ভ্রমণপিপাসুদের কাছে নির্জন দ্বীপ মানেই এক রোমাঞ্চকর হাতছানি। কিন্তু পৃথিবীর বুকে এমন একটি দ্বীপ ছিল, যেখানে প্রবেশাধিকার ছিল কেবল নারীদের। পুরুষদের জন্য এই দ্বীপের দুয়ার ছিল সম্পূর্ণ বন্ধ।
বাল্টিক সাগরের নীল জলরাশির বুক চিরে জেগে ওঠা এই ভূখণ্ডটি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায় ‘নারীদের স্বর্গ’ হিসেবে। কেন সেখানে পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল এবং কী এই দ্বীপের রহস্য— তা আজও অনেককে অবাক করে।
বিজ্ঞাপন
নারীদের একান্ত আশ্রয়: সুপার শি আইল্যান্ড
ফিনল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলের কাছে রাসেবার্গ (Raseborg) অঞ্চলে প্রায় ৮.৪ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই দ্বীপটির নাম ‘সুপার শি আইল্যান্ড’ (SuperShe Island)। রাজধানী হেলসিঙ্কি থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দ্বীপটি একসময় ছিল আধুনিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে নারীদের জন্য এক নিরাপদ প্রশান্তি কেন্দ্র। পাইন গাছের ফিসফাস আর সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দে ঘেরা এই দ্বীপে কেবল নারীরাই আসতেন নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করতে।

কেন এই নিষেধাজ্ঞা ছিল?
বিজ্ঞাপন
২০১৮ সালে মার্কিন উদ্যোক্তা ক্রিস্টিনা রথ (Kristina Roth) এই দ্বীপটি কিনেছিলেন। একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সাবেক সিইও ক্রিস্টিনা লক্ষ্য করেছিলেন, সামাজিক নানা চাপ আর প্রাত্যহিক ব্যস্ততায় নারীরা নিজেদের জন্য সময় বের করতে পারেন না। তাই তিনি এমন একটি পরিসর তৈরি করতে চেয়েছিলেন যেখানে কোনো প্রকার সামাজিক জড়তা বা পুরুষদের উপস্থিতি ছাড়াই নারীরা প্রাণখুলে মিশতে পারবেন। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন, যোগব্যায়াম, ধ্যান এবং প্রকৃতির মাঝে নিরবচ্ছিন্ন বিশ্রাম নিশ্চিত করা।
আরও পড়ুন: সমুদ্র থেকে মরুভূমি হওয়া বিশ্বের বিস্ময়কর ৫ স্থান
বিলাসবহুল জীবন ও গোপনীয়তা
সুপার শি আইল্যান্ডে ছিল পাথর ঘেরা উপকূল এবং ঘন বনাঞ্চল। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে এখানে তৈরি করা হয়েছিল চমৎকার সব কাঠের কেবিন বা ভিলা। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করতে এক সময়ে আটজনের বেশি অতিথিকে সেখানে থাকার অনুমতি দেওয়া হতো না। অতিথিরা এখানে নৌকায় করে আসতেন এবং কয়েকটা দিন সম্পূর্ণ ডিজিটাল ডিটক্স বা যান্ত্রিকতা মুক্ত জীবন কাটাতেন।

বর্তমান অবস্থা ও মালিকানা বদল
২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এই দ্বীপটি নারীদের একচেটিয়া গন্তব্য হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার নারী এখানে আসতেন এবং নিজেদের মধ্যে বন্ধুত্বের মেলবন্ধন গড়ে তুলতেন। তবে ২০২৩ সালে দ্বীপের ইতিহাসে বড় পরিবর্তন আসে। ক্রিস্টিনা রথ দ্বীপটি একজন পুরুষ শিপিং এক্সিকিউটিভের কাছে এক মিলিয়ন ইউরোর বেশি দামে বিক্রি করে দেন। এরপর থেকে ‘সুপার শি’ ব্র্যান্ড হিসেবে দ্বীপটি আর পরিচালিত হচ্ছে না।
বর্তমানে দ্বীপটি ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং আগের সেই ‘নারীকেন্দ্রিক’ কঠোর নিয়মগুলো এখন আর কার্যকর নেই। তবুও ২০২৫-২৬ সালেও পর্যটন বিশ্বে এই দ্বীপের গল্প এখনও মুখে মুখে ফেরে। নিরাপদ এবং পুনরুদ্ধারমূলক পর্যটনের ক্ষেত্রে এই ধারণাটি বিশ্বজুড়ে এক নতুন ট্রেন্ড তৈরি করেছে।
এজেড

