আমেরিকানদের খাদ্যতালিকায় টমেটো দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষে। সালাদ থেকে শুরু করে পিৎজা,পাস্তা,সস কিংবা ক্যাচআপ—টমেটো ছাড়া আধুনিক খাবারের কথা ভাবাই যায় না। অথচ ইতিহাসের এক অদ্ভুত সময়ে এই টমেটোকেই মানুষ ভয় পেত প্রাণঘাতী বিষ হিসেবে! আজ যে টমেটো স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতীক, একসময় সেটিকেই বলা হতো ‘বিষাক্ত আপেল’। এমনকি এই ফলকে ঘিরে হয়েছিল এক বিস্ময়কর ‘বিচার’—যা ইতিহাসে পরিচিত ‘সালেম টমেটো ট্রায়াল’ নামে।
ইউরোপে টমেটোর আগমন, শুরু হয় বিভ্রান্তি: টমেটোর জন্ম মেসোআমেরিকা অঞ্চলে। অ্যাজটেকরা একে ডাকত ‘ফোলা-ফাঁপা ফল’ নামে। স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা প্রথম ইউরোপে টমেটো নিয়ে আসেন। কিন্তু ইউরোপীয় সমাজ তখন এই নতুন ফলকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল না। খাবার হিসেবে নয়, বহু বছর ধরে টমেটো ব্যবহার হতো শুধু বাগান সাজানোর কাজে। ব্রিটেন ও আমেরিকান উপনিবেশগুলোতেও একই মনোভাব ছিল।
বিজ্ঞাপন

ধর্মীয় ভয় ও ‘লাল শয়তান’ তত্ত্ব: ১৭শ শতাব্দীর শেষ দিকে ইউরোপ ও আমেরিকায় ধর্মীয় কুসংস্কার তীব্র আকার ধারণ করে। উজ্জ্বল লাল রঙের কারণে টমেটোকে যুক্ত করা হয় পাপ, শয়তান ও মৃত্যুর সঙ্গে। কেউ কেউ তো একে আদমের নিষিদ্ধ ফলের সঙ্গেও মিলিয়ে ফেলেন। এভাবেই টমেটোর বদনাম ছড়িয়ে পড়ে—মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে, এটি খেলে অসুস্থতা এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
আসল দোষী ছিল প্লেট, ফল নয়: টমেটো খাওয়ার পর মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা সত্যিই ঘটেছিল। কিন্তু কারণ ছিল ভিন্ন। সে সময় খাবার পরিবেশন করা হতো পিউটার ধাতুর প্লেটে, যেখানে উচ্চমাত্রার সীসা থাকত। টমেটোর অম্লীয় উপাদান ওই সীসার সঙ্গে বিক্রিয়া করে বিষক্রিয়া ঘটাত। কিন্তু বিজ্ঞান না জানার কারণে দোষ গিয়ে পড়ে টমেটোর ঘাড়েই।
সালেমে বসে অদ্ভুত এক বিচারসভা: ১৮২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর, নিউ জার্সির সালেম শহরে ঘটে যায় এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। কর্নেল রবার্ট গিবোন জনসন জনসমক্ষে প্রমাণ করতে চাইলেন—টমেটো মোটেও বিষ নয়। কোর্টহাউসের সামনে জড়ো হওয়া ভিড়ের সামনে তিনি এক ঝুড়ি টমেটো নিয়ে দাঁড়িয়ে একের পর এক খেতে শুরু করেন। সবাই অপেক্ষা করছিল—এই বুঝি তিনি মারা যান! কিন্তু কিছুই হলো না। কর্নেল জনসন সম্পূর্ণ সুস্থ থাকলেন। সেই মুহূর্তেই জনমনে ভাঙতে শুরু করে টমেটো নিয়ে ভয়।
সত্য নাকি লোককথা?: ইতিহাসবিদদের একাংশের দাবি—এই ঘটনার প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। ঘটনার প্রায় ৯০ বছর পর প্রথম লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায়। সমসাময়িক নথিতে নেই কোনো রেকর্ড। এমনকি তার আগেই রান্নার বইয়ে টমেটোর ব্যবহার দেখা যায়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন টমেটো খেতেন—এমন তথ্যও রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস বদলাতে সময় লাগে। আর সেই কাজটাই করেছে সালেমের এই গল্প।
রেডিও নাটক থেকে ইতিহাসের অংশ: এই টমেটো ট্রায়ালের কাহিনি মূলত লোকমুখে ছড়ায়। পরে সালেমের পোস্টমাস্টার জোসেফ সিকলার এটি প্রচারে বড় ভূমিকা রাখেন। এমনকি সিবিএস রেডিওতে এটিকে ‘সত্য ঘটনা’ হিসেবে নাট্যরূপ দেওয়া হয়।
শেষ কথা
সালেমে পুড়তে হয়নি কোনো ডাইনিকে। বরং ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছিল টমেটো। গল্পটি পুরোপুরি সত্য হোক বা কিছুটা কল্পনার রঙে রাঙানো—একটি বিষয় নিশ্চিত, আজ টমেটো শুধু খাবার নয়, ইতিহাসেরও অংশ।
তথ্যসূত্র: রিপলিস বিলিভ ইট অর নট
বিএস

