শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ঢাকা

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়ন ও মেধাবী ছাত্রছাত্রী ভর্তির কৌশল

মো. শাকিল আহমেদ
প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর ২০২৫, ০১:১৩ পিএম

শেয়ার করুন:

shakil
মো. শাকিল আহমেদ। ছবি: সংগৃহীত

দেশের উচ্চশিক্ষা খাত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। তবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষায় মেধাবী ছাত্র ভর্তির সংখ্যা এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছেনি। এর প্রভাব পড়ছে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং ক্যাম্পাস কালচারের উপর। এই প্রবন্ধে একটি কৌশলগত পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হলো, যা দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি হতে পারে কার্যকর উপায়।

বর্তমান চ্যালেঞ্জ: কোভিড-১৯ মহামারির সময় ভর্তি সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ইউনেস্কো (২০২৩) অনুযায়ী, ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে (কম্পিউটার সায়েন্স বাদে) ভর্তি হার ২০১৯ সালের তুলনায় ১৫–২০% কমেছে।


বিজ্ঞাপন


বিদেশমুখী ছাত্র: ২০১৩ সালে প্রায় ১৫–১৭% বাংলাদেশি ছাত্র বিদেশে পড়তে গিয়েছিল (ইউকে: ৪,২০৪; ইউএস: ৩,৬৬৪), বছরপ্রতি যার হার বেড়ে চলেছে।

উল্লেখযোগ্য মূল কারণগুলো: কার্যকর মার্কেটিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব, ছাত্র–শিক্ষক–প্রশাসনের মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতি, প্রাণবন্ত ক্যাম্পাস কালচার ও কাউন্সেলিংয়ের অভাব, ইন্ডাস্ট্রি কানেকশন ও আধুনিক প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার। এই চ্যালেঞ্জগুলোই ভর্তি সংকট এবং বিদেশমুখী প্রবণতার জন্য মূলত দায়ী।

প্রস্তাবিত কৌশল

১. পাবলিক রিলেশনস অফিসার (PRO) ও স্টুডেন্ট রিলেশনস অফিসার (SRO) নিয়োগ (বিশ্ববিদ্যালয়–ছাত্র যোগাযোগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে)। সমন্বিত PR স্ট্র্যাটেজি ভর্তির yield rate ১৮% পর্যন্ত বাড়াতে পারে। এবং অ্যালামনাইদের এই পদে নিয়োগ দিলে তারা ছাত্রদের চাহিদা ভালোভাবে বুঝতে পারবেন।


বিজ্ঞাপন


২. স্কুল-কলেজে সেমিনার ও ক্যারিয়ার গাইডেন্স দেওয়া। শিক্ষার্থীদের সামনে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনার সুযোগ, ল্যাব সুবিধা ও ক্যাম্পাস লাইফ তুলে ধরা। সরাসরি ছাত্র–অভিভাবক–শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি।

৩. বিভিন্ন প্রোফাইলের ছাত্রদের জন্য কাস্টমাইজড পরিকল্পনা ,মেধাবী ছাত্র: গবেষণার সুযোগ, প্রতিযোগিতামূলক প্রোগ্রাম ও আধুনিক ল্যাব। মাঝারি ছাত্র: আর্থিক সহায়তা, একাডেমিক সাপোর্ট, ক্যারিয়ার সুযোগ। সৃজনশীল ছাত্র: স্পোর্টস, কালচারাল প্রোগ্রাম ও এক্সট্রা–কারিকুলার কার্যক্রম।

৪. ইন্টার-ইউনিভার্সিটি স্পোর্টস ও কালচারাল ইভেন্ট বাড়াতে হবে যার ফলে ব্র্যান্ড অ্যাওয়ারনেস ১৫–২০% পর্যন্ত বাড়তে পারে। মিডিয়া কভারেজ ও ছাত্রদের আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে।

৫. কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে ভর্তির হার প্রায় ১০% বাড়তে পারে ও ড্রপআউট রেট ২৪.৬% পর্যন্ত কমে।

৬. সোশ্যাল মিডিয়া প্রচারণা ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর কোলাবরেশন করতে হবে কারন ৮৮% ছাত্র ফেসবুক এবং ৮১% ইউটিউব ব্যবহার করে। কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মাধ্যমে ৮০% পর্যন্ত শিক্ষার্থীর আগ্রহ তৈরি করা সম্ভব।

৭. ক্লাব কার্যক্রমের উন্নয়ন যেমন কালচারাল ও স্পোর্টস ক্লাবের জন্য মেন্টর নিয়োগ ও ফান্ডিং বৃদ্ধি।

৮. ইন্ডাস্ট্রি পার্টনারশিপ নিয়ে কাজ করতে হবে, STEM এনরোলমেন্ট মাত্র ৯%।  ইন্ডাস্ট্রি পার্টনারশিপের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি ও চাকরির সুযোগ তৈরি।

৯. আধুনিক প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন ও AI–ভিত্তিক গবেষণা প্রজেক্ট চালু।

১০. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম, যৌথ গবেষণা ও স্কলারশিপ সুবিধা চালু।  UC Merced–এর ফি ওয়েভার প্রোগ্রাম একটি অনুসরণীয় উদাহরণ।

আরও পড়ুন

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অসন্তোষ ও মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার সংকট

বাংলাদেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তি সংকট মোকাবেলায় কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, তবে এখনো অনেক জায়গায় ঘাটতি রয়ে গেছে। বাস্তবে কিছু দিকগুলোতে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বর্তমান অবস্থায় প্রস্তাবিত কৌশল PRO ও SRO নিয়োগ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে নেই, NSU-তে সীমিত আকারে কাউন্সেলিং সেন্টার আছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে PRO ও SRO নিয়োগ করে ছাত্র–প্রশাসন যোগাযোগ বাড়ানো। নিয়মিত কাউন্সেলিং ও অভিভাবক সম্পৃক্তকরণ। স্কুল, কলেজে সেমিনার করা। NSU, IUB, AIUB, BRACU নিয়মিত স্কুল ট্যুর করছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাবী, মাঝারি ও সৃজনশীল ছাত্রদের জন্য পরিকল্পনা কার্যক্রম চালু করা। আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ইভেন্ট আয়োজন করে সব বিশ্ববিদ্যালয়কে যুক্ত করে বড় আকারের আয়োজন। সোশ্যাল মিডিয়া প্রচারণা,কনটেন্ট ক্রিয়েটরের সাথে যৌথ প্রচারণা। ক্লাব কার্যক্রম শক্তিশালী ও দেশের ও দেশের বাহিরের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যৌথ গবেষণা ও স্কলারশিপ প্রোগ্রাম করা।

প্রত্যাশিত ফলাফল

প্রথম বছর: শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বৃদ্ধি, দ্বিতীয় বছর: ভর্তি আশানুরূপ হারে বৃদ্ধি ও তৃতীয় বছর: প্রাণবন্ত ক্যাম্পাস কালচার ও গবেষণায় গতি।

উপসংহার: PRO ও SRO নিয়োগ, সেমিনার, কাউন্সেলিং, সোশ্যাল মিডিয়া প্রচারণা, ইন্ডাস্ট্রি পার্টনারশিপ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা—এসব বাস্তবায়ন হলে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু ভর্তি সংকটই কাটাবে না, বরং গবেষণা, উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক মানেও এগিয়ে যাবে।

তথ্যসূত্র: * UNESCO Institute for Statistics (2023). Higher Education Data – Bangladesh. http://uis.unesco.org

* University Grants Commission (UGC) Bangladesh. Annual Report 2022. http://ugc.gov.bd

* World Bank (2021). Tertiary Education Sector Review: Bangladesh. https://documents.worldbank.org

* NSU Counseling Center – North South University Official Website. http://www.northsouth.edu

* BRAC University, Center for Artificial Intelligence. http://www.bracu.ac.bd

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী

 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর