মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

আমার অনেক ঋণ আছে!

জয়দেব ভদ্র
প্রকাশিত: ৩০ জানুয়ারি ২০২৪, ০৫:৫৫ পিএম

শেয়ার করুন:

আমার অনেক ঋণ আছে!

দিন তারিখ সঠিক মনে নেই। ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকেই হবে। রাত দশটার দিকে ফিরেছি সাময়িক আবাস শহীদ স্মৃতি হল, বুয়েটে। ক্যান্টিনের কাছে সুমি ভাইয়ের সাথে দেখা। চলো চা খাই। সুমি ভাইয়ের মুখের স্বভাবসুলভ চাপা হাসি। তবে আজ আরও উজ্জ্বল মনে হচ্ছে।

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, "তোমার একটা ভালো খবর আছে।" আমি বললাম, বাসা পাওয়ার খবর? না, চাকরির। "চাকরির? কোনো চাকরির পরীক্ষাই তো দেইনি!" আমার অবাক হওয়ার পালা। "পরীক্ষা তো দিয়েছিলে, ১৮তম বিসিএস এর ভাইভা দিয়েছিলে না? সেটাতেই চাকরি হয়েছে।" "ফাইজলামি বাদ দেন মিয়া, বিসিএস এর রেজাল্ট হয়েছে মাস তিনেক আগে, জুনের ২৯ কি ৩০ তারিখে। চাকরি হলে কি টিউশনি করি, না আপনার কাঁধে চেপে থাকি? কোন বাসা কনফার্ম হয়েছে বলেন, আজিমপুর না নিউ পল্টন লাইন?

সত্যিই জয়দেব, তোমার ১৮ তম বিসিএস-এ চাকরি হয়েছে, পুলিশে। চলো রুমে। নিজেই দেখতে পাবে। বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে তিনি যে ফাইজলামি করছেন না, তা নিশ্চিত বোঝা যায়। তাছাড়া ফাইজলামি তার চরিত্রের সাথেও যায় না। "রুমে কি পিএসসির চেয়ারম্যান বসে আছেন? আমি গেলে বলবেন, তোমাকে চাকরি দিলাম ১৮তম বিসিএস-এ।" স্বভাবসুলভ মৃদু হাসি সুমি ভাইয়ের।

ছোটবেলা থেকেই ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যেই মানুষ। আবাল্য আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক সকল ক্ষেত্রেই প্রতিকূল অবস্থার মোকাবিলা করতে হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষকরাও জীবনী শক্তির পরীক্ষা কম নেননি। ক্লাস ওয়ান থেকে টু তে ওঠার সময় রোল নাম্বার হল ৩, ক্লাস করতে যেয়ে দেখি রোল নাম্বার ৭। পারিবারিক শত্রুতা বসত ক্লাস সেভেনের অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষায় এক শিক্ষক একশতে ৩৬ নম্বর দিয়ে ক্লাসে অনেক উপহাস করলেন। উচ্চ মাধ্যমিকে রাজনৈতিকভাবে বিকারগ্রস্ত রসায়নের শিক্ষক পণ করেছিলেন প্রাকটিক্যাল ফেল করাবেন। অনার্স ফাইনালে প্রাকটিক্যালের এক পেপারে ফেল করিয়েই ফাস্ট ক্লাস বঞ্চিত আরেক শ্রদ্ধেয় শিক্ষক। অন্যরাও সুযোগ নিয়েছে তাদের মতো করে। তারপরও দেবদাস না হয়ে জয়দেব রয়ে গেছি! 

অসংখ্যবার ছাগলে, গরুতে মুড়ে খাওয়ার পরও কিছু কিছু গাছ যেমন টিকে যায়, আমার অবস্থাও ঠিক তেমনি। উজানে নাও বাওয়াই নিয়তি। তাই পশ্চিম আকাশে হঠাৎ করে ধেয়ে আসা কালো মেঘ কিংবা ১০ নম্বর ঘূর্ণিঝড়ের মহাবিপদ সংকেত শরীর-মনে তেমন ভীতি সঞ্চার করে না। শুধু নিরবে চোয়াল দুটো শক্ত হয়, আর একটা লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য তৈরি হয় মন। কিন্তু কারো স্নেহ-ভালোবাসার ছোঁয়া পেলে ভেতরটা ভেঙে খান খান হয়ে যায়, সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও থাকেনা।  

এ বৈশিষ্ট্য উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া।  মানুষের স্বভাব-চরিত্রের অন্তত ৮০ ভাগ আসে বাবা-মার কাছ থেকে। পরিবার-সমাজ-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিলে বাকি ২০ ভাগ। বাবা ছিলেন দুঃসাহসী, ক্ষেত্রবিশেষে অপরিণামদর্শী। বাঁশের লাঠি নিয়ে কামানের মোকাবিলা করতে তার বুক কাঁপত না। তাই হয়তো শত্রুতা-উপেক্ষা-অবজ্ঞা-দুঃসময়কে খুব চেনা, আপনজন বলেই মনে হয়েছে সব সময়।

"রুমে চলো, রুমে গেলেই তোমার বিশ্বাস হবে।" বলে কি লোকটা! কিভাবে সম্ভব! জুনের দিকে আমরা কলাবাগানে বশির উদ্দিন রোডের একটা বাসায় থাকতাম। আমি ছাড়া বন্ধুরা সবাই উত্তরবঙ্গের। ওরা কলেজ জীবন থেকেই বন্ধু, কারমাইকেলের এইচএসসি সকলেই। বিসিএস এর চূড়ান্ত রেজাল্ট হওয়ার খবর পেয়ে রাত ১ টায় কলাবাগান মোড় থেকে সবাই মিলে ইত্তেফাক কিনে আনি। লায়নের (এরশাদুল হক, যুগ্ম সচিব, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়) রোল নম্বর পাওয়া গেল। এডমিনে হয়েছে। আমারটা পেলাম না। বিচার ক্যাডারের রেজাল্ট আগেই হয়েছিল, সেখানে মাহবুবের (নির্বাচন কমিশনের কর্মরত) হয়েছে। লায়ন, শহীদ, শাজাহান, নওশাদ- ওরাও দেখলো। আমার রোল নাম্বার, বন্ধুদের আরও দু'চারটে রোল নাম্বার খোঁজার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। এখন প্রায় তিন মাস পরে এসে সুমি ভাই বলছে আমার চাকরি হয়েছে! ফাইজলামির একটা সীমা থাকা উচিত! জাবেদ হাসান সুমি, বগুড়ার মানুষ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বড় ভাই। সত্তিকারের বড় ভাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষের বছরগুলি তার সান্নিধ্য ও সহায়তা ছাড়া চিন্তাও করতে পারিনা, ঢাকায়ও এই দুঃসময়ে আশ্রয় দিয়েছেন পরম আনন্দে।

লায়ন বিসিএস রেজাল্টের পর রংপুর চলে যায়। বইপত্রসহ আনুষঙ্গিক যা ছিল আমাকে দিয়ে যায়, যাতে পরবর্তী বিসিএস এর জন্য প্রস্তুত হতে পারি। কাউকে বুঝতে না দিলেও কিছুটা যে আশাহত হইনি, তা নয়। প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষা ভালো না দিলেও, ভাইভাটা ছিল অসাধারণ!
কিভাবে যেন আলোচনাটা চলে গিয়েছিল তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব এবং বিশ্ব রাজনীতির দিকে। ৩০ মিনিটের উপরে বোর্ডে ছিলাম, এর চেয়ে ভালো ভাইভা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। অনুভূতি ছিল স্টাডি সার্কেলে বক্তৃতা দেওয়ার মতোই।

শাহজাহান, নওশাদ, শহীদ, শামীমদের সাথে ভালোই সময় কাটছিল। খাই-দাই, আড্ডা দেই, ফ্লোরে ঘুমাই (বাসায় কোনো খাট-চৌকি ছিল না) এত বছর পরে শহীদের প্রেম হয়েছে (সুদর্শন শহীদ যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোনো প্রেম করেনি সেটির সাক্ষী আমি নিজেই)। মুমু ইডেনের ছাত্রী। সেই সুবাদে আমরাও মাঝে মাঝে ইডেনের সামনে আড্ডা দেই। সন্ধ্যায় নিউমার্কেটের বুক কর্ণারে রাবি বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফিরে আসি কলাবাগানে। বৃহস্পতিবার চলে যাই নারায়ণগঞ্জে হাসানের কাছে। শুক্রবার সারাদিন জমজমাট আড্ডা দিয়ে, তাস খেলে রাতে ফিরে আসি। এই সুখের জীবনে বাধ সাধল ভয়াবহ বন্যা। মিরপুর রোড, পান্থপথ, গ্রীনরোডসহ ঢাকা শহরের অনেক জায়গায় নৌকা চলে। নারায়ণগঞ্জের চাষাড়া থেকে নৌকা নিয়ে ভূইয়াপাড়া হাসানের বাড়ি। সেখানে থেকে কখনো নিতাইগঞ্জে কখনো মাসদাইরে হোসেনদের বাসায় বন্ধুদের আড্ডায় যাই নৌকায়। কামরুল, হোসেন, সেলিম, রাশীদ, টিপু, পিন্টু, তাপস, রেশাদ, মোস্তফা, সাইফুল, রবি, নিতাইদা- অন্যরকম ছিল সেইসব আড্ডা। রাজপথে নৌকাডুবির শিকারও হয়েছি বেশ কয়েকবার। কলাবাগানের বাসায় গলা পানি। চাচা আপন প্রাণ বাঁচা। যে যার মতো জায়গা দেখ। 

আমি গিয়ে উঠলাম বুয়েটের শহীদ স্মৃতি হলে। সুমি ভাই এমফিল/ পিএইচডির ছাত্র হিসেবে ওখানে আছেন। টিউশনিতে তখনই ১০ হাজারের উপরে পাই (আমরা বিসিএসের চাকরিতে যোগ দিয়েছিলাম ৪৩০০ টাকা স্কেলে)। সময়ের হিসেবে টাকার অংকটা বেশ ভালোই। পুরান ঢাকায় শিয়া কমিউনিটিতে পড়াই। বন্ধু আবিদ রিজভী এই সংযোগ ঘটিয়েছে। 

পড়াই আর বাসা খুঁজি। দুই তিন রুমের একটি বাসা খুব দরকার। হাসান এবং কল্লোলকে নিয়ে আসব বাসায়। তারপর একসাথে তিনজন মিলে বিসিএস এর প্রস্তুতি নিব। হাসান (বর্তমানে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে উচ্চ পদে কর্মরত) নারায়ণগঞ্জ থেকে সাত রাস্তায় অফিস করে আর কল্লোল (জামাল আবু নাসের, বর্তমানে এজিএম রূপালী ব্যাংক) আজিজ মার্কেটের উপরে যুবক অফিসে চাকরি করে। বেতন সামান্যই, গাধার খাটুনি। তিনজন যদি একসাথে থেকে পড়তে পারি তাহলে তিনজনেই বিসিএস কোয়ালিফাই করব একসাথে- এ আমার বিশ্বাস। 

কিন্তু ব্যাচেলর এর জন্য বাসা ভাড়া পাওয়া খুব কঠিন। To-let ধরে ধরে যাই, বাড়িওয়ালা প্রথমে আগ্রহ দেখায়, ব্যাচেলার শোনার পরে বলে পরে জানাবে। সুমি ভাইয়ের ঠিকানা দিয়ে চলে আসি। এ কারণে সুমি ভাই যখন বলল ভালো খবর আছে, খুব খুশি হয়েছিলাম। হয়তো কোনো বাড়ির মালিক সুসংবাদ রেখে গেছে! 

"Profession by choice,  not by chance" অনেক বন্ধুদের গর্বের সাথে উচ্চারণ করতে দেখি। হয়তো গর্ব করার মতো বিষয়ও, তবে আমার বোঝার সামর্থ্য নেই। আমি না বুঝলেই যে সেটা সঠিক হবে না, তাও তো নয়। তারপরও মনে হয়, পেশা নিয়ে কি সত্যিই গর্ব করার মতো কিছু আছে?  আমরা কি আসলেই নিজের পছন্দমতো পেশা বেছে নিতে পেরেছি? জন্ম-মৃত্যুর কথা বাদই দিলাম। লেখাপড়া থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত কতটুকু আমরা পরিকল্পনা মতো করতে পেরেছি? পারিই বা কতটুকু? এখনও তো প্রতিদিন ভাবি এক, হয় আরেক। তাছাড়া পেশা তো শুধুমাত্র জীবিকা অর্জনের একটি উপায় মাত্র। আমি যদি এই পেশায় না আসতাম, তাহলে কি আমার জীবন ব্যর্থ হতো? অন্যান্য পেশাজীবীদের কাজ কি আমারটার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ? কম মর্যাদাপূর্ণ?  মানুষ হয়ে ওঠাই কি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়? কাজী নজরুল ইসলাম যে ব্যাটেলিয়ানে হাবিলদার ছিলেন তার কমান্ডিং অফিসার কে ছিলেন, জানেন কেউ? আব্বাসউদ্দীন রাইটার্স বিল্ডিংয়ের কেরানি ছিলেন, সচিবের নাম কারো জানা আছে?

মাঝে মাঝে সবকিছুই কেমন যেন রহস্যময় লাগে। কোনো অদৃশ্য সুতার নিয়ন্ত্রণ নেই তো? জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সবকিছুই তো অনিশ্চিত! মানি বা না মানি, এক অদৃশ্য সংযোগকে অনুভব করেছি জীবনের বাঁকে বাঁকে। প্রবল ঝড়ে প্রদীপটা যখন নিভু নিভু, ঝড় প্রবলতর হওয়ার আশঙ্কা, হঠাৎ করে আমাকে অবাক করে দিয়ে ঝড় থেমে গেছে! কখনও গভীর অন্ধকারে জোনাকিও পথ দেখিয়েছে। তা না হলে আমার তো স্কুল-কলেজের গণ্ডিই পেরোনোর কথা না। বিসিএস এর চাকরি প্রাপ্তির পরতে পরতেও সেই অলৌকিক স্পর্শের ব্যতিক্রম হয়নি। 

১৯৯৬ সাল। ক্যাম্পাসে আগের মতো আর ভালো লাগেনা। কেমন যেন বিষন্নতায় ভরা। থিসিসের জন্য রয়ে গেছি। জেনারেল ব্যাচের বন্ধুরা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছে। কলা, বাণিজ্য, আইন অনুষদের বন্ধুরা চলে গেছে আরও আগে। কোনো কোনো ডিপার্টমেন্টের এক ব্যাচ জুনিয়ররাও ক্যাম্পাস ত্যাগ করেছে।  ক্যাম্পাস যেন এক ভাঙ্গা হাট! এক সময় যেদিকে তাকাতাম পরিচিত মুখ, প্রিয়জন। সেই ক্যাম্পাসে এখন নিজেকেই অচেনা মনে হয়! কফি হাউজের সেই আড্ডা'র মতোই।  লিটন (জাহাঙ্গীর আলম সাউদ, অধ্যাপক, প্রাণ রসায়ন বিভাগ, রাবি), হাসান, জাহাঙ্গীর, উজ্জ্বল, আমি আর কল্লোল-গুটিকয়েক প্রাণী একসঙ্গে থাকি। তারপরও বারোটার আগে হলে ফেরা হয় না। তারপর আরও ২/৪ ঘণ্টা আড্ডা। ঘুমাতে ঘুমাতে চারটা, পাঁচটা। সকাল ১০টা/ ১১টায় উঠে সিলসিলায় নাস্তা করা। নিরুত্তাপ, শান্ত জীবন।

বিসিএস এর ফরম তোলা, জমা দেওয়া; সবটাই করেছে গৌর। আলাদা কোনো প্রস্তুতি ছিল না। কোনো গাইড কিনিনি, বিসিএস এর জন্য পড়তেও বসিনি কোনোদিন। তবু বিশ্বাস ছিল চাকরি হোক বা না হোক, অন্তত প্রিলি, লিখিত পরীক্ষা এমনিতেই পার হয়ে যাব। সেই পঞ্চম- ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে গোগ্রাসে পড়া অপাঠ্য(!) বইগুলিই সাহস যোগাতো। কিন্তু আত্মবিশ্বাসে প্রচন্ড ধাক্কা খেলাম প্রিলির মাত্র ২ দিন আগে। 

এক বড় ভাই হলে এসে উঠলেন। সাথে একাধিক বিসিএস গাইড। এখানে এসেও বই থেকে মুখ তোলেন না। কিন্তু গভীর সাধনার ফাঁকেও আমাদের বিশৃঙ্খল জীবনযাত্রা তাদের নজর এড়ালো না। "তোমরা বিসিএস দিচ্ছো না?" মাথা চুলকে বললাম, "দাদা, আবেদন তো করেছি।" "পড়াশোনা করো না, রুমে কোনো বই পর্যন্ত নাই, বিসিএস কি ছেলেখেলা নাকি?" হয়ে যাবে একভাবে-আমার উত্তর। হো হো করে হাসলেন, এতই সহজ? এরপর তার কথামতো গাইড থেকে তাকে প্রশ্ন করা শুরু করলাম।  ছিলেন গণিতের ছাত্র কিন্তু অবলীলায় বাংলা-ইংরেজি-ইতিহাস-উদ্ভিদ বিজ্ঞান-প্রাণিবিজ্ঞান-রসায়ন বিজ্ঞান সকল প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যেতে লাগলেন। প্রাণিবিজ্ঞান, উদ্ভিদ বিজ্ঞানের কঠিন কঠিন বৈজ্ঞানিক নামেও এতকটু ভুল করলেন না। পুরো গাইড মুখস্থ! আমি বিস্ময়ে হতবাক! এর ৫% বিদ্যাও আমার নেই। দাদার এই নিয়ে তৃতীয়বার। তারপরেও তিনি আত্মবিশ্বাসী নন। বিসিএস এতই কঠিন! দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাটা আমার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া, সেটা আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার ক্ষেত্রে হলেও।  সিদ্ধান্ত নিলাম, এবার আর না। পড়াশোনা করে পরের বার দেখব।

প্রিলি পরীক্ষা ছিল তিনটার দিকে। দুপুরে রাজশাহী কলেজের জুনিয়র একটা গ্রুপসহ লাঞ্চ করছি সাহেব বাজারের জোনাকিতে (অনেকটা ঢাকার নিরব এর মতোই)। হবু আমলাদের ভিড়ে জায়গা পাওয়া কঠিন। টলিন (মাহবুবা সুলতানা, জয়পুরহাট) বলল, দাদা তোরও তো পরীক্ষা? "এবার দেবো না, সাথে এডমিটও নেই"। কোনো যুক্তিতে কাজ হলো না।  কোনো আপত্তিই টিকলো না। আমাকে ওর বন্ধুদের সাথে রাজশাহী কলেজের হোস্টেলে বসিয়ে রেখে  ক্যাম্পাসে যেয়ে আমার রুম থেকে প্রবেশপত্র নিয়ে আসলো। পরীক্ষার হলে ঢুকলাম, ততক্ষণে পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে।

সেদিনও নিয়ম ভাঙিনি। হলে ফিরেছি যথারীতি রাত বারোটার পর। আবার দাদার কবলে পড়লাম। দাদাকে ঘিরে ছোটখাটো একটি জটলা। রীতিমতো গবেষণা চলছে প্রশ্নপত্র নিয়ে। যাকে পাচ্ছেন তাকে নিয়েই বসছেন। এ পর্যন্ত হয়তো কয়েকশো বার পর্যালোচনা হয়েছে। পরীক্ষা দিয়েছো? মাথা নাড়লাম। পরীক্ষার পর কয়টা পারলাম, না পারলাম-এটা দেখা আমার ধাতে নেই। প্রশ্নপত্রও রাখি না, ফেলে দেই। শাহ আব্দুল করিমের "যা হওয়ার তা হয়ে গেছে" নীতিতে বিশ্বাসী। কিন্তু দাদা নাছোড়বান্দা। তাকে ভোলানো গেলো না কিছুতেই। নানাভাবে জিজ্ঞাসাবাদের পর দাদা ঘোষণা দিলেন, "তোমার ৭২টা হয়েছে।" 

আমার বিশ্বাস ছিল দাদার কোনো ভুল হয়নি, ১০০টাই হয়েছে। তাই প্রিলির রেজাল্টে দাদার রোল নাম্বার না পেয়ে হতভম্ব হয়ে যাই। বিসিএস গাইড এবং এটিদেবের ডিকশনারি মুখস্থ এরকম বহু মেধাবীদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে এই পরীক্ষা পদ্ধতি ব্যর্থ হয়েছে বলেই আমার বিশ্বাস।

সুমি ভাইয়ের সাথে রুমে যেয়ে সত্যি সত্যি বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। আমার ঠিকানা লেখা পিএসসির খাম। জয়দেব ভদ্র, পিতা: অমর কৃষ্ণ ভদ্র, গ্রাম +ডাক- মাহমুদকাটী, পাইকগাছা, খুলনা। রোল নম্বর-৭৮৩৮১। চূড়ান্তভাবে পুলিশ ক্যাডারে নির্বাচিত। স্বাস্থ্য পরীক্ষার চিঠি। মাত্র সপ্তাহখানেক পরেই স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বক্ষব্যাধি হাসপাতালে। বাবা আমার বাল্যবন্ধু আশীষকে দিয়ে পাঠিয়েছে চিঠিটা।

অবিশ্বাস, বিস্ময়, আনন্দ সব মিলিয়ে অবর্ণনীয় এক অনুভূতি! কিভাবে সম্ভব! ৩ মাস আগে কয়েকজন মিলেই তো ১০৮টা নীল পদ্ম খোঁজার মতো তন্ন তন্ন করে রোল নাম্বার খুজলাম! এখন কোথা থেকে আসলো এই চিঠি? ভয়াবহ বন্যার মধ্যে কিভাবে ডাক বিভাগ এই চিঠি পাঠালো সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রত্যন্ত গ্রামে! কোনোভাবে যদি মিস হতো! 

আজ আমি কার কাছে ঋণ স্বীকার করব? গৌর এর কাছে? টলিনের কাছে? লায়নের কাছে? হাসানের কাছে? সুমি ভাইয়ের কাছে? সেইসব শিক্ষকদের কাছে, যারা প্রথম, দ্বিতীয়বর্ষে ফাস্ট প্রথম হওয়া ছাত্রটিকে ফেল করানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন (তারা এটা না করলে হয়তো আমার পেশাগত পরিচয় ভিন্ন হতো)।  নাকি ডাক বিভাগের কাছে?

নির্ঘুম একটা রাত কাটালাম। কতো স্মৃতি! দৃশ্যের পর দৃশ্য সিনেমার মতো চলে গেল! বেশিরভাগই দারিদ্র্যক্লিষ্ট একটি প্রান্তিক পরিবারের দীর্ঘ, ক্লান্তিকর জীবন সংগ্রামের। 

সকালে বাড়ি রওনা দিলাম। ছোটবেলা থেকেই পা ছুঁয়ে আমি সাধারণত কাউকে প্রণাম করি না। বাবা-মাকেও শেষ কবে প্রণাম করেছি মনে নেই। কিন্তু আজ আমার জনম দুখিনী মা এবং নিঃসঙ্গ শেরপার মতো লড়াই করে যাওয়া বাবাকে দেখার জন্য মনটা হু হু করতে লাগলো। একবার তাদের প্রণাম করতেই হবে।

লেখক: ডিআইজি, পুলিশ হেডকোয়ার্টারস

(লেখাটি তার ফেসবুক ওয়াল থেকে নেওয়া। )

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর