শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

মৌমাছির অবাক করা জগৎ: যৌনজীবন, জন্মরহস্য ও মধুচক্রের অদেখা গল্প

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৪১ পিএম

শেয়ার করুন:

মৌমাছির অবাক করা জগৎ: যৌনজীবন, জন্মরহস্য ও মধুচক্রের অদেখা গল্প | Bee Life Cycle and Honey
মৌমাছির অবাক করা জগৎ: যৌনজীবন, জন্মরহস্য ও মধুচক্রের অদেখা গল্প।

প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি হলো মৌমাছির সমাজ, যেখানে লুকিয়ে আছে জীবন ও মৃত্যুর অদ্ভুত সব রোমাঞ্চকর অধ্যায়। একটিমাত্র রানী মৌমাছিকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে পুরো মৌচাক। এই ক্ষুদ্র প্রাণীদের সমাজব্যবস্থায় লুকিয়ে আছে জন্ম, যৌনজীবন এবং মধু তৈরির এক অবিশ্বাস্য ও কঠোর বাস্তবতার গল্প।

নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও মিলনের আকুতি

মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও পুরুষ মৌমাছির স্ত্রী মৌমাছির সাথে মিলন করার ঘটনাটি সৃষ্টিকর্তার বিধান অনুযায়ী ঘটে থাকে। স্ত্রী মৌমাছির সাথে যৌন মিলন করলে সক্ষম পুরুষ মৌমাছির মৃত্যু যে অবধারিত, তা তারা জেনেই এগিয়ে যায়। বিশেষ কারণে পুরুষ মৌমাছি মিলনের জন্য পাগল হয়ে ওঠে, যা মূলত স্ত্রী মৌমাছির কৌশলগত আহ্বানের ফল। একটি মানুষকে মারতে হলে মৌমাছির প্রায় ১১০০ হুলের বিষের প্রয়োজন হয়।

beee

অলস পুরুষ ও রাণীর রাজত্ব

একটি মৌচাকে সাধারণত একটিমাত্র স্ত্রী মৌমাছি বা রানী মৌমাছি থাকে, যাকে কেন্দ্র করেই সবকিছু পরিচালিত হয়। রানী মৌমাছির কাজ হলো খাওয়া, ঘুমানো, পুরুষ মৌমাছিকে প্রলুব্ধ করা এবং সময়মতো ডিম পাড়া। গর্ভধারণের পর সে প্রতিদিন ১৫০০ থেকে ২৫০০ ডিম দেয়। অন্যদিকে, সক্ষম পুরুষ মৌমাছির স্বভাব বেশ অদ্ভুত ও অলস। তারা জীবনে কোনো কাজ করে না এবং কর্মী মৌমাছির করা আয় থেকে মুখের খাবার পর্যন্ত কেড়ে খায়। তাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য থাকে রানীর সাথে মিলিত হওয়া এবং এজন্য তারা অন্যান্য পুরুষের সাথে লড়াই করে।

আরও পড়ুন: শত বছরের অদ্ভুত ‘প্রেমের বাজার’

পুরুষ ধর্মসভা ও দি মিটিং ফ্লাইট

মৌমাছির মিলন মৌসুমে প্রতিদিন দুপুরবেলা চাকের সর্বাধিক সক্ষম পুরুষ মৌমাছিগুলো একটি নির্দিষ্ট স্থানে ভিড় জমায়, যাকে বলা হয় পুরুষ ধর্মসভা। ঠিক একই সময়ে সুযোগ বুঝে চাক থেকে রানী মৌমাছি ঘুরতে বের হয়, যা ‘দি মিটিং ফ্লাইট’ নামে পরিচিত। ধর্মসভা এলাকায় প্রবেশ করে রানী তার শরীর থেকে বিশেষ এক গন্ধ ছড়ায়, যা শত শত পুরুষ মৌমাছিকে উত্তেজিত করে তোলে। এরপর রানী উন্ত অবস্থায় পছন্দমতো পুরুষের সাথে মিলিত হয় এবং পর্যায়ক্রমে ১৮ থেকে ২০টি পুরুষ মৌমাছির সাথে মিলিত হতে পারে।

Bee-Facts-What-Makes-Honeybees-So-Special-jpg

ড্রামাটিক সেক্সুয়াল সুইসাইড

যৌন মিলনের সময় পুরুষ মৌমাছির এন্ডোফেরাস বা যৌনাঙ্গ ভেঙে যায় এবং তখনই তার মৃত্যু হয়। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেই তারা মিলনের জন্য পাগল হয়ে যায় বলেই একে বলা হয় ‘দি ড্রামাটিক সেক্সুয়াল সুইসাইড’। এছাড়া রানী মৌমাছি কখনো চায় না তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকুক। ডিম থেকে কোনো শিশু স্ত্রী মৌমাছি জন্মালে কর্মী মৌমাছিরা তাকে রানীর চোখের আড়ালে লুকিয়ে রাখে। রাণীর নজরে পড়লে তার নিশ্চিত মৃত্যু হয়, কারণ দুই রাণীর মধ্যে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। যুদ্ধ শেষে একজন অপরজনকে হত্যা করে কর্তৃত্ব গ্রহণ করে অথবা দুজন আলাদা হয়ে পৃথক দুটি চাক গড়ে তোলে। তবে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে রানী মারা গেলে ১৫ মিনিটের মধ্যে কর্মী মৌমাছিরা নতুন রানী তৈরির উদ্যোগ নেয়।

unnamed_16df0268-7a62-4b37-a8d9-1973a482571b

কর্মী মৌমাছির অক্লান্ত পরিশ্রম ও মধুচক্র

কর্মী মৌমাছিরা অত্যন্ত পরিশ্রমী। আনুমানিক ১ কেজি মধু সংগ্রহের জন্য ১১০০ কর্মী মৌমাছির প্রায় ৯০ হাজার মাইল পথ ঘুরতে হয়, যা চাঁদের কক্ষপথের প্রায় তিনগুণ। এছাড়া ১ কেজি মধুর জন্য শ্রমিক মৌমাছিদের প্রায় ৪০ লাখ ফুলের পরাগরেণু স্পর্শ করতে হয়। ভালো মৌসুমে একটি পূর্ণাঙ্গ চাকে প্রায় ৫৫ কেজি মধু জমা হয়। ৫০০ গ্রাম মধু তৈরিতে ২০ লাখ ফুল লাগে এবং একজন শ্রমিক মৌমাছি তার সারা জীবনে মাত্র আধা চা চামচ মধু তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, মানুষেরা এক মুহূর্তের মধ্যে চাক কেটে মধু সংগ্রহ করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, পৃথিবীতে মধু একমাত্র খাদ্য যা কখনোই পচে না।

এজেড

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর