বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ঢাকা

কী অবস্থা তরুণ প্রজন্মের, কী-ই বা তাদের প্রত্যাশা

রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ৩১ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:০২ পিএম

শেয়ার করুন:

২০১৮ সালের খোলা চিঠির প্রাসঙ্গিকতা: ২০২৪ সালের প্রতিফলন

বাংলাদেশের উন্নয়নের বহুমুখী খাতগুলো তারুণ্যের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠবে— এটাই সবার কাম্য। কিন্তু দেশে এখন তরুণ সমাজের খুবই দুঃসময় চলছে। তাদের মধ্যে দিকনির্দশনার ঘাটতি ও হতাশা বিরাজ করছে। গুণগত শিক্ষায় পশ্চাদপদতা, জ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক গবেষণামূলক শিক্ষার অভাব, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রচণ্ড দুর্বলতা, অপুষ্টি, চাকরি ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব— এসব সমস্যা বর্তমান তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনার দ্বারকে রুদ্ধ করে রেখেছে। এ ছাড়া নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, অপরাজনীতির শিকার, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, মাদকাসক্তি, প্রভৃতি কারণে বহু তরুণ আজ বিপথগামী ও পথভ্রষ্ট।

দেশে আজ সুশাসন ও নীতিনৈতিকতার বড়ই অভাব। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে। আদর্শ নেতৃত্বের অভাবে দুর্নীতির রাজনীতি দেশে অবাধ ও দুঃশাসনের নেতৃত্ব দিচ্ছে। দলীয় ও গোষ্ঠীগত চেতনায় জাতীয় চেতনাবোধ অবলুপ্তপ্রায়। ফলে দেশের তরুণ ও যুবসমাজ আজ বিভ্রান্তি ও হতাশায় নিমজ্জিত। একটি উন্নয়নকামী সভ্য দেশের জন্য এ অবস্থা মোটেই কাম্য নয়। সোনার বাংলার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের তরুণ সমাজকে নোংরা রাজনীতি, সন্ত্রাস, নেশা ও কালোটাকার ছোবল থেকে রক্ষা করতে হবে। তাদের হাতে মাদক ও অস্ত্রের বদলে জ্ঞানের মশাল তুলে দিতে হবে। কারণ উদীয়মান তরুণ প্রজন্ম এখন দেশের বিরাট এক জনগোষ্ঠী। তাদেরকে সঠিক দিকনির্দশনা প্রদান করা আমাদের সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য।


বিজ্ঞাপন


প্রতিদিন সকালে স্কুলে যে জাতীয় সংগীত গাই সেখানে প্রমিজ করি ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। সোনার বাংলাকে কীভাবে ভালেবাসি সেটা কি ভেবে দেখেছি? তারপর ভালোবাসা ধরা, ছোঁয়া বা দেখা যায় না, শুধু হৃদয় অনুভব করা যায়। অনুভবগুলো মূলত আসে আমাদের কর্মের ফলাফলের মধ্য দিয়ে। যাই হোক সোনার বাংলা গড়তে কোন ধরনের নেতৃত্ব চায় নতুন প্রজন্ম— এ বিষয়টি আমি ভেবেছি। যার ফলস্বরূপ বিবেকের কাছে আমি প্রশ্ন করতে চাই। যেভাবে চলছে দেশ তাতে কি মনে হয় রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের ইনক্লুসিভ সংসদ সদস্যদের নেতৃত্ব প্রদানের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা আছে?

নতুন প্রজন্ম মা-বাবা থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রশিক্ষণ এবং সমাজের কাছে পারিবারিক মূল্যবোধ শিখতে পারছে কি? সততা, নিষ্ঠা, সত্যবাদিতা, স্পষ্টবাদিতা, দেশের মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, পাংচুয়ালিটি, কমিটমেন্ট, ধর্মীয় মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ইত্যাদি নতুন প্রজন্ম শিখতে চায় কি?

দেশপ্রেমিক প্রজন্মের নেতৃত্বে বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরতে হলে নতুন প্রজন্মকে মেধা, মননশীলতা, দেশপ্রেম ও মানবতার প্রেরণায় মনোবল নিয়ে অভিভাবকদের প্রত্যাশা পূরণে এগিয়ে আসতে হবে, সেটা কি সঠিকভাবে করা হচ্ছে?

অনেকে বলবে অতীতের দিনগুলো ছিল মুখর এবং নানা রঙে ভরা। সেই মুখর রঙের সুর বাজে আমার প্রাণে আজও। তবে ভেঙে গেছে সেই মধুর মিলনমেলা, ভেঙেছে সেই হাসি আর রঙের খেলা। কারণ, কোথায় কখন কবে কোন তরুণ ঝরে যাচ্ছে সমাজে সে খবর কেউ রাখছে না! মনে হচ্ছে সবকিছুর পরিবর্তন দ্রুতগতিতে চলছে। চোখের পলকে পাল্টে যাচ্ছে সবকিছু। গতকাল যা আমার কাছে নতুন বা প্রয়োজনীয় ছিল, আজ তা না হলেও চলে যাচ্ছে। কী জানি আগামীকাল কী হবে!


বিজ্ঞাপন


সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চাইলে এ ধরনের সমস্যা আসবেই। আমরা নতুন পরিবেশ ও পরিস্থিতির সঙ্গে অতি দ্রুত মানিয়ে নিতে চাই। অনেক কিছু মিস করে ফেলব এই ভয়ে দ্রুত সবকিছু পেতে চেষ্টা। এর কারণে আমাদের নানা ধরনের সমস্যারও সম্মুখীন হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

এ এক ভিন্ন সময়, করোনা মহামারি ও বিশ্বযুদ্ধের সময়। নিত্যনতুন সমস্যা আমাদের সামনে এসে হাজির হচ্ছে। এ সমস্যাগুলোর একটির চেয়ে অন্যটি ভয়ঙ্কর। করোনা ফ্যাশনের হাত থেকে আমরা কেউই কিন্তু পালিয়ে থাকতে পারছি না। কারণ হলো আমাদের হাতে ফোন, ঘরে স্যাটেলাইট টেলিভিশন। তাছাড়া ইন্টারনেটের ব্যবহার এখন এতটাই সহজসাধ্য হয়ে পড়েছে যে, কোনো কিছু থেকে রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই। সব খবর মুহূর্তের মধ্যে এসে হাজির হচ্ছে সত্য-মিথ্যা যাচাই-বাছাই ছাড়া। আমাদের সবারই এর মুখোমুখি হতে হচ্ছে অজান্তে। তারপর কোথায় কী ফ্যাশন বের হচ্ছে নিত্য-নতুন, এসব দামি উপকরণ সংগ্রহ করা সবার পক্ষে সম্ভব না হলেও আমাদের নজর পড়ছে সেখানে। যাদের অঢেল টাকা আছে কেবল তারাই এগুলো ব্যবহার করতে পারছে, বাকিরা বসে বসে স্বপ্নের রাজ্যে ডুবে মরছে।

গরিব মানুষের সন্তানেরও এসব উপকরণ ব্যবহার করার শখ হয়, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হতদরিদ্র পরিবার এগুলো সন্তানদের কিনে দিতে পারছে না। ফলে পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে এই অশান্তি সীমা অতিক্রম করে ফেলছে।

একদিকে চলছে মহামারি, যুদ্ধ। অন্যদিকে নিত্যনতুন পণ্যদ্রব্য সবকিছু দেখা এবং জানার সুযোগ রয়েছে। যেমন ঠিক তেমনিভাবে ঘরে বসেই যৌন বিনোদন দেদারছে চলছে। এটা হলো বর্তমান পরিস্থিতি, বলতে গেলে সবার ক্ষেত্রে।

Mridha_Op_Ed_Young_Generation

সবাইকে নিয়ে নয়, আজ আলোচনা করব তরুণ সমাজকে নিয়ে। অন্য সবার মতো নতুন প্রজন্ম সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পথভ্রষ্টতার দিকে এগিয়ে চলছে, হতাশার চোরাবালিতে নিমজ্জিত হয়ে তারা শেষ করে দিচ্ছে নিজেদের অস্তিত্ব। তারা ভাবছে এই পৃথিবীতে তাদের জীবন শেষের পথে। ফলে কেউ ধীরে ধীরে আর কেউ চোখের পলকে হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার জীবনে।

গোটা বিশ্বের নতুন প্রজন্মদের দেখে মনে হচ্ছে তাদের মধ্যে সর্বত্র একটা শূন্যতা, হাহাকার বিরাজ করছে। সবকিছু থাকতেও তারা সন্তুষ্ট নয়, তারা খুঁজছে কিন্তু জানে না কী। যার যত বেশি আছে সে আরও পেতে উঠে পড়ে লেগেছে। এই সমস্যা আমাদের নতুন প্রজন্ম যারা সদ্যই বয়ঃসন্ধিকাল পার করে এসেছে, তাদের জন্য প্রকট হয়ে ধরা দিয়েছে। কী কারণ জড়িত এই ক্রমাগত অধঃপতনের পেছনে তা আমরা যদি একটু খেয়াল করে দেখি তাহলে এর সত্যতা সহজেই খুঁজে বের করতে পারব।

এত কিছুর পরও বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কঠিন এবং জটিল সমস্যা জড়িত রয়েছে। তার কারণ মুখস্থবিদ্যার সঙ্গে পরীক্ষার পরিমাণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একদিকে সৃজনশীল শিক্ষার্থী তৈরির জন্য তোড়জোড় চলছে, আর অন্যদিকে পরীক্ষা নামক এক অদ্ভুত বোঝা তরুণদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, ফলে সমস্যার এই চক্র থেকে তারা কিছুতেই বের হয়ে আসতে পারছে না।

এ সমস্যা প্রাথমিক পর্যায় থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত রয়েছে। এখন যদি শিক্ষার্থী কোনো একটাতে সামান্যতম খারাপ করে, তাহলে পরিবার থেকে নেমে আসে সীমাহীন লাঞ্ছনা। তারপর তুলনা করা অন্যান্যদের সঙ্গে যার ফলে মানসিক অশান্তি অল্প বয়সে জীবনকে গ্রাস করতে শুরু করছে। বলতে গেলে বাস্তবতার নির্মম পরিহাস অলস জীবনের চাওয়া-পাওয়া সীমারেখা মস্তিষ্কের ভেতরটাকে বড় নোংরা করে দিয়েছে। কেউ বুঝতে চেষ্টা করছে না যে প্রতিটা মানুষেরই নিজস্ব সক্ষমতা আছে। তাকে বাইরে থেকে নানাভাবে চাপ দেয়া হচ্ছে এবং এই চাপের ফলে ডিম যেমন বাইরের চাপে ভেঙে যায় তেমনটি ভেঙে যাচ্ছে তরুণদের জীবনের পরিকাঠামো!

ডিম যেমন তার নিজের ভেতরের চাপে সৃষ্টি করে নতুন জীবন তেমনটি সুযোগ থেকে বঞ্চিত বর্তমান প্রজন্ম, তাই যে চেতনায় তাদের আলোর মতো বা ফুলের মতো ফুটে উঠার কথা তা না হয়ে বাইরের চাপের কারণে অঙ্কুরে বিনাশ হয়ে ঝরে পড়ছে সমাজের লাখো লাখো তরুণ। পরীক্ষায় কিংবা জীবনের যে কোনো পর্যায়ে ভালো করার যে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে তাতে করে অনেকেই অসাধু উপায়ে ভালো ফল পেতে চেষ্টা করছে। কারণ এই নতুন প্রজন্ম বাইরের চাপ না পারছে গ্রহণ করতে না পারছে সহ্য করতে। এর আসল কারণ কী? সবকিছু না চাইতে পাওয়া বা সহজে পাওয়ার কারণেই এমনটা হচ্ছে। এ যুগে কাউকেই কিন্তু কিছু পাওয়ার জন্য পরিশ্রম করতে হচ্ছে না।

জন্মের পর থেকেই তো সবকিছু তাদের হাতের নাগালে! একটি দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে যদিও এমনটি সচরাচর হচ্ছে না। কারণ তারা যে দু’মুঠো ভাতের জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছে, না জোগাড় করতে পারলে আত্মহত্যা করেছে। জীবনের শুরু থেকেই যাকে সংগ্রাম করতে হয়, সে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে দ্বিধাবোধ করে না। চাপ নেওয়ার মতো মানসিকতা যাদের তৈরি হয়নি তাদের, সামান্য চাপ দিলেই ভেঙে পড়ছে। এজন্যই আমাদের শিক্ষার্থীরা অল্প আঘাতেই ভেঙে পড়ছে, কারণ তাদের ভেতরের ক্রিয়েটিভ চিন্তাশক্তির বিলুপ্তি ঘটেছে। হতাশা এবং হাহাকার প্রজন্মের জীবনে কোনো কিছুই এদের হৃদয়ে শান্তি আনতে পারছে না। এদের চিন্তা একটাই, নতুন কিছু পাওয়া নতুন কিছু চাওয়া। এখন চাইলেই জগতের সবকিছু পাওয়ার উপায় নেই, তাই এই না পাওয়ার ফলে তারা নিমজ্জিত হয়ে হতাশার চোরাবালিতে হাবুডুবু খাচ্ছে।

এই হাহাকার প্রজন্মের অনেককেই যে তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের ধ্বংস করছে সেটাও সত্য নয়। এদের মধ্যে একটা বড় গ্রুপ আরও গুরুতর কাজ করতে শুরু করেছে। তাদের এই কাজের ফলাফল যেমন ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব ফেলছে, তেমনি সমাজের ওপরও এর প্রভাব অত্যন্ত ভয়ংকর হচ্ছে। এই গুরুতর কাজটি হচ্ছে রাজনৈতিক দলসমূহে যোগদান করা এবং একটা সময় এরা রাজনৈতিক দলসমূহের শক্তির উৎস হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে নিজের এবং দেশের বারোটা বাজাতে উঠে পড়ে লেগেছে। কারণ তারা যখন দেখে পরিবার এবং সমাজ থেকে কিছু পাওয়ার নেই, তখন অধিক পাওয়ার লোভে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করাটা বেআইনি কিছু না। তারা ভাবছে এভাবেই তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করা সম্ভব হবে।

এখন যদি দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা হয় তাহলে দেখা যাবে মিছিল, মিটিং, সমাবেশ কিংবা তথাকথিত বড় ভাইদের মনোরঞ্জনের জন্য এই হাহাকার প্রজন্ম সব সময় ঝাঁপিয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য এদের ব্যবহার করা হয় প্রতিনিয়ত। বড় দলগুলোর জন্য যেহেতু তারা বিরাট এক শক্তি তাই তাদের দলে ধরে রাখার জন্যও বেশ তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়।

এভাবেই এই প্রজন্মের হাতে নারী, অস্ত্র এবং মাদকের মতো ভয়াবহ ব্যাধি তুলে দেয়া হচ্ছে। দেশের ছাত্র রাজনীতি এভাবে অর্থনীতিতে পরিণত হয়ে চলেছে। রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় এদের নৈতিকতার ধ্বংস এবং বিবেকের অবক্ষয় হচ্ছে। হতাশার অন্ধকারে ডুবে থাকা বিরাট এক জনগোষ্ঠীকে হাতে রাখার জন্য নারী, অস্ত্র এবং মাদকের চেয়ে কার্যকর আর কিছু কি থাকতে পারে!

এভাবে দেশে লাখো লাখো প্রজন্ম প্রতিনিয়ত নষ্ট হচ্ছে যা দেশের ক্ষমতাসীন প্রশাসন এবং সরকার জানে। সমাজ কিংবা রাষ্ট্র তেমন বিশেষ কিছু এদের জন্য করছেও না। এসব দেখেও না দেখার ভান করছে। হতাশাগ্রস্ত এই তরুণদের একটা বড় অংশ বর্তমানে মোবাইলের মধ্যে পর্ণ, গেমসের প্রতিও আসক্ত হয়ে পড়েছে। এটা মাদক আসক্তির চেয়েও ভয়াবহ হতে চলছে দিনের পর দিন।

এদের চিন্তায় বিরাট এক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই রোগে তরুণ, বৃদ্ধ সকলেই আক্রান্ত। কোনো কিছু তলিয়ে দেখার অবকাশ কারো নেই। তারপর একদল ভণ্ড ধর্মের নামে নানা ধরনের উস্কানি দিয়ে তরুণ সমাজকে নষ্ট করছে। ধর্মকে বিক্রি করে, আখেরাতের ভয় দেখিয়ে ভণ্ডামি করে নিজেদের জীবন গড়ে তুলছে সাথে শেষ করছে নতুন প্রজন্মের আশার আলো।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আজ এদের জীবনের একটা বড় অংশ দখল করে রেখেছে। জোর করেও একে কাঁধ থেকে নামাতে পারা সম্ভব না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো ঘটনা যখন সামনে আসছে তখন অতি দ্রুত দুটো পক্ষ তৈরি হচ্ছে এবং নিজেদের মতামত প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে এরা পরস্পরকে তীর্যকভাবে আক্রমণ করছে। ক্ষেত্রবিশেষে এটা ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে। বাংলাদেশে সম্প্রতি আমি যে বিষয়টি বেশি লক্ষ্য করছি এবং কষ্ট পেয়েছি সেটা হলো, কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যুতে ‘হা হা’ রিঅ্যাক্টের বন্যা। এই প্রতিযোগিতায় আমাদের তরুণ প্রজন্ম পুরোপুরি সোচ্চার। যেন এটা ছাড়া তাদের আর কোনো কাজই নেই! একজন মানুষের মৃত্যুতে কেন খুশি হতে হবে, বিষয়টা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। আমাদের মতের দ্বিমত হতেই পারে তাই বলে তার মৃত্যুর সময়ে আমি খুশিতে উদ্বেলিত হয়ে উঠব! এই সংকটের পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী আমাদের দেশের নোংরা রাজনীতি। তরুণদের এই পথ দেখিয়েছে রাজনৈতিক নেতারা। কারণ তারাই প্রতিপক্ষের মৃত্যুতে খুশি হয়ে ওঠে! বিপক্ষ দলের কারও মৃত্যুতে তাকে নিয়ে ঠাট্টা করা কিংবা মিষ্টি বিতরণ করে উল্লাসে মেতে ওঠার শিক্ষা তো রাজনীতিবিদরাই দিয়েছেন!

জনগণ তাদের প্রতিবাদের শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। যে কোনো বিষয়ে প্রতিবাদ করার সুযোগ খুবই সীমিত। যারা কারও মৃত্যুতে খুশি হয়ে ওঠে তারা কি তাহলে ধারণা করে এটাই প্রতিবাদের ভাষা? আরও একটি বিষয় বেশি লক্ষণীয় তা হলো ছেলে-মেয়েরা পরিবার থেকে দিনে দিনে দূরে সরে যাচ্ছে। পিতা-মাতা কিংবা ভাই-বোনের সঙ্গে যদি সম্পর্ক সুগভীর না হয়, তাহলে পথভ্রষ্ট হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। পরিবারের লোকেদের চেয়ে ভালো বন্ধু কেউই হতে পারে না এটা যেন সবাই ভুলতে বসেছে। এখনো সময় আছে ঘরে ফিরে আসার। ভালোবাসা এবং সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে পরিবারের দরকার। যে সমাজে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল সেখানে শান্তির দেখা পাওয়া কঠিন। তাই সকল সমস্যার সমাধান এক সঙ্গে করা সম্ভব নয় তবে শুরু হতে পারে সবার আগে পরিবারের কাছে ফিরে আসা।

পিতা-মাতার দায়িত্ব হবে তার সন্তানকে বুকে আগলে রাখা। তা না হলে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে চোখের সামনে। শুধু চেয়ে দেখবে সবাই কিছুই বলার বা করার থাকবে না শেষে। যে প্রজন্মের বুকে অসুস্থ চাওয়া-পাওয়া আর হাহাকার এসে বাসা বেঁধেছে তাদেরকে হৃদয়ের মাঝে ফিরিয়ে এনে সুস্থ করে তোলার দায়িত্ব এখন সবার।

সুস্থ এবং সৃজনশীল সমাজ পেতে বর্জন করতে হবে দুর্নীতি আর অর্জন করতে হবে সঠিক এবং সুশিক্ষা। ‘পারিব না এ কথাটি বলিও না আর, কেন পারিবে না তাহা ভাবো একবার।’ তরুণদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ এখনো অনেক দূরে। বাঙালি জাতি স্বাধীন হলেও এবং দেশের অনেক উন্নতি হলেও এর সুফল সবাই ভোগ করতে পারছে না। মুষ্টিমেয় ক্ষমতাবানরা এর সুফল ভোগ করছে, যা স্বাধীনতার চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক সুবিচার ছিল স্বাধীনতার চেতনা। এ চেতনা থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছে আমাদের সমাজ। প্রভাবশালীদের অনৈতিক কার্যকলাপ আমাদের স্বাধীনতাকে কালিমাযুক্ত করছে। তরুণরা কখনো এটা প্রত্যাশা করে না।

তাদের প্রত্যাশা হলো, দেশে স্বাধীনতার মৌলিক চেতনা ফিরে আসুক। সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার আর মানবিক মর্যাদায় সিক্ত হোক আমাদের সমাজ। প্রত্যেকের মাঝে জাগ্রত হোক মানবিক চেতনা ও মূল্যবোধ। স্বাধীন দেশ হয়ে উঠুক নিরাপদ আশ্রয়স্থল। প্রত্যেক নাগরিক হয়ে উঠুক মানবিক মানুষ সেই সাথে তারা ভুলে যাক সকল রাজনৈতিক দল। তারা গড়ে তুলুক দেশ গড়ার দল, যে দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক খেলা হবে, যে খেলার মধ্যে থাকবে কে কত ভালো পারফরমেন্স করছে তার দেশের পরিকাঠামো এবং অবকাঠামোকে শক্ত ও পরিপক্ষ করতে।

রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। [email protected]

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর