সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

সোমালিল্যান্ড: ইতিহাস, বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ

বিপ্লব চন্দ্র ঘোষ
প্রকাশিত: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম

শেয়ার করুন:

sumaliland
সোমালিল্যান্ডের ম্যাপ ও লেখক। ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতির ইস্যুকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট ও কৌশলগত অবস্থান হয়ে দাঁড়িয়েছে। সোমালিল্যান্ড একটি আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে স্বপ্রকাশ করেছে, কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে স্বীকৃতি পায়নি। এটা আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলের একটি ভূখণ্ড, যা আনুষ্ঠানিকভাবে কখনোই স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত নয়। তারপরও প্রায় ৩৪ বছর ধরে এটি স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে।

২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ইতিহাসের প্রথম দেশ হিসেবে ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।


বিজ্ঞাপন


ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দিয়ে একটি কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, বিশেষত লাল সাগর ও আন্তর্জাতিক সমুদ্র পথ নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও কৌশলগত উপস্থিতির জন্য।

বেশির ভাগ আরব লীগ ও মুসলিম সংস্থা ইসরায়েলের এই স্বীকৃতিকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং এটিকে আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছে।

২. ইতিহাস ও রাজনৈতিক জার্নি:

২.১ ভারতের ব্রিটিশ আমলে স্বাধীনতা ও সংযুক্তি:


বিজ্ঞাপন


১৯৬০ সালের ২৬ জুন, ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকা সনেটি (Somaliland Protectorate) স্বল্পসময় জন্য স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। পরের দিনই এটি সোয়ালিকভূমি নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত হয় এবং ১ জুলাই ১৯৬০ এ সমরিল্যান্ডকে সমর ইউনিয়নের সঙ্গে মিলিয়ে সোমালি গণপ্রজাতন্ত্র গঠন করা হয়।

২.২ পুনরুজ্জীবন ও স্বাধীনতার ঘোষণা:

১৯৯১ সালে সোমালিল্যান্ড আবার আলাদাভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং মোঘাদিশুর দুর্ধর্ষ গৃহযুদ্ধের সময় থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজ সরকারের ব্যবস্থা গড়ে তোলে।

এর পরের তিন দশক ধরে এটি কার্যত একটি সম্বিচ্ছিন্ন  (পৃথক বা আলাদা) রাষ্ট্র হিসেবে চলেছে, যদিও জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক কোনো শক্তি এটিকে স্বীকৃতি দেয়নি।

২.৩ গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা:

২০০১ সালে সোমালিল্যান্ড একটি সংবিধান গ্রহণ করে, যা আধুনিক ও ঐতিহ্যগত রাজনীতি মিলিয়ে একটি অনন্য রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করে।

এখানে নাগরিক নেতা, প্রচলিত বয়োজ্যেষ্ঠ পার্লামেন্ট (Guurti) ও নির্বাচিত সরকার-  তিনটি স্তর একসাথে কাজ করে।

২০২৪ সালের নির্বাচনে বিরোধী নেতা আবদিরাহমান মো. আবদুল্লাহী (ইরো) রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, যা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রকাশ্য গণতান্ত্রিক শক্তিকে প্রতিনিধিত্ব করে।

২.৪ অভ্যন্তরীণ সংঘাত:

যেভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করা হয়েছিল কিন্তু সেভাবে সবকিছু মসৃণ ছিল না বা গণতন্ত্রের সমীকরণ অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে না।

২০২৩ সালে লাসঅনড শহরে তীব্র সংঘাত ঘটে যখন স্থানীয় SSC-Khatumo মিলিশিয়ারা সোমালিল্যান্ডের শাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নিয়েছিল।

এই সংঘাত দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে এবং এটি সোমালিল্যান্ডের পূর্বাঞ্চলীয় কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমত্ব সংক্রান্ত বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইতিহাসে সোমালিল্যান্ড অঞ্চলে গণহত্যামূলক সহিংসতা ঘটেছিল, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্বীকৃত বাস্তবতা।

৩. অর্থনীতি: কাঠামো ও চ্যালেঞ্জ:

৩.১ প্রাথমিক অর্থনৈতিক অবকাঠামো:

সোমালিল্যান্ডের অর্থনীতি প্রাথমিকভাবে জীবিকাধারী পশুপালন (Livelistock) ও ডায়াস্পোরা রেমিট্যান্স-এর ওপর নির্ভরশীল। দেশের মোট আয় ও ব্যবসায় প্রায় অর্ধেকই এই দুই মাধ্যম থেকেই আসে।

জিডিপি প্রায় ৭–৮ বিলিয়ন ডলারের আশেপাশে।

যুব বেকারত্ব ও ব্রেন ড্রেইন উল্লেখযোগ্যভাবে উচ্চ।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাবে অপেক্ষাকৃত উচ্চ অর্থনৈতিক চাহিদা ও বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা থাকে; এবং দরকষাকষির মৌলিক বিষয় অনুপস্থিত থাকে।

৩.২ বন্দর ও অবকাঠামো বিন্যাস:

সোমালিল্যান্ডের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো বারবেরা বন্দর, যা ইথিওপিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে উন্নয়নের মাধ্যমে উপকূলীয় বাণিজ্য ও আধুনিক পরিবহন নেটওয়ার্ক হিসেবে ভূমিকা রাখছে।

এই প্রকল্পের সাথে যুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের বড় বিনিয়োগ এবং ইথিওপিয়ার সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে।

৩.৩ সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকট:

শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মৌলিক সেবায় বড় ফাঁক রয়েছে। উচ্চ বেকারত্ব, সীমিত শিক্ষাগত সুযোগ এবং স্বাস্থ্য সেবায় অবহেলা দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

৪. ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক:

৪.১ স্বীকৃতি ও আন্তর্জাতিক উত্তাপ:

জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্র, ইসরায়েল ২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বরে প্রথমবারের মতো সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেয়, যা একটি ঐতিহাসিক ও বিতর্কিত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে অধিকাংশ দেশ।

এই স্বীকৃতি কেনো গুরুত্বপূর্ণ:

সোমালিল্যান্ডের জন্য এটি দীর্ঘসময়ের স্বীকৃতি সংগ্রামের প্রথম বড় সাফল্য। তবে এটি সোমালিয়ার সার্বভৌমত্ব ও অঞ্চলভিত্তিক নিরাপত্তা-কে নস্যাৎ করতে পারে মর্মে অভিযোগ উঠেছে।

৪.২ এই অঞ্চলে শক্তি প্রদর্শন:

সোমালিল্যান্ডের অবস্থান হলো আদেন ও লাল সাগরের কাছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সামরিক কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, চীন, ইথিওপিয়া, সৌদি আরব, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো শক্তিগুলোর অনেক আগ্রহ রয়েছে।

৫. বর্তমান বাস্তবতা:

৫.১ স্বঘোষিত স্বাধীনতা:

সোমালিল্যান্ড প্রায় ৩৪ বছর ধরে নিজ নিজ সরকার, আইন, সশস্ত্র বাহিনী ও নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান গঠনে সফল হয়েছে, কিন্তু তবুও জাতিসংঘ বা অধিকাংশ দেশ দ্বারা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করেনি (এখানে ইসরায়েলের স্বীকৃতির বিষয়টি বিশেষভাবে ব্যতিক্রম)।

Sumaliland2

৫.২ নাগরিক জীবনে উন্নয়ন ও সীমাবদ্ধতা:

আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও মানব উন্নয়ন সূচক কম, শিক্ষার সুযোগ সীমিত, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যথেষ্ট সমস্যা রয়েছে।

৬. ভবিষ্যৎ ফলাফল ও সম্ভাবনা:

৬.১ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও স্থিতিশীলতা:

সোমালিল্যান্ডের কাছে ইসরায়েলের স্বীকৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিগ্রি হতে পারে, যদিও ব্যাপক আন্তর্জাতিক সমর্থন এখনো অনিশ্চিত। যদি আরও দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা স্বীকৃতি দেয়, তাহলে সোমালিল্যান্ডের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে।

৬.২ সংঘাত ও অভ্যন্তরীণ চাপ:

সুল ও সানাাগ অঞ্চল কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, সোমালিল্যান্ড নাকি সোমালিয়ার ফেডারেল কাঠামোর অংশ এবং অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ জিইয়েই রাখবে।

৬.৩ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সম্ভাবনা:

সঠিক বিনিয়োগ, বন্দর ও বাণিজ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতা থাকলে সোমালিল্যান্ডের অর্থনৈতিক ভিত্তি দ্রুত শক্ত করতে পারবে।

তবে এর জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, আর্থিক সহায়তা ও সমন্বিত নীতিমালা অপরিহার্য।

৭. সোমালিল্যান্ড বিষয়ে আমেরিকার মনোভাব:

যুক্তরাষ্ট্র সোমালিল্যান্ডকে এখনো স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। এই অবস্থান জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আফ্রিকান ইউনিয়নের মূলধারার সঙ্গেই সঙ্গতিপূর্ণ।

তবে যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত কারণে ‘সোমালিল্যান্ড দীর্ঘদিনযাবত সোমালিয়ার চেয়ে বেশি স্থিতিশীল’ রয়েছে মর্মে স্বীকার ও প্রচার করে।

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত কারণ হলো সোমালিল্যান্ডের উপকূল বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট, এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমানো, ইরান ও ইয়েমেনের নেটওয়ার্ক নজরদারি করা। এবং যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষভাবে সোমালিল্যান্ডের উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও নিরাপত্তা ইস্যুতে সহযোগিতা ও যোগাযোগ বজায় রেখেছে।

৮. উপসংহার:

সোমালিল্যান্ড আজ একটি অনন্য দেশীয় রাষ্ট্র, যা দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছে।

যদিও এটি জাতিসংঘের অফিশিয়াল স্বীকৃতিতে সীমাবদ্ধতা, তারপরও নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো ও জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ আফ্রিকার অনেক অঞ্চলের তুলনায় উন্নত।

ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা যদি সঠিকভাবে সংগঠিত হয়, তাহলে সোমালিল্যান্ড হতে পারে হর্ন অফ আফ্রিকার একটি স্থিতিশীল, স্বাধীন ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র।

উল্লেখ্য, সোমালিয়া এখনো সোমালিল্যান্ডকে নিজের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে। অন্যদিকে সোমালিল্যান্ড নিজেকে স্বাধীন রাষ্ট্র দাবি করে।

লেখক: ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর