাগঢাক না করেই সোজাসাপটা তার সম্রাজ্যের বিস্তৃতি অথবা নব্য উপনিবেশ গড়তে মাঠে নেমেছে।  

খ্রিষ্টীয় নববর্ষের শুরুতে দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় প্রাণঘাতি সামরিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ৩ জানুয়ারি ২০২৬ রাতে সামরিক অভিযান চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক গ্রেফতার করে তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রে তুলে এনে বন্দি করা হয়েছে। 


বিজ্ঞাপন


ট্রাম্প আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে রাগঢাক না করেই বলেছে, ভেনেজুয়েলা আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে। তারাই দেশটি চালাবে। ভেনেজুয়েলায় রয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহত তেলভান্ডার। ট্রাম্প বলেছে, এটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের অধীন। তার দেশের কোম্পানি এই তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রক। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্রশাসনও অনেকটা সাজিয়ে ফেলেছে ট্রাম্প।  

ট্রাম্পের দৃষ্টি এবার দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্র কলোম্বিয়া ও কিউবার দিকে। গ্রিণল্যান্যান্ডও যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন বলে আবারও ট্রাম্প মিডিয়াকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা অভিযানের পরদিন ৪ জানুয়ারি কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর নেতৃত্বে কলম্বিয়া একজন “অসুস্থ মানুষের” দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। 

এদিকে কিউবা প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, দেশটির বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন নাও হতে পারে, কিউবা নিজস্ব দুর্বলতার জন্যই ভেঙে পড়বে। কারণ, ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নির্ভরশীল কিউবা এখন বড় সংকটে পড়েছে। ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অনেক কিউবান–আমেরিকান এই পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট হবেন।

ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে আসলে বিশ্বকে কি বার্তা দিচ্ছে। ভেনেজুয়েলার পর সত্যিই যদি কলম্বিয়া, কিউবা এবং গ্রিনল্যান্ডে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করে বসে, তবে নিশ্চিত বিশ্ব নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। বলতে গেলে ঘোষণা দিয়ে আনুষ্ঠানিক আগ্রাসন, সম্রাজ্যবাদের পুরোনো কালো ছায়া বিশ্বকে আবার ঘিরে ধরবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বের উপনিবেশ ফেরার সন্ধিক্ষণই কী গুণছি আমরা? সবলরা দুর্বলের উপর আগ্রাসন চাপিয়ে দেয়ার এই যে নজীর, তা আবারও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে যাচ্ছে? 

দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা গ্রহণের পরই কানাডা এবং গ্রিণল্যান্ড নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য ও তৎতপরতা দেখান ডোনাল্ড ট্রাম্প। কানাডাকে যুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেন তিনি। কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। প্রকাশ্যে এক প্রেস কনফারেন্সে কানাডার প্রতি ইঙ্গিত করে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘কৃত্রিম সীমান্ত থেকে মুক্তি নিন। এরপর দেখুন বিষয়টি দেখতে কেমন লাগে। বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বেশ ভালো হবে। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র এক হবে’।

ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড নিয়েও ট্রাম্প তার পরিকল্পণার কথা তখন প্রকাশ্যে এনেছিলেন। তিনি গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের ইচ্ছার কথা জানান। বলেছেন, ‘আর্কটিক দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ’। ভেনেজুয়েলায় সফল হামলা করে দেশটির প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক তুলে আনার পর ট্রাম্প এবার বলেই দিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড তার লাগবেই।  

মেক্সিকোর প্রতিও ডোনাল্ড ট্রাম্পের রয়েছে শ্যেন দৃষ্টি। সুযোগ পেলেই মেক্সিকোকে শাসান ট্রাম্প। গত বছরের আগস্ট মাসে মাদকের ধুয়া তুলে মেক্সিকোতে সামরিক অভিযান চালানোর সরাসরি হুমকি দেন তিনি। এ নিয়ে মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র বাকযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এরপর মেক্সিকোর উপর অভাবনীয় শুল্ক আরোপ করে দেশটিকে কোনঠাসা করারও উদ্যোগ নিয়েছিলেন ট্রাম্প। 

যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর সীমান্তজুড়ে অবস্থান কানাডার। পূর্ব-উত্তরে রয়েছে গ্রিনল্যান্ড। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্ত সংলগ্ন রাষ্ট্র মেক্সিকো। মেক্ষিকোর দক্ষিণে রয়েছে কলোম্বিয়া, পূর্বে কিউবা। আর ভেনেজুয়েলার অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোর দক্ষিণ ও পূর্বে। 

তবে কি যুক্তরাষ্ট্র তার সীমান্তের বিস্তৃতি উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার উল্লেখিত দেশগুলো পর্যন্ত পৌছাতে চাচ্ছে? অথবা নব্য উপনিবেশ গড়ার চেষ্টায় আছে? দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর ট্রাম্পের সার্বিক তৎপরতায় এমনটিই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সর্বশেষ ভেনেজুয়েলায় সামরিক আগ্রাসন এবং কিউবা ও কলম্বিয়ার প্রতি ট্রাম্পের হুমকি সেই সম্ভানাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। 

যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের দৃষ্টতা, আস্ফালন বিশ্বের অন্য পরাশক্তিগুলোকে উৎসাহিত করলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং অভিযানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া যতটা জোরালো হওয়ার কথা তেমনটি দেখা যায়নি। বিশেষ করে চীন, রাশিয়া নিয়ম রক্ষার বিবৃতি দিয়েছে। এই দুই পরাশক্তিও তাদের সম্রাজ্য বিস্তৃতির বিষয়ে নিষ্প্রভ নয়। রাশিয়া হয়তো ইউক্রেনের সমৃদ্ধ দুই বৃহৎ অঞ্চল দোনেৎস্ক ও লুহানস্ককে নিজেদের করে নিতে ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে ততটা সরব নয়। অথচ ভেনেজুয়েলা রাশিয়ার ঐতিহাসিক মিত্র। এদিকে ক্রিমিয়া আগেই নিজেদে করে নিয়েছিলো রাশিয়া। 

গত বছরের আগস্টে আলাস্কায় পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প বলে দিয়েছেন, ‘প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি চাইলে মুহূর্তের মধ্যেই রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে পারেন অথবা লড়াই চালিয়ে যেতে পারেন।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘ক্রিমিয়া ফেরত পাওয়া যাবে না। ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদানও সম্ভব নয়। কিছু জিনিস কখনোই বদলায় না!’ 

ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক নিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন পুতিন। বিনিময়ে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় কিছু এলাকার নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাব করেন। সেই প্রস্তাবে সম্মত হয়েছিলেন ট্রাম্প। ট্রাম্প বলেছেন, ‘ইউক্রেনের ভূমি ভাগাভাগি ও নিরাপত্তাজনিত নিশ্চয়তা নিয়ে পুতিনের প্রস্তাবে ‘বড় ঐকমত্য’ হয়েছে।’যদিও তখন জেলেনস্কি পুতিনের ওইসব প্রস্তাব অগ্রাহ্য করেছে। 

গত আগস্টের পর বর্তমান সময় পর্যন্ত মনে হচ্ছে পুতিন দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক তো বটেই তার দখল করা ইউক্রেনের বৃহৎ অংশ না ছাড়তেই ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে সরব নয়। হতে পারে- এ নিয়ে বন্ধু ট্রাম্পের সঙ্গে পুতিনের অপ্রকাশ্য সন্ধিও হয়েছে। 

এদিকে ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে চীনের ভূমিকাও একই? চীন-ভেনেজুয়েলা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক দিক থেকে দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ক অনেক শক্তিশালী। অথচ ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা নিয়ে চীনের তৎপরতাও ম্রিয়মান। 

ভেনেজুয়েলাকে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র করায়ত্ব করেছে, তবে কি হংকং ও তাইওয়ানের ভাগ্যও তেমন কিছু রয়েছে? চীন বরাবরই হংকং ও তাইওয়ানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এখন আমেরিকার পথ ধরে চীন সেখানে আগ্রাসন চালালে অবাক হওয়ার কিছু নেই। মনে হতেই পারে সকল পরাশক্তির মধ্যে প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য সম্রাজ্য বিস্তৃতি, উপনিবেশ স্থাপনের অলিখিত চুক্তি হয়ে থাকতে পারে। এমনটি হলে ভেনেজুয়েলা নিয়ে চীন ও রাশিয়া কেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঝামেলা পাকাতে যাবে?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আগ্রাসন, সাম্রাজ্যবাদের বিস্তৃতি, উপনিবেশিক আধিপত্য বিস্তাররোধে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। আত্মমর্যাদা, মানবাধিকার, সার্বভৌমত্বের ধারণা, আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো, কুটনৈতিক চ্যানেলকে শক্তিশালী করা হয়। যার সূতিকাঘার জাতিসংঘ। কিন্তু বিগত শতাব্দির নব্বই দশকের পর যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং ন্যাটো বারবার তা লঙ্ঘন করেছে। 

বিভিন্ন দেশে আগ্রাসন চালিয়েছে। নিজেদের পছন্দমতো শাসক বসিয়েছে। ইরাকে বানোয়াট-মিথ্যা অজুহাতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেনের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো। 

একবিংশ শতাব্দির শুরুতে আফগানিস্তান হয়ে লিবিয়ার মতো বেশ কয়েকটি দেশে হামলা করে তারা। সরকার উচ্ছেদ করে পশ্চিমারা নিজেদের অনুগতদের বসায়। ফিলিস্তিনের ওপর ইতিহাসের ভয়াবহতম বর্বরতা চালায় যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেন সমর্থিত ইসরাইল। ক্রিমিয়ার দখলের পর ইউক্রেনে হামলা চালায় রাশিয়া। 

এখনও যুদ্ধ চলছে। সর্বশেষ ভেনেজুয়েলাকে কব্জা করলো যুক্তরাষ্ট্র। এতসব আগ্রাসনের বিপরীত জাতিসংঘ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারিনি। জাতিসংঘ যে শক্তিশালীর বিপরীত একটি কাগজে বাঘ, তা ফের সামনে এসেছে।

জাকির মজুমদার: সাংবাদিক, সংগঠক

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর