সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

জাকসু নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা

মো. মাঈন উদ্দীন
প্রকাশিত: ২৪ আগস্ট ২০২৫, ০৭:৪২ পিএম

শেয়ার করুন:

জাকসু নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা
মো. মাঈন উদ্দীন (প্রাক্তন ছাত্র, জাবি)।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন হবে ১১ সেপ্টেম্বর। তিন দশক পর অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচন ঘিরে সরগরম হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস। ছাত্রসংগঠন, প্রার্থী ও সমর্থকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। আবাসিক হল, বটতলা, ক্যাফেটেরিয়া—সব জায়গায় আলোচনার মূল বিষয় জাকসু নির্বাচন।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সৎ, মেধাবী এবং দেশপ্রেমিক ছাত্র নেতৃত্ব তৈরির উদ্দেশ্যে ১৯৭২ সালে জাকসু প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠার পরে এখন পর্যন্ত মোট ৮ বার জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ ১৯৯২ সালে নির্বাচন হয়েছিল।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, এত বছর নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় তাঁদের অধিকার আদায়ে কার্যকর প্ল্যাটফর্ম ছিল না। রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনগুলো শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হওয়ার বদলে নিজেদের দলীয় স্বার্থে কাজ করেছে। জাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কাজ করবেন বলে সকল মহলের প্রত্যাশা। ইতোমধ্যেই সব পক্ষ তাদের প্যানেল নিয়ে তৎপরতা শুরু করেছে।

আরও পড়ুন: জাকসুতে ৭৪০ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা

ইতোমধ্যেই কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বিভিন্ন সংগঠনের ও স্বতন্ত্র প্যানেলের প্রার্থীরা। জমাদান শেষে ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ নামে প্যানেল ঘোষণা করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির জাবি শাখা।

শিবিরের প্যানেলে ২৫ প্রার্থীর মধ্যে ছয়জন ছাত্রী অংশ নিচ্ছেন। সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট থেকে সহসভাপতি (ভিপি) পদে শাখা শিবিরের সদস্য ও ফার্মেসি বিভাগের ছাত্র আরিফুল্লাহ আদিব, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে শাখা শিবিরের অফিস ও প্রচার সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম।

ইসলামী ছাত্রশিবিরও দীর্ঘদিন পর প্রকাশ্যে সক্রিয়। কয়েক মাস ধরে তারা মেডিকেল ক্যাম্পসহ সামাজিক কর্মসূচি চালিয়েছে। প্যানেল ঘোষণা শেষে ভিপি পদপ্রার্থী আরিফুল্লাহ আদিব বলেন, “আমরা দলীয় ব্যক্তিদের বাইরেও প্রার্থী দেওয়ার চেষ্টা করেছি, যাতে শিক্ষার্থীরা প্যানেলটি নিজের মনে করে। আমরা বিজয়ী হলে ২৪-এর স্পিরিটকে ধারণ করে দলমত নির্বিশেষে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে চাই।

এদিকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার লক্ষ্যে পূর্ণাঙ্গ ২৩ সদস্যের প্যানেল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শাখা। প্যানেল ঘোষণার পর সহ-সভাপতি পদপ্রার্থী আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল বলেন, ‘আমাদের প্যানেলে কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্যকে স্থান দেওয়া হয়নি। যারা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে, গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণে এবং সাম্প্রতিক বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কার আন্দোলনে সম্মুখসারিতে ভূমিকা রেখেছেন, আমরা তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করেছি।’

এছাড়া বিএনপি-সমর্থিত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও কিছু বাম সংগঠনও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে।

আরও পড়ুন: ছাত্র সংসদ নির্বাচন বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শ চাইলেন জাবি ভিসি

জাকসু নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ২৫টি পদের বিপরীতে ২৭৩ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। বিশেষ করে এবারের জাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে উৎসবের আমেজ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঢাকসু, জাকসু ও রাকসু সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেশের রাজনীতিতে ও আগামীর আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে সকলের বিশ্বাস।

তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি ও নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু ভাবে অনুষ্ঠিত হওয়া জাতীয় নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিয়ে আসতে পারে। অতীতে বিশেষত ১৬ বছরে ছাত্রলীগ যে ফ্যাসিবাদের নিকৃষ্ট নমুনা শিক্ষাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা এবারে কোনোভাবেই চাচ্ছেন না সেই ধারা, সেই অত্যাচার ও অনাচার ফিরে আসুক।

বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ক্ষমতাশ্রয়ী। সুতরাং ক্ষমতার বাহন হিসেবে তারা ছাত্ররাজনীতি বহাল রাখতে চাইবে—এটাই স্বাভাবিক। তবে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ নয়, বরং লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতির অবশান হোক—এটা সকল অভিভাবক ও সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের প্রত্যাশা।

তাই ক্যাম্পাসগুলোতে এবার সরাসরি কোন ছাত্রসংগঠনের নামে প্যানেল কেউ ঘোষণা করছেনা। এককভাবে লড়ার চেয়ে তারাও অনেকেই গণঅভ্যুত্থানপন্থি যেকোনো সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে চায়। তাই ডাকসু ও জাকসুতে সে ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

সব সংগঠন—ডান অথবা বাম—সবারই কমন কৌশল হচ্ছে ‘সম্মিলিত প্যানেল’। শক্তিশালী ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য প্যানেল গঠনকেই প্রাথমিকভাবে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সেই আগের মতো ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতানেত্রীর চেয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি অধিকতর গুরুত্ব অর্জন করেছে। ক্যাম্পাসের পরিচিত মুখগুলো প্যানেলে টানতে নানাভাবে চেষ্টা করছেন ছাত্রনেতারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয় জাকসু নির্বাচন। সেখানে আনন্দমুখর পরিবেশে প্রচার চলছে। শিক্ষার্থীদের তুষ্ট করার জন্য অধিকতর হারে সাধারণ ছাত্রদের সংশ্লিষ্ট করার উদ্যোগ নিয়েছে অনেকেই। ইসলামী ছাত্রশিবিরও সেখানে বেশ তৎপর রয়েছে। এককভাবে লড়ার চেয়ে তারা গণঅভ্যুত্থানপন্থি যেকোনো সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে চায়।

আরও পড়ুন: ৩৩ বছর পর জাকসু নির্বাচন, ভোট ১১ সেপ্টেম্বর

নির্বাচনের পরিবেশের কথা বললে বলতে হয়, যদিও এখনো একটি উন্মুক্ত ও বাধা-বন্ধনহীন পরিবেশ লক্ষণীয়, তথাপি নির্বাচনকে ভণ্ডল করার আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই আশঙ্কাও প্রকাশ করছেন যে, যাদের মধ্যে ফ্যাসিবাদী প্রবণতা আছে, তারা কিছুতেই পরাজয় মেনে নেবেন না। তারা নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া বা বানচাল করার মতো ঘটনা ঘটাতে পারে। এই ফ্যাসিবাদী প্রবণতা কোনো সংগঠনের একক দোষ নয়। যেখানে যারা শক্তিশালী, তারাই গায়ের জোরে জয়লাভ করতে চাইবে।

বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য সেনা মোতায়েন চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও নির্বাচন কমিশনের সদস্যসচিব এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, জাকসু নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তাবেষ্টনী জোরদার করতে আশপাশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনের দিন, এর আগের দিন এবং নির্বাচনের পরের দিন সেনা মোতায়েনের জন্য ইতিমধ্যে সেনাপ্রধানের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

এছাড়া ক্যাম্পাসে পুলিশ এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও কাজ করবেন বলে তিনি জানান। তবে নির্বাচনে সেনা মোতায়েন নিয়ে ক্যাম্পাসে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। যাই হোক, ছাত্র, শিক্ষক ও অভিভাবকসহ সকলেই চায় অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হোক। জাতিগঠনে আগামী দিনের যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে উঠুক। সকল বাধা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করে ক্যাম্পাসের ছাত্রছাত্রীদের ন্যায্য দাবি পূরণ করে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরে আসুক—এটাই সকলের প্রত্যাশা।

লেখক: প্রাক্তন ছাত্র, জাবি। ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক। ইমেইল: [email protected]

এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর