রোববার, ১৪ জুন, ২০২৬, ঢাকা

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অসন্তোষ ও মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার সংকট

মনজুরুল আলম মুকুল
প্রকাশিত: ২০ অক্টোবর ২০২৫, ০৫:০৮ পিএম

শেয়ার করুন:

mukul
মনজুরুল আলম বকুল। ছবি: সংগৃহীত

সব আমলেই এদেশের মাস্টার বা পণ্ডিত মশাইরা দুর্দশার শিকার। একটা গল্প আছে, ব্রিটিশ আমলে একজন পণ্ডিত মশাই দারুণ কষ্ট পেয়ে ছিলেন যখন তিনি জানতে পারেন তার মাসিক বেতন ও পারিবারিক খরচ স্কুল ইনসপেক্টর সাহেবের কুকুরের পিছনে হওয়া খরচ থেকে অনেক কম। 

 আশা করা হয়ে ছিল ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর পণ্ডিত মশাইদের দুর্দশা থাকবে না। তবে অন্য সব পণ্ডিত মশাইদের কিছু একটা গতি হলেও মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সমমনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের দুর্দশা সেই তিমিরেই থেকে যায়।


বিজ্ঞাপন


মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাকে কোন ভাবেই অবহেলার সুযোগ নেই। জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী প্রতিটি রাষ্ট্র শিশুদের জন্য শিক্ষাকে সর্বজনীন, বাধ্যতামূলক, অবৈতনিক ও অত্যাবশ্যকীয় করার জন্য কাজ করবে। জাতিসংঘের মতে, শিশুর বয়সসীমা ১৮ বছর। অতএব শুধু প্রাথমিক শিক্ষা নয়, মাধ্যমিক শিক্ষাও অত্যাবশ্যকীয় ও সর্বজনীন অধিকারের মধ্যে পড়ে। বাংলাদেশের সংবিধান সেই একই কথা বলে।

এটা সত্য যে মাধ্যমিক স্তরেই শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান, গণিত বা অন্যান্য বিষয়গুলো সম্পর্কে উপলব্ধি করতে শেখে বা চিন্তার বিকাশ ঘটায়।

তাইতো গবেষক ও সৃজনশীল লেখক আহমদ ছফা লিখেছিলেন তিনি যদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন তাহলে কী কী করবেন। প্রধানমন্ত্রী হলে বিশ্ববিদ্যালয় নয় ভালো হাইস্কুল বা মাধ্যমিক বিদ্যালয় তৈরি করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।

শিক্ষকদের অভিযোগ প্রথম থেকেই তারা নানা ধরনের ষড়যন্ত্র ও বৈষম্যের শিকার। আর এটা শুরু হয়ে ছিল ১৯৭৩ সালে যখন ঢালাওভাবে ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শিক্ষকদের চাকুরি জাতীয়করণ করা হয়। এই সময় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও নড়েচড়ে বসে ছিল।  অধ্যক্ষ কামরুজ্জামান ও জয়নাল আবেদিন চৌধুরীর নেতৃত্বে দেশের স্কুল ও কলেজ শিক্ষক-কর্মচারীরা আন্দোলন শুরু করে ছিল এবং প্রায় ৩ মাস পর্যন্ত ধর্মঘট চলেছিল। এক পর্যায়ে সরকার অধ্যক্ষ কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি গ্রুপকে হাতিয়ে নিয়ে যায়। জয়নাল আবদীন গ্রুপটি আন্দোলন চালিয়ে গেলেও  এক সময় লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। ওই আন্দোলনের ফলে জাতীয়করণের পরিবর্তে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাসিক বেতন ২০ টাকা ২৫ টাকা এবং কলেজ শিক্ষকদের বেতন ৭০ টাকা থেকে ৮০ টাকা করা হয়। এমনকি ড. কুদরত-ই-খোদার শিক্ষা কমিশনে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ধাপে ধাপে জাতীয়করণের কথা উল্লেখ ছিল কিন্তু সেটা আর বাস্তবায়ন হয়নি।


বিজ্ঞাপন


শিক্ষকদের অভিযোগ স্বাধীনতার ৫৪ বছরে দেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আদর্শ ও ধারার সরকার এসেছে। আদর্শ ও কার্যক্রমের পার্থক্য থাকলেও প্রায় সব সরকারই মাধ্যমিকের শিক্ষকদের ঠকানোর ক্ষেত্রে এক ধরনের নীতি বজায় রেখেছে। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার মান বাড়াতে ও শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিভিন্ন ধরণের ষড়যন্ত্র ও লাল ফিতার কারণে থেমে যায়।

প্রতি বছর লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে দ্রব্যমূল্যের দাম কিন্তু শিক্ষকদের আয় বাড়ছে না। তাদের সংসারে এখন নুন আনতে পানতে ফুরানোর মতো অবস্থা। অন্যান্যদের হাতে ঝোলানো রূপালি ইলিশ যখন ঝলকানি দেয় তখন শিক্ষকরা চোখে ঝাপসা দেখে।

প্রতি বছর প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী মাধ্যমিক স্তরে প্রবেশ করে। দেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা হাতেগোনা। যে কারণে শিক্ষার্থীদের ভরসা এমন সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যে গুলো না সরকারি, না বেসরকারি অর্থাৎ এমপিওভুক্ত এবং এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৯৭ শতাংশ।

77

এক সময় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তেমন কিছুই পেতেন না। সরকার এক সময় সিদ্ধান্ত নেয় এসব শিক্ষকদের প্রণোদনা দেওয়া হবে। ১৯৮৪ সালের ১ জানুয়ারি হতে তাদের অনুদান ৩ মাস অন্তর অন্তর প্রণোদনা দেয়া শুরু হয়। ব্যাংকের কাঁচের দেয়াল ভেদ করে সেই টাকা তাদের কাছে পৌছাতে চার/পাঁচ মাস লেগে যেত।

এরপর সিদ্ধান্ত হয় শিক্ষকদের প্রণোদনা প্রতিমাসে দেওয়া দরকার। বিষয়টিকে এখন বলা হয় মান্থলি পে-অর্ডার (এমপিও) বা মাসিক বেতন আদেশ। মোটামুটি এটিই দেশে স্থায়ী ও পাকাপোক্ত হয়ে গেছে। দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিতই হচ্ছে মূলত এই এমপিও নামক রাষ্ট্রীয় সহায়তার বা প্রণোদনার মাধ্যমে। যেটি কোনো স্থায়ী বা ভাল পদ্ধতি হতে পারে না বলে বিশেষজ্ঞদের মত। ফলে দেশের সরকারি মাধ্যমিক ও বিশেষ স্কুলগুলোর সাথে একটা বৈষম্য ও হ-য-ব-র-ল ব্যবস্থা তৈরি হয়ে আছে।

দেশে এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৩৩ হাজারের বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ছয় লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারীর পদ রয়েছে। প্রতি বছর বাজেট ঘোষণার সময় বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লাখ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী কিছু আশার কথা শুনার অপেক্ষায় থাকে কিন্তু সে সুযোগ আর আসেনা।

স্বাধীনতার পর থেকেই প্রতিটি সরকারের আমলে শিক্ষকরা ধর্মঘট, হরতাল, কর্মবিরতি, সমাবেশ, মহাসমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন কর্মসূচি, স্মারকলিপি পেশ, কালো ব্যাচ ধারণ, কালো পতাকা উড্ডয়ন, এস.এস.সি পরীক্ষা বর্জন, ক্লাস বর্জন, আমরণ অনশন ইত্যাদি করে আসছে। পুলিশি অসহযোগিতা, মাইক ছিনিয়ে নেয়া, লাঠিচার্জ, কাঁদুনে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ইত্যাদিরও মোকাবেলা করতে হয়েছে। ‘ডু অর ডাই কর্মসূচি বা আমরণ অনশন পালিত হয়েছে বহুবার এবং অসুস্থ হয়ে শিক্ষক মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তারপরেও টনক নড়ে না কর্তা ব্যক্তিদের।  

শিক্ষকরা বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে (২০২৩ সালে)  জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে টানা ২১ দিন অবস্থান কর্মসূচি কর্মসূচি পালন করেছে ও  আমরণ অনশন পালন করেছে। শিক্ষকদের সাথে নানা ধরনের নাটক আর টাল বাহানা আর হুমকি দিয়ে শিক্ষকদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অনেকের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে আটক রাখা হয়। তৎকালীন মন্ত্রী ডা. দীপু মনি ও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে শিক্ষকদের কোনো অর্থ দিতে রাজি ছিলেন না।  অথচ ডা. দীপু মনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন রাষ্ট্রীয় অর্থ খরচ করে বিদেশ ভ্রমণ ও বিদেশে অবস্থান করার একটা বিশ্ব রেকর্ড করে ছিলেন।  শুধু ফটো সেশন করার জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থ খরচ বিদেশ ভ্রমণ করে ছিলেন। 

২০২৫ সালে হিসাব অনুযায়ী মাধ্যমিক পর্যায়ের একজন সাধারণ শিক্ষক স্কুল বা মাদ্রাসায় যোগদান করার সময় শুরুতে বেতন পান ১৩,৫০০ টাকার মতো। বিএড করা থাকলে হাজার দুয়েক টাকা বেশি। প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধি হয়। বর্তমান যারা শেষ বয়সে বা অবসরের সময় এসেছে এমন একজন সাধারণ শিক্ষক বেতন পান প্রায় ৩৩/৩৪ হাজার টাকা মতো। ঢাকা বা বিভাগীয় শহরে একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষকের যে বেতন, প্রত্যন্ত গ্রামের শিক্ষকেরও একই বেতন।

শিক্ষকদের অভিযোগ, অধ্যক্ষ-প্রধান শিক্ষক থেকে কর্মচারী পর্যন্ত নামমাত্র ১ হাজার টাকা বাড়িভাড়া, ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা।

শিক্ষকদের মতে, পাঠ্যক্রম সিলেবাস, আইন এবং একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হলেও শিক্ষা ব্যবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। একেক সময় একেক ধরনের কারিকুলাম। ফল খারাপ হলে হুমকি-ধমকিসহ নানা ধরনের আইন-কানুন করে শিক্ষকদের মানসিকভাবে চাপের মধ্যে রাখা হয়। এমপিওভুক্তদের বদলির কোনো সুযোগ নেই।

শিক্ষকদের মতে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সুযোগসুবিধার জন্য সবসময় আন্দোলন করে যেতে হয়। ১৯৭৩ সালের মাসিক ২০ থেকে আন্দোলন করতে করতে এই পর্যায় এসেছে। যেমন শুরুতে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ দেওয়া হলেও ২০০৮ সাল থেকে শতভাগ দেওয়া শুরু হয়। শিক্ষকদের আন্দোলন ও দাবির মুখে ২০০৩ সাল থেকে শিক্ষকদের জন্য বেতনের ২৫ শতাংশ আর কর্মচারীদের জন্য বেতনের ৫০ শতাংশ উৎসব ভাতা দেওয়ার প্রথা চালু হয়। মাঝে যোগ হয় ২০ শতাংশ হারে বৈশাখী ভাতা।

শিক্ষকরা জানান, ঈদ-পূজা তাদের কাছে অনেক কষ্টের। তারা আরও জানান, গত কোরবানির ঈদ থেকে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ হারে বোনাস পাচ্ছেন । তাছাড়া চাকুরি জীবনের কখনও কোনো পাওনাদারকে কোন তারিখে বেতন পাওয়া যাবে তা বলতে পারেন নি শিক্ষকরা। ফলে দোকানের পাওনাদারদের কাছে হতে হয়েছে হেনস্থা।

শিক্ষকরা জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে প্রথম থেকে এই সরকারের কাছে কিছু দাবি জানায়ে আসছে। শিক্ষকরা বাড়িভাড়া হিসাবে পায় ১ হাজার টাকা। বর্তমান সরকার মূল বেতনের ৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া হবে এমন পরিপত্র জারি করেছে। বিষয়টি রীতিমতো তামাশার শামিল বলে মনে করছেন শিক্ষকেরা। তাদের দাবি বাড়িভাড়া বেতনের ২০ শতাংশ হতে হবে এবং সেই সাথে চিকিৎসা ভাতা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর মূল্যস্ফীতি বেড়েই চলছে। অর্থাৎ গত বছর কোনো পণ্য বা বা সেবা কিনতে যে টাকা খরচ করতে হয়েছে, এখন সেই একই পণ‌্য বা সেবা নিতে আগের তুলনায় বহুগুণ বেশি খরচ করতে হচ্ছে। বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী, প্রতি পাঁচ বছর পর পর নিম্নতম মজুরী পুনর্বিবেচনা করার বিধান রয়েছে। এমন অবস্থায় শ্রমিক সংগঠনের নেতারা পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে ২৫ হাজার টাকা নিম্নতম মজুরি নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন।

তৈরি পোশাক খাতে সর্বশেষ সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা (নতুন বা সহকারী কর্মীদের জন্য)। মাস শেষে সব মিলে একজন পোশাককর্মী বেতন পান অন্তত ১৫ হাজার টাকা। অতিরিক্ত ডিউটি করলে তা পৌঁছে দাঁড়ায় ২০ হাজারে। অন্তত সে অনুযায়ী, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টি পর্যালোচনার দাবি রাখে।

শিক্ষকরা বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে আয়কর সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩,৫০,০০০ টাকা এবং বার্ষিক মাথাপিছু আয় ২,৮২০ ডলার।  প্রশ্ন হলো, একজন এমপিও-ভুক্ত স্কুল-মাদ্রাসার শিক্ষক কি সমপরিমাণ অর্থ উপার্জন করতে পারছেন? তাহলে শিক্ষকদের নিম্মবিত্ত নাকি নিম্ন আয়ের প্রান্তিক মানুষ, কোন ক্যাটাগরিতে ফেলবেন? তাদের আয়ের পুরোটাই জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ইত্যাদির জন্য ব্যয় করার মতো অর্থ তাদের হাতে থাকে না।

সরকারি শিক্ষকদের অবসরকালীন এককালীন ভাতা মূল বেতনের ৯০ শতাংশের ৩০০ গুণ, পক্ষান্তরে, বেসরকারি শিক্ষকদের মূল বেতনের ৭৫ গুণ। তার জন্য আবার বেসরকারি শিক্ষকদের মূল বেতনের ৬ শতাংশ চাঁদা হিসেবে জমা দিতে হয়। বৃদ্ধ বয়সে অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা যথাসময়ে প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নেই। অবসরে যাওয়ার পর সেই টাকা পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। অবসরের টাকা পাওয়ার পূর্বেই অনেকে অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা যায়।

তাছাড়া গণমাধ্যমের মাধ্যমে তারা জেনেছে, বিগত আওয়ামী লীগের আমলে শিক্ষকদের জমা টাকা মার হয়ে গেছে। ফলে তারা তাদের অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় আছেন।

এক সময়ের শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ও বিভিন্ন সময়ের কর্তাব্যক্তিরা শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ম তোলেন। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর এই ধরনের কথা আমাদের জন্য খুবই হতাশার। এখানে বৈষম্যের বিষয়টি ফুটে ওঠে। তাহলে কি দেশের ৯৭ ভাগ শিক্ষাথীদের অযোগ্য শিক্ষক দিয়ে পড়ানো হয়। যে কারণে উচ্চশ্রেণীর লোকেরা বিদেশ, নামিদামি ও বিশেষ বিদ্যালয়ের দিকে ছুটছে।

 গ্রাম-গঞ্জের মাধ্যমিকের বিদ্যালয়গুলো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে যে গুলোর অধিকাংশ বাঙালির জাগরণের সময় স্থাপিত হয়ে ছিল। তাছাড়া সরকার দীর্ঘদিন ধরে নিবন্ধনের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং ধাপে ধাপে যাচাইয়ের মাধ্যমে শিক্ষকদের নিয়োগ দিচ্ছে। অতএব অযোগ্যতার প্রশ্ন তোলার কোন সুযোগ নেই।

44

তাছাড়া অনেকে শিক্ষকদের প্রাইভেট–বাণিজ্যের কথা বলেন। এমন অবস্থা দুই একজন শিক্ষকের ক্ষেত্রে হতে পারে তবে ঢালাওভাবে মন্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। হাতেগোনা কয়েকটি বিষয়ের প্রাইভেট পড়িয়ে হয়ত কিছু শিক্ষক সচ্ছলভাবে জীবন যাপন করেন, তবে অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের সে সুযোগ নেই। তাছাড়া স্কুলের শিক্ষকদের প্রাইভেট পড়ানোর ক্ষেত্রে বিধি নিষেধ আছে।

শিক্ষকদের দাবি-দাওয়ার প্রেক্ষিতে দেশের কর্তাব্যক্তিরা বলেন, সরকারের সক্ষমতা নেই। তবে এই কথার সাথে অনেক শিক্ষাবিদ একমত নন। খরচ একটু বাড়তে পারে, তাই বলে এই নয় যে দেশের অর্থনীতির উপর বড় চাপ পড়বে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দের হার সবচেয়ে কম। ইউনেস্কোর ঘোষণা অনুযায়ী একটি দেশের মোট জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ শিক্ষাখাতে ব্যয় করা দরকার। কিন্তু বাংলাদেশে সব সময় শিক্ষাখাতে জিডিপির মাত্র ২ শতাংশের অনেক কম বরাদ্দ রাখা হয়।

অনেক কর্তা ব্যক্তিরা বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠানের মান ভাল নয়, আবার অনেকে অনিয়ম করে আবার অনেক প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীর চেয়ে শিক্ষক বেশি। এক্ষেত্রে শিক্ষা বিষয়ক গবেষকদের যুক্তি হলো কিছু মানহীন প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে, তাই বলে এর জন্য সব প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের দায়ী করা ও তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক? আমাদের দেশে দেখা যায় রাজনৈতিক কারণে বা কিছু ব্যক্তির কর্মসংস্থানের জন্য প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়। বিষয়টি মূলত শিক্ষার জন্য হওয়া দরকার। তাছাড়া তাছাড়া বিষয়টি দেখার দায়িত্ব মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরসমূহের।

এটা ভুলে গেলে চলবে না এক সময় মাধ্যমিকের শিক্ষকরা তেমন কিছু পেতেন না কিন্তু উনারা কোনদিন দায়িত্বে অবহেলা করেননি। আমাদের সক্ষমতা বাড়ছে, এখন মাধ্যমিকের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার সময় এসেছে। শিক্ষকদের চাকরির নিরাপত্তা, আর্থিক স্বচ্ছলতা, সামাজিক মর্যাদা নেই বলে মেধাবীরা এই পেশায় আসতে চান না।

‘প্রদীপের কাজ আলো দান করা। সে প্রদীপই আলো দান করতে পারে, যার সলতেটা হয় তৈলসিক্ত।’ এ নিরিখে বলা যায়, শিক্ষককে অর্থনেতিক স্বস্তি দিতে না পারলে তার কাছ থেকে ভালো শিক্ষা আমরা আশা করতে পারি না।

অন্যদিকে শিক্ষকদেরও ভাবার বিষয়, বর্তমান দেশে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রয়েছে। দেশের অর্থনীতি স্বাভাবিকভাবে অনেক চাপের মধ্যে আছে, চারিদিকে এক ধরনের অস্থিরতার ভাব, যে কারণে শিক্ষকদের সব দাবিদাওয়া পূরণ নাও হতে পারে।

একই সাথে সরকারকেও ভাবা উচিত বিপ্পব পরবর্তী সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি থাকে। তাছাড়া বাংলাদেশের পেক্ষাপটে দেখা যায়, রাজনৈতিক সরকারগুলো অনেক কারণে অনেক সঠিক সিদ্ধান্ত সময়মত নিতে পারেনা। অতএব নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে দেশবাসীর প্রত্যাশা তার সীমিত সময়ের মধ্যে এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন যাতে দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার মান উন্নয়নের পথ প্রশস্ত হয়।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর