শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ঢাকা

ধর্ষণ থামছেই না

মামুন হোসাইন
প্রকাশিত: ১৬ অক্টোবর ২০২৫, ১২:৫৬ পিএম

শেয়ার করুন:

ধর্ষণ থামছেই না
ধর্ষণ থামছেই না

বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা দিন দিন এমনভাবে বাড়ছে যে তা এখন এক মহামারীর আকার ধারণ করেছে। ঘরে-বাইরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে কর্মস্থল— কোথাও নারীরা নিরাপদ নন। প্রতিটি নতুন খবর যেন আরও একবার মনে করিয়ে দেয়, আমাদের সমাজে নারী হওয়া মানেই প্রতিনিয়ত ভয়ের মধ্যে বেঁচে থাকা। আইন আছে, আদালত আছে, শাস্তির বিধানও আছে, কিন্তু ন্যায়ের নিশ্চয়তা নেই বলেই অপরাধীরা বারবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে, এ কোন পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ? নিরাপত্তাহীনতার এই চিত্র কি তবে আমাদের রাষ্ট্রকে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে?

গত ২২ সেপটেম্বর পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে মারমা কিশোরীকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়। পুরো পাহাড়ি সমাজের বেদনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাইভেট পড়া শেষে বাড়ি ফেরার পথে মেয়েটি নির্যাতনের শিকার হয়ে রাতের আঁধারে ক্ষেত থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার হয়। এখনো সে হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুভয় আর অপমানের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে। বাবার কণ্ঠে অসহায় আকুতি, ‘আমার মেয়ে তিনজনকে অভিযুক্ত করেছে।’ এটি একটি মামলার এজাহারের সাথে সাথে ন্যায়বিচারের জন্য হাহাকার। ইতোমধ্যে সেনাবাহিনীর সহায়তায় শয়ন শীল নামে একজনকে গ্রেফতার করা হলেও অপর আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ ঘটনার পর তিন পার্বত্য জেলায় দফায় দফায় হামলা, বিক্ষোভ, অবরোধ ও সংঘর্ষে সাধারণ মানুষের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পাহাড় এখন ন্যায়বিচারের দাবিতে উত্তাল, আর মানুষের চোখে একটাই প্রশ্ন— কবে থামবে এই দুঃসহ নির্যাতন আর কবে আসবে প্রতিশ্রুত ন্যায়?


বিজ্ঞাপন


খাগড়াছড়িতে এই কিশোরী ধর্ষণের ঘটনার জেরে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ১৪৪ ধারা জারি থাকলেও সহিংসতা থামেনি। প্রাণহানির মধ্যেই চিরতরে থেমে গেছে কয়েকটি তরতাজা জীবন। সেনা ও পুলিশ সদস্যরাও রেহাই পাননি, আহত হয়েছেন অনেকে। গুইমারার রামসু বাজারে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট পুড়ে গেছে আগুনে। বাড়ি-ঘর ছাড়া হয়েছে অসংখ্য পরিবার। পাহাড়ি জনপদের এই থমথমে পরিবেশ আইন-শৃঙ্খলার সংকট সৃষ্টি করেছে। যা গোটা সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো। এই অস্থিরতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ধর্ষণ কেবল একজন ভুক্তভোগীর ক্ষতি নয়, এটি পুরো সমাজকে রক্তাক্ত করে তোলে।

গত ১৭ জুন খাগড়াছড়ির আরেক কিশোরীকে নিয়ে একটি ঘটনা ছিল সত্যিই হৃদয়বিদারক। পড়াশোনার বয়সে এক নিষ্পাপ মেয়ে লজ্জা, ভয় আর আতঙ্কে দীর্ঘদিন চুপ করে থেকেও শেষ পর্যন্ত অসহায় হয়ে ওঠে, এমনকি জীবনের প্রতি বিরাগ থেকে আত্মহত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করে। গত ১২ জুলাই বিষপানের পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তখন সে ভেঙে পড়া কণ্ঠে ১৬ জুলাই নিজের ওপর হওয়া নির্যাতনের কথা জানায়। রথযাত্রার পূজায় অংশ নিতে গিয়ে খাগড়াছড়ির এই কিশোরীকে অকথ্য নির্যাতনের শিকার হতে হলো। রাতে কাকার বাসায় অবস্থানকালে স্থানীয় চার যুবক তাকে জিম্মি করে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ধর্ষণ করে পালিয়ে যায়। পরে অভিযান চালিয়ে আরমান, সাকিব, সাদ্দাম ও এনায়েত নামে চারজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। স্থানীয়দের দাবি, এরা সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিল। তখন বোঝা যায়, এমন অপরাধ শুধু একজনের নয়, পুরো সমাজকেই ভেঙে দেয়। এই নৃশংস ঘটনায় কিশোরী যেমন ভেঙে পড়েছে, তেমনি ক্ষুব্ধ ও আতঙ্কিত পুরো এলাকাবাসীও। 

সম্প্রতি অনলাইনে হইচই তোলা আরেকটি ঘটনা হলো, পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে এক কলেজছাত্রী ও তার বৃদ্ধ বাবাকে প্রকাশ্যে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনাটি খুবই অমানবিক। এবং পুরো সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। স্থানীয় বাজার এলাকায় দিনদুপুরে ঘটে যাওয়া এই নির্মম ঘটনায় ২৩ বছরের শিক্ষার্থী ও তার ৭০ বছরের বাবাকে অপমানের চরম নিদর্শন দেখতে হলো, যেখানে একজন মেয়েকে তার বাবার সামনে বিবস্ত্র করা হলো, আর একজন বাবা অসহায়ভাবে মেয়েকে রক্ষা করতে গিয়ে নিজেও নির্যাতিত হলো। বর্তমানে তারা দুজনই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, শরীরজুড়ে আঘাত আর মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার ভার নিয়ে। স্থানীয় ছাত্রদল নেতা ও তার সহযোগীর বিরুদ্ধে ওঠা এ অভিযোগে জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। আর মানুষ প্রশ্ন তুলছে, এমন পাশবিক ঘটনার শিকার হলে কোথায় মিলবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার?

বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা যেন সমাজের গায়ে গভীর ক্ষত তৈরি করছে। কুমিল্লায় সংখ্যালঘু নারীর উপর নির্যাতনের ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে; ভোলায় স্বামীকে বন্দি করে নির্যাতন চালিয়ে স্ত্রীর মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়; ময়মনসিংহে এক স্কুলছাত্রী নিরাপত্তাহীনতায় ভেঙে পড়েছে; ফরিদপুরে পিতার হাতে কন্যার জীবনের স্বপ্ন চিরতরে নিভে গেছে। গাজীপুরে নাটকের আড়ালে ঘটে ভয়ংকর ট্র্যাজেডি, আর সাতক্ষীরায় শিশুর শৈশব কেড়ে নেওয়া হয়েছে তিন কিশোরের হাতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে কিশোরগঞ্জে আরেক তরুণীর জীবনে নেমেছে অন্ধকার। প্রতিটি ঘটনার পেছনে আছে ভাঙা জীবন, অসহায় কান্না আর এক একটি পরিবারের অশেষ দুঃখ। যা শুধু শিরোনামে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজের নৈতিকতা ও নিরাপত্তার ভাঙনকে নগ্নভাবে সামনে তুলে আনে।


বিজ্ঞাপন


বাংলাদেশ বিশ্বসভায় সমতা ও অগ্রগতির আলোচনায় জায়গা করে নিলেও নারীর আইনী সুরক্ষায় এখনও চিত্র ভিন্ন। পরিস্থিতি অতি কঠিন ও হতাশাজনক। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭১তম। যা একটি বিশেষ পরিসংখ্যান এবং প্রতিদিনের জীবনে নারীর লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা, ব্যবসা বা সম্পত্তির অধিকার— প্রতিটি জায়গাতেই নারীকে বৈষম্য, অবমূল্যায়ন ও নিরাপত্তাহীনতার বোঝা বয়ে বেড়াতে হয়। গণপরিবহন থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নারীরা যখন সহিংসতা, হয়রানি ও অবিচারের শিকার হন, তখন প্রশ্ন জাগে, আইনের অস্তিত্ব কি তাদের জন্য যথেষ্ট কার্যকর? এ বাস্তবতা শুধু আজ কাগজে-কলমে আছে। প্রতিদিনের সংগ্রাম, ভাঙা স্বপ্ন আর অদম্য প্রতিরোধের গল্প নিয়মিত তৈরি হচ্ছে। থেমে নেই নির্যাতক আর নিপীড়কের চরিত্র। তাই নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনী সুরক্ষাকে কেবল নিয়মের বইয়ে লিখে রাখলে চলবে না। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তব প্রয়োগে রূপ দিতে হবে। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপের তথ্য যেন দেশের নারীদের নীরব কান্নার প্রতিচ্ছবি। প্রতি চার জন নারীর মধ্যে তিনজনই জীবনে কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, এ বাস্তবতা আমাদের সমাজের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। শহর-গ্রাম নির্বিশেষে নারীরা নিরাপদ নন, বরিশালে তো এই হার পৌঁছেছে আশঙ্কাজনক ৮১ শতাংশে। শুধু সংখ্যার পরিসংখ্যান নয়, এর প্রতিটি শতাংশের পেছনে রয়েছে ভাঙা স্বপ্ন, ক্ষতবিক্ষত মন আর দগদগে অভিজ্ঞতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন লাখো নারী, যাদের অনেকেই আজও ভয়, লজ্জা আর সামাজিক অবহেলার বেড়াজালে বন্দি। এই জরিপ নারীর জীবনের নির্মম বাস্তবতার আয়না।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বাংলাদেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র প্রতিদিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে। লাশ হয়ে ফিরছে অগণিত মা-বোন, অথচ মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। শুধু ছয় মাসেই ধর্ষণের সংখ্যা আগের পুরো বছরের চেয়েও বেশি, সঙ্গে রয়েছে দেড় শতাধিক ধর্ষণের চেষ্টা। মানবাধিকারকর্মী লাকী বাছাড়ের কণ্ঠে উঠে আসে হতাশার সুর, আমরা জানিই না, কেন এত মৃত্যু, কেন এত লাশ? মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানও রাষ্ট্রের নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘রাষ্ট্র ঝাঁপিয়ে পড়ছে না।’ অথচ সাম্প্রতিক ফ্যাসিবাদ বিরুধী গণআন্দোলনে নারীদের সক্রিয় উপস্থিতি নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু নারীকে ঘিরে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে, সহিংসতা ও ধর্ষণের এই ক্রমবর্ধমান স্রোত সেই স্বপ্নকে বারবার ভেঙে দিচ্ছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে নারীর প্রতি সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা যেন নতুন আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে “নতুন বাংলাদেশ” গড়ার স্বপ্ন আর জুলাই সনদের খসড়া নিয়ে জোর আলোচনা চললেও, অন্যদিকে প্রতিদিনের খবরের শিরোনামে নারীর নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তা আরও প্রকট হয়ে উঠছে। এই বৈপরীত্য যেন দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

লেখক: কলাম লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর