ঢাকা মহানগর ও শহরতলীর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ, স্বচ্ছ ও আধুনিক করতে কাউন্টারভিত্তিক ও ই-টিকিটিং পদ্ধতিতে বাস পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতি ও ঢাকা মেট্রপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে একটি দুই দিনব্যাপী সচেতনতামূলক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আলোচনা সভাটি অনুষ্ঠিত হয় ১১ ও ১২ জানুয়ারি ২০২৬ (রবি ও সোমবার), বিকেল ২.৩০টায় ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চ সংলগ্ন মাঠ, গুলিস্তান, ঢাকায়। সভায় পরিবহন মালিক, শ্রমিক নেতা, পুলিশ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন এবং নতুন ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নে নীতিগত ঐকমত্যে পৌঁছান।
বিজ্ঞাপন
পাশাপাশি অনুষ্ঠানে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ব্যাখ্যার অংশে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান UrbanMove Tech Limited-এর প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। তারা কাউন্টারভিত্তিক ও ই-টিকিটিং ব্যবস্থার কার্যপদ্ধতি, ব্যবহারিক দিক এবং বিস্তারিত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অংশগ্রহণকারীদের সামনে তুলে ধরেন। এ সময় মালিক, চালক ও সংশ্লিষ্টদের সচেতনতার লক্ষ্যে তথ্যভিত্তিক লিফলেট বিতরণ করা হয়।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অ্যাডমিন) জনাব মো: সরওয়ার, বিপিএম-সেবা। সভাপতি ও প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো: সাইফুল আলম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো: হুমায়ূন কবির খান।
বক্তারা তুলে ধরেন, ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে বাস চলাচলে নির্দিষ্ট রুট শৃঙ্খলা, স্টপেজ এবং আধুনিক টিকিটিং ব্যবস্থা না থাকায় যানজট, দুর্ঘটনা, যাত্রী হয়রানি ও চাঁদাবাজি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণে কাউন্টারভিত্তিক ও ই-টিকিটিং পদ্ধতি ছাড়া কার্যকর কোনো বিকল্প নেই।

বিজ্ঞাপন
সভায় জানানো হয়, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ১৫-১৬ মাস ধরে পুলিশ প্রশাসন, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ, ডিটিসিএ এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে।

নতুন ব্যবস্থাপনার আওতায়-
নির্দিষ্ট স্টপেজ ছাড়া যাত্রী ওঠানামা বন্ধ থাকবে
কাউন্টার (POS) ও ই-টিকিটিংয়ের মাধ্যমে ভাড়া আদায় করা হবে
বাসের অভ্যন্তরে নগদ লেনদেন সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে
রুটভিত্তিক কোম্পানির আওতায় নির্ধারিত সময় ও রোটেশন অনুযায়ী বাস চলবে
রুট অনুযায়ী যাত্রার নির্ধারিত স্থানে স্টপেজ ও কাউন্টার থাকবে
বক্তারা উল্লেখ করেন, এই ব্যবস্থার ফলে চালক, শ্রমিক ও মালিক, তিন পক্ষই ন্যায্য ও স্বচ্ছ আয়ের নিশ্চয়তা পাবে। এর মাধ্যমে ঢাকা শহরে যানজটসহ দীর্ঘদিনের নানা পরিবহনসংক্রান্ত সংকট সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে।
প্রধান অতিথি অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. সরওয়ার আশা প্রকাশ করেন যে, এই ব্যবস্থাপনা কার্যকরভাবে চালু হলে সড়কে শৃঙ্খলা ও ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পুলিশ প্রশাসন নিয়মিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং এ ক্ষেত্রে মালিক, শ্রমিক ও যাত্রী, সবার সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি হয়রানির শিকার হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।
সভাপতি ও প্রধান বক্তা মো. সাইফুল আলম জানান, কাউন্টারভিত্তিক ও ই-টিকিটিং পদ্ধতিই বর্তমান পরিবহন সংকট থেকে উত্তরণের সবচেয়ে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পথ। তিনি স্পষ্ট করেন, এই ব্যবস্থায় শ্রমিকদের বেতন বা সুযোগ-সুবিধা কোনোভাবেই কমানো হবে না। বরং যানজট কমলে ট্রিপ সংখ্যা বাড়বে, আয় বৃদ্ধি পাবে এবং কাজের চাপ তুলনামূলকভাবে কমে আসবে।
এছাড়া জানানো হয়, প্রাথমিকভাবে পাঁচ দিনের পরীক্ষামূলক অনুশীলনের পর ষষ্ঠ দিন থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এই কার্যক্রম শুরু হলে প্রথম তিন মাস নিয়ম মেনে চলা যানবাহনের বিরুদ্ধে কোনো মামলা না করার বিষয়ে ডিএমপি আশ্বাস প্রদান করেছে।
আয়োজকদের মতে, এটি কোনো একক সংগঠনের সিদ্ধান্ত নয়; বরং সরকারের নির্দেশনায় পুলিশ, মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের সম্মিলিত উদ্যোগ, যা বাস্তবায়িত হলে ঢাকায় একটি সুশৃঙ্খল, আধুনিক ও জনবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

