শনিবার, ৯ মে, ২০২৬, ঢাকা

কাশ্মীর ব্রিটিশ শাসিত ছিল না

অধ্যাপক আমিরুল আলম খান
প্রকাশিত: ১৭ আগস্ট ২০২৫, ০৯:০৯ পিএম

শেয়ার করুন:

amirul
অধ্যাপক আমিরুল আলম খান। ছবি: সংগৃহীত

কাশ্মীর কখনো ব্রিটিশ শাসিত কোনো রাজ্য ছিল না। ছিল প্রিন্সলি স্টেট বা দেশীয় রাজ্য। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সরকার, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ একমত হয় যে, দেশীয় রাজ্যগুলো স্বাধীনভাবে ১. স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অথবা ২. পাকিস্তান বা ভারতে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

সে সময় গোটা ভারতবর্ষে প্রায় ৭০০ ছোটবড় দেশীয় রাজ্য ছিল। কাশ্মীর, হায়দ্রাবাদ, ছিল বড় এবং সিকিম ছিল ছোট দেশীয় রাজ্য। সিকিম আর হায়দ্রাবাদের সাথে পাকিস্তানের সীমান্ত ছিল না। কিন্তু জুনাগড়, মানভাদাড় ইত্যাদি দেশীয় রাজ্যের সাথে ভারত ও পাকিস্তানের সীমান্ত ছিল। অন্যদিকে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশসহ বেশ কিছু দেশীয় রাজ্যের সাথে ভারতের কোনো সীমান্ত ছিল না।


বিজ্ঞাপন


দেশ বিভাগের পরপরই ভারত জুনাগড়, মানভাদাড়, পুঞ্চ দখল করে নেয়। হায়দ্রাবাদের শাসক নিজাম ছিলেন মুসলমান। ভারতের ভয় ছিল, পূর্ববঙ্গ যদি পাকিস্তানের অংশ হতে পারে তাহলে হায়দ্রাবাদের নিযামও পাকিস্তানে যোগ দিতে পারেন। কিন্তু হায়দ্রাবাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হিন্দু। তাই ভারত দাবি করে যে, হায়দ্রাবাদকে ভারতভুক্ত হতে হবে। ভারত অভিযোগ তোলে নিযাম পাকিস্তানে যোগদানের চক্রান্তে লিপ্ত। তারপরই ভারত ১৯৪৮ সালে হায়দ্রাবাদ দখল করে নেয় এবং নিযামকে বন্দি করে তাঁর সকল সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে।

এদিকে, কাশ্মীরের সাথে ভারত পাকিস্তান, চীনের সীমান্ত। অধিবাসীদের ৯৫ ভাগ মুসলমান; কিন্তু শাসক হিন্দু, মহারাজা হরি সিং। ভারত হায়দ্রাবাদ দখল করলে কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তান উদবিগ্ন হয়ে ওঠে। অনেক কারণও ছিল।

প্রথমত, কাশ্মীর মুসলিম প্রধান। দ্বিতীয়ত, পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোর থেকে পাথরছোড়া দূরত্বে কাশ্মীর। তৃতীয়ত, পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সকল নদীর উৎস কাশ্মীর।

তখন, কাশ্মীরের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত পাকতুনখোয়া থেকে পাঠান উপজাতিরা কাশ্মীর আক্রমণ করে কাশ্মীরের প্রায় ৩৫ ভাগ দখল করে নেয়। আর পাকিস্তান তাতে সব রকম মদদ দেয়। শ্রীনগর থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে পৌঁছে অজ্ঞাত কারণে পাঠানরা রাজধানী শ্রীনগর দখলের চেষ্টা না করে বিশ্রাম করতে থাকে কয়েক দিন। সেই সুযোগে ভারত হরি সিংহের সাথে এক চুক্তি করে অবশিষ্ট কাশ্মীর দখল করে।


বিজ্ঞাপন


কাশ্মীরে মহারাজা হরি সিং জনপ্রিয় ছিলেন না। কাশ্মীরবাসীর অবিসংবাদিত নেতা তখন শেখ আব্দুল্লাহ। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু নেহেরু। শেখ আব্দুল্লাহ চেয়েছিলেন, কাশ্মীর হবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। তিনি আশা করেছিলেন, নেহেরু কাশ্মীরের এ মর্যাদা মেনে নেবেন। কিন্তু নেহেরু বন্ধু শেখ আব্দুল্লাহকে বিশ্বাস করতে পারেন নি। নেহেরু ভাবলেন, শেখ আব্দুল্লাহ  কাশ্মীরকে পাকিস্তানভূক্ত করবেন।

এবার সরাসরি ভারত পাকিস্তানের যুদ্ধ শুরু হয়। বিষয়টি তখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে গড়ায়। সিদ্ধান্ত হয়, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে কাশ্মীরে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। সে গণভোটে স্থির হবে কাশ্মীর স্বাধীন একটি  রাষ্ট্র হবে, না কি পাকিস্তান বা ভারতের অংগ প্রদেশ হবে, না কি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভাগাভাগি হবে, যেমন বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগ হয়েছে।

মহারাজা হরি সিং ভারতের সাথে চুক্তি করেছিলেন যে, কাশ্মীর তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে ভারতের সাথে যোগ দেবে। সেই চুক্তিবলে পরবর্তীতে সংবিধানে সংযোজিত ৩৭০ ও ৩৫ক ধারায় কাশ্মীর ভারতের একটি স্বতন্ত্র রাজ্যের মর্যাদা পায় যেখানে প্রতিরক্ষা, বিদেশ ও অর্থনীতি ছাড়া কেন্দ্র কাশ্মীরের স্বতন্ত্র পতাকা, সংবিধান, সংবিধান সভা ইত্যাদি ভারত স্বীকার করে নেয়।

এদিকে, জাতিসংঘে অঙ্গীকার করলেও ভারত কাশ্মীরে গণভোটের আয়োজন করতে দেয়নি। বরং নেহেরু কাশ্মীরের নেতা শেখ আব্দুল্লাহকে কারারুদ্ধ করেন। ১৯৬৪ সালে নেহেরু তাঁর মৃত্যুর অল্প কিছুদিন পূর্বে শেখ আব্দুল্লাহকে মুক্তি দেন। কিন্তু ততদিনে হযরত বাল ইস্যুতে কাশ্মীরে এক ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বেঁধে যায় এবং অচিরেই তা ভারত ও পাকিস্তানের সর্বত্র দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন

কাশ্মীর নিয়ে ট্রাম্পের প্রস্তাবে পরীক্ষার মুখে ভারতের কূটনীতি

১৯৪৮ সাল থেকে কাশ্মীরের ৩৫ ভাগ পাকিস্তান ও ৬৫ ভাগ ভারত নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধে চীন ভারতের কাছ থেকে প্রায় জনবসতিশূন্য আকচাই চীন দখল করে নেয় যা গোটা কাশ্মীরের প্রায় ২০ ভাগ। এখন ভারত কাশ্মীরের প্রায় ৪৫ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে।

মোদি সরকার ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫ক ধারা বাতিল করে এবং লাদাক অঞ্চলকে কাশ্মীর থেকে আলাদা করে দেওয়ায় কাশ্মীরের স্বতন্ত্র পতাকা, সংবিধান, সাংবিধানিক সভাসহ স্বতন্ত্র সব মর্যাদার অবসান হলো। অক্টোবর থেকে কাশ্মীর ও লাদাক শাসিত হবে সরাসরি  দিল্লি থেকে কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক নিয়োজিত দুজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর মারফত।

Kashmir
কাশ্মীরকে বলা হয় ভূস্বর্গ। ছবি: সংগৃহীত

এখন সিকিম নিয়ে কিছু কথা। সিকিম ছিল ব্রিটিশের এক আশ্রিত রাজ্য। ১৯৪৭ সালে অনুষ্ঠিত গণভোটে তারা স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে থাকতে চায়। ভারত চেয়েছিল সিকিম ভারতে যোগ দিক। কিন্তু নেহেরু নাকি মশা মেরে হাত কালো করতে চান নি, তাই তিনি সেনা পাঠিয়ে জোর করে সিকিম দখল করেন নি! ওদিকে সিকিমের সাথে ভারত ও চীনের সীমান্ত। নেহেরু জমানায় ভারত-চীন ভাই-ভাই। কিন্তু ১৯৬২ সালে চীনের সাথে যুদ্ধে পরাজয়ের পর ভারত সিকিম দখলের চিন্তা শুরু করে। ১৯৬৪ সালে নেহেরুর মৃত্যু হয়। আর ১৯৬৫ সালে কাশ্মীর ইস্যু নিয়েই ভারত-পাকিস্তান দ্বিতীয় দফা যুদ্ধ বাঁধে। লাল বাহাদুর শাস্ত্রী তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

আরও পড়ুন

৩৭০ ধারা কী, কেন ফেরত চান কাশ্মিরিরা?

রাশিয়ার আমন্ত্রণে তাসখন্দে পাকিস্তানের সাথে শান্তি আলোচনা শেষে সেখানেই ১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে আকস্মিকভাবে শাস্ত্রীজির মৃত্যু হয়। এবার নেহেরু-কন্যা ইন্দিরা দিল্লির তখতে। তিনি ১৯৬৮ সালে জেনারেল কাও-নায়ারের যৌথ নেতৃত্বে গড়ে তোলেন ভারতের প্রথম বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা RAW (Research and Analysis Wing). ১৯৭১ সাল নাগাদ সিকিম দখলের সুযোগও তৈরি করে ফেলে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা 'র'। কিন্তু ততদিনে বাংলাদেশে শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। ভারত বাংলাদেশের পক্ষে সর্বশক্তি দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়ায় এবং মাত্র নয় মাসে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

পরবর্তী পাঁচ বছরে সিকিমে অনেক নাটক মঞ্চস্থ হয়। অবশেষে ১৯৭৫ সালে সিকিমে গণতন্ত্র রক্ষার অজুহাতে, প্রধানমন্ত্রী লেন্দুপ দর্জির কথিত আহবানে সাড়া দিয়ে ভারত সিকিম দখল করে নেয়।

কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার অবসানে ভারতের এই উদ্যোগ শুধু কাশ্মীরেই সীমিত থাকবে বলে মনে হয় না। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসাম ও দেশীয় রাজ্য ত্রিপুরাকে ভেঙে ভেঙে ছয়টি নতুন রাজ্য গঠিত হয়েছে। তারাও কাশ্মীরের মতো একই মর্যাদা ভোগ করে আসছে।

কাশ্মীরের অধিবাসীরা মুসলমান আর এই ছয় রাজ্যের অধিবাসীরা প্রধানত খ্রিস্টান। পূর্বাঞ্চলের এ রাজ্যগুলো এখন আতঙ্কিত। সে আতঙ্ক কত তীব্র সেটা বোঝা যায়

এবার ১৫ আগস্ট  ভারতের স্বাধীনতা দিবসকে মণিপুর উদযাপন করেছে ‘স্বাধীন নাগাল্যান্ড দিবস’ হিসেবে।

লেখক: লেখক ও শিক্ষাবিদ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর