কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে একটি বছর ২০২৫। গত বছরের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির হিসাব নতুন বছরের পরিকল্পনাকে আরও উজ্জীবিত করবে- এমন ভাবনাকে পুঁজি করে বিশ্বের সব জাতি-গোষ্ঠীর মানুষ আশাবাদী হয়ে নতুন বছরকে (২০২৬) বরণ করে নিয়েছে। সবাই খ্রিস্টীয় ২০২৬ সালকে বরণ করেছে আনন্দ-উল্লাসে। নতুন নতুন স্বপ্নের খোঁজে স্বপ বাজরা ছক আঁকছেন উন্নত জীবন আর সামগ্রিক সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে ন্যায়বিচার, প্রতিটি মানুষ ফিরে পাবে তার কাঙ্ক্ষিত অধিকার-এমন প্রত্যাশা আজ সবার মনে। সত্যিকারের দেশপ্রেমিকের কর্মঠ হাতের ছোঁয়ায় আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ সমৃদ্ধিতে ভরে উঠবে- সেই কামনায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা হোক আমাদের স্বপ্নের বাস্তবায়নে।
বিদায়ী ২০২৫ সাল বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি (প্রায় ১২-১৬%), এবং দুর্বল জিডিপি প্রবৃদ্ধি (প্রায় ২.৩%-৪%) সত্ত্বেও ঘুরে দাঁড়ানোর বছর, যেখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, স্টার্টআপ এবং প্রবাসী আয় ছিল আশার আলো, কিন্তু আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ; আগামী দিনে অর্থনীতিকে টেকসই করতে হলে শক্তিশালী সংস্কার, সুশাসন, এবং রফতানি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে, বলছে বিভিন্ন বিশ্লেষণ।
বিজ্ঞাপন
চ্যালেঞ্জ: ২০২৬ সাল বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এক চ্যালেঞ্জের বছর হবে। একদিকে গণতন্ত্র পুনর্গঠনের প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ নির্বাচন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, প্রশাসনের রাজনীতিকরণ মুক্তকরণ। অন্য দিকে পুরনো শক্তির পুনর্বিন্যাস, নতুন জোট, ক্ষমতার অদৃশ্য কেন্দ্রের সক্রিয়তা। এছাড়া ২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ক্ষমতা কি সত্যিই জনগণের কাছে ফিরছে, নাকি শুধু হাতবদল হচ্ছে? রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা: ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অর্থনীতি ছিল ভঙ্গুর, যা প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়: বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনধারণ কঠিন করে তুলেছে, যা প্রায় ৯-১৬% পর্যন্ত ছিল।
দুর্বল জিডিপি প্রবৃদ্ধি: প্রবৃদ্ধি আশানুরূপ ছিল না, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে যথেষ্ট ছিল না।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ: বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হল বৈদেশিক খাত। স্বৈরাচারী সরকারের আমলে রিজার্ভের পরিমাণ কমে যাওয়ায় ব্যালেন্স অফ পেমেন্টসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। ২০২৫ সালে ৩২.৮ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স অর্জন যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ তথাপিও হুন্ডি নিয়ন্ত্রণ ওপ্রনোদনা নীতির কারণে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়লেও মধ্যপ্রাচ্য ওইউরোপের শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা ওঝুকি রয়েছে।
বিজ্ঞাপন

ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা: রাজনৈতিক প্রভাব ও খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতকে নাজুক করে তুলেছিল, যদিও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিগত সময়ে খেলাপি ঋণের মাত্রা বাড়তে থাকায় ব্যাংক খাতে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালের শেষে মোট ঋণ দাঁড়ায় ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, অর্থাৎ ৩৫.৭৩ শতাংশ। ২০২৪ সালের একই সময়ে খেলাপি ঋণ ছিল মোট ঋণের ১৬.৯৩ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, ঋণ পুনঃতফসিল ও বিশেষ সুবিধা কমে যাওয়ায় প্রকৃত খেলাপি ঋণ প্রকাশ পেয়েছে। বিগত স্বৈরাচারী আমলে নানা কৌশলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল করে রাখা হয়েছিল। তবে ২০২৬ সাল ব্যাংকিং খাতের জন্য পরীক্ষার বছর। খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবিত ঋণ বিতরণ এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এখনো বড় সমস্যা।
আমদানি ব্যয় ও বাণিজ্য ঘাটতি: রফতানির তুলনায় আমদানি ব্যয় বেশি থাকায় চাপ ছিল। প্রতি বছরই আমাদের আমদানি রপ্তানির চেয়ে বেশি থাকে। তাই বানিজ্য ঘাটতি ক্রমাগত বাড়তে থাকে। এটা উত্তোরণ বা সমন্বয় করা একটি চ্যালেঞ্জ বটে।
সম্ভাবনা: ক্ষুদ্র, মাঝারি শিল্প ও স্টার্টআপ: তরুণ উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে।
প্রবাসীদের আয়: রেমিট্যান্স প্রবাহ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার চেষ্টা: সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক খাত সংস্কারে কাজ করছে, যা অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে পারে। ২০২৬ সাল নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চাপ হল মূল্যস্ফীতি। ২০২৫ সালে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। যদিও ২০২৪-২৫ সালের তুলনায় মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমেছে তবুও নিন্ম ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রকৃত আয় এখনো চাপের মুখে।
রফতানি বহুমুখীকরণ: পোশাক শিল্পের পাশাপাশি অন্যান্য খাতের রফতানি বৃদ্ধিতে সম্ভাবনা রয়েছে। রফতানি আয় শুধু পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভর করলে অর্থনীতি কখনো গতিশীল থাকবে না। রপ্তানিতে বহুমুখী করনের নানা সমস্যা চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছেন। এসব চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করে চা শিল্প, চামড়া শিল্প, পাদুকা শিল্প,ঔষধ ও কৃষি ও হালকা প্রকৌশল খাত প্রসারে গতি আনতে হবে।
কৃষি ও প্রযুক্তি: কৃষি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও উন্নয়নের বড় সুযোগ রয়েছে। কৃষিতে যান্ত্রিকতার প্রাধান্য বাড়াতে হবে। কৃষি পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ উন্নত ও যুগোপযোগী করতে হবে। সরকারি ঋণ ও বাজেট চাপ: ২০২৬ সালে সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের কিস্তি পরিশোধের চাপ তো রয়েছেই তাছাড়া দেশীয়- অভ্যন্তরীণ ঋণ, ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশ চলে যাচ্ছে ঋণ পরিশোধে ও ঋণের সুদ প্রদানে।
আগামীর পথ: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য এটি অপরিহার্য। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যেসকল সংস্কার ও পরিশুদ্ধকরণের পদক্ষেপ শুরু করেছিল তা প্রয়োজন মাপিক বাস্তবায়ন করা উচিত।
আর্থিক ও রাজস্ব খাতের সংস্কার: কর ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি জনগনকে নিয়মিত কর প্রতিশোধে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। রাজস্ব আহরণে স্বচ্ছতার পরিচয় দিতে হবে।
মানবিক পুঁজি ও কর্মসংস্থান: শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা জরুরি। ২০২৬ সাল কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বেকারত্ব নিরসনের এক চ্যালেঞ্জের বছর। সকল রাজনৈতিক দল বেকারত্ব হ্রাস ও কর্মসংস্থানের বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন এতো সহজ নয়। এজন্য দেশে কৃষি ও শিল্প বিকাশে আরও মনোযোগী হতে হবে।
আমদানি বিকল্প এবং রফতানি বৃদ্ধি: দেশীয় শিল্পকে শক্তিশালী করে আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং রফতানি বাজার সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।

মোটকথা, ২০২৫ সাল ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি কঠিন কিন্তু ঘুরে দাঁড়ানোর বছর, যেখানে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আগামী দিনের টেকসই উন্নয়নের সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। আর রাজনৈতিকভাবে ২০২৬ সাল একটি পরীক্ষার বছর। একদিকে গণতন্ত্র পুনর্গঠনের প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ নির্বাচন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, প্রশাসনের রাজনীতিকরণ মুক্তকরণ। অন্য দিকে পুরনো শক্তির পুনর্বিন্যাস, নতুন জোট, ক্ষমতার অদৃশ্য কেন্দ্রের সক্রিয়তা ও নানা ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিতও লক্ষনীয়। জনগনের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া নানা প্রশ্নের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি প্রশ্ন হল আগামীর অর্থনীতি কি আগের মতো ভোগনির্ভর ও ঋণনির্ভর পথেই হাঁটবে, নাকি উৎপাদনশীলতা, মানবসম্পদ ও ন্যায়ভিত্তিক বণ্টনের দিকে অগ্রসর হবে? ২০২৬ সাল সেই দিকনির্দেশ নির্ধারণের বছর। কাজেই সচেতন জনগনের দেশ নিয়ে, দেশের অর্থনীতি নিয়ে চিন্তার সময় এসেছে। ২০২৬ সালে দেশের অর্থনীতি কি নিজস্ব কৌশলগত সত্তা নিয়ে দাঁড়াতে পারবে, নাকি বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার ভেতর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।
বিগত ষোল বছরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি জটিল অবস্থার মধ্যে অতিবাহিত হলেও সাহস করে কেউ এর কেউ তা সমাধানের জন্য বলতে পারতোনা। সাহস ও দেশপ্রেমের ঘাটতিই এর অন্যতম কারন। তখন বলা হয়েছিল, মূল সমস্যা সামস্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। এই ফাঁকে নতুন করে এসেছে আরও দুই সমস্যা। তা হচ্ছে দায়দেনা পরিশোধের ঝুঁকি এবং প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে যাওয়া।’
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর অর্থনীতিতে সংস্কার ও পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বর্তমান সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও বেসরকারি খাতে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসেনি, এখনো বিরাজ করছে অস্থিরতা। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বিনিয়োগ। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক গন মনে করেন চলমান ২০২৫- ২০২৬ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতিকে তিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এগুলো হচ্ছে-উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক চাপ এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা। মূল্যস্ফীতি কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রাজস্ব আদায় করা সম্ভব না হলে বহু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। বিদ্যমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেই বোঝা যায় দেশের অর্থনীতি এখনো কতটা চাপে রয়েছে।
জানা যায়, গত এক বছরে আর্থিক খাতে সরকারের নেওয়া নানামুখী সংস্কার কার্যক্রম চলমান। এর সুফল এখনো দেখা যাচ্ছে না। তবে চলতি অর্থবছরেই তা সামনে আসতে পারে। মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণ, অর্থ পাচার রোধ, ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা আনাসহ গত এক বছরে বর্তমান সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের সুফল চলতি অর্থবছরে দৃশ্যমান হতে পারে।
জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য বেকারত্ব কমানো। কর্মসংস্থান বাড়াতে বর্তমান সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের সুফল এখনো দৃশ্যমান নয়। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়েনি, শিল্প খাতে মন্দা এখনো প্রকট। তবে গড়ে শিল্প থেকে উৎপাদন বাড়তে শুরু করেছে। এদিকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ যথেষ্ট কম। মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়েনি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি বাড়ানোর সঙ্গে এগুলো সম্পর্কিত।
লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ব্যাংকার

