‘১০ বছর পর ঈদ কার্ড জাদুঘরে রাখতে হবে’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৬ এপ্রিল ২০২২, ০৬:০৯ পিএম
‘১০ বছর পর ঈদ কার্ড জাদুঘরে রাখতে হবে’

আমানউল্লাহর বয়স ত্রিশ ছুঁইছুঁই। ৯০ দশকে জন্ম নেওয়া এই যুবকের জীবনের প্রথম ব্যবসা ঈদ কার্ডের দোকান। সেটিও শিশু বয়সে। বিক্রি হোক বা না হোক, সে ভাবনা ছিল না। রোজা এলেই দোকান বসাতে হবে মাথায় এমন ভাবনা আসতো রমজান শুরুর দু-তিন মাস আগেই। শৈশবের সেই উন্মাদনা এখন মনে পড়ে তার। তবে হতাশার সুরও আছে তার কণ্ঠে। গত কয়েক বছর ধরে রাজধানীতে ঈদ কার্ডের দোকান না দেখে হতাশার কথা জানান তিনি।

মঙ্গলবার (২৬ এপ্রিল) রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকায় আমানউল্লাহর সঙ্গে আলাপ হয় এ প্রতিবেদকের।

হতাশা প্রকাশ করে ঢাকা মেইলকে আমান বলেন, ‘রাজনৈতিক, বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যানার খুলে নিয়ে আসতাম। সেগুলো দিয়ে দোকানের দেয়াল তৈরি করতাম। ছাদ দিতাম ছন দিয়ে। দোকানে বিক্রি হবে না জানতাম। তবে একটা প্রতিযোগিতা কাজ করত, মহল্লার মধ্যে কাদের দোকান সবচেয়ে সুন্দর হয়। এরপর ঈদ কার্ড তুলতাম। সারা মাস বসে থাকতাম দোকানে।’

তিনি বলেন, ‘বিক্রি হবেনা জানার পরেও বিক্রি হতো। বিভিন্ন বয়সের মানুষ কিনতো। কার্ডে বিভিন্ন ছন্দ লেখা থাকতো। আমার মনে আছে, দুই টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দামের ঈদ কার্ড বিক্রি করেছি। এটা ছিল আমার জীবনের প্রথম ব্যবসা।’

হতাশা প্রকাশ করে আমান বলেন, ‘সেই দিনগুলো নাই! গত কয়েক বছরে আমার চোখে একটা ঈদ কার্ডের দোকানও পড়েনি।’

রাজধানীর তিনটি এলাকা ঘুরেও একটি ঈদকার্ড কিনতে পারেননি নাঈমুল ইসলাম নাঈম। ঢাকা মেইলের সঙ্গে আলাপকালে নাঈম বলেন, ‘একটা সময় ছিল, যখন ফোনে একটা ম্যাসেজ করতে তিন টাকা খরচ হতো। তারপরও আমরা ২০টাকা, ৫০ টাকা দিয়ে ঈদ কার্ড কিনে বন্ধুদের দিতাম। এখন আর সেটা হয় না। এবার একটা ঈদ কার্ডের জন্য আমি তিনটা এলাকা ঘুরলাম। কোথাও একটা দোকান বসেনি। অথচ কয়েক বছর আগেও একেকটা গলিতে অন্তত চারটা, পাঁচটা দোকান বসত।’

ঈদ কার্ডের দোকান বসাতেন এমন একজন সাইফুল ইসলাম। রাজধানীর আদাবর এলাকার এই বাসিন্দা এখন ইলেকট্রনিকস ব্যবসায়ী।

ঢাকা মেইলের সঙ্গে আলাপকালে সাইফুল জানান, সর্বশেষ ২০১৫ সালে ঈদ কার্ডের দোকান বসিয়েছিলেন। কিন্তু এখন আর সেভাবে চাহিদা না থাকায় এবং নিজে ব্যস্ততার কারণে ঈদ কার্ডের ব্যবসা থেকে সরে এসেছেন তিনি।

সাইফুল আরও বলেন, ‘ঈদ কার্ডের ব্যবসা শুরু করেছিলাম ২০০০ সালেরও আগে। তখন আমরা ছোট। তিন বন্ধু মিলে শুরু করেছিলাম। দুই বছর এক সঙ্গে করার পর একেকজন আলাদা আলাদা দোকান দিতাম। তখন প্রতিযোগিতা ব্যবসার ছিল না। ছিল দোকান কত সুন্দর, সেটির। এখন তো আর দোকানই বসাই না। সেই সময়টা হয় না। মানুষের চাহিদা নেই। সবাই প্রযুক্তি চেনে।’

তিনি বলেন, ‘এখন তো অনেকেই ঈদ কার্ডের নামটা জানে। ১০ বছর পর ঈদ কার্ড জাদুঘরে রাখতে হবে। এ দেশের মানুষ ইতিহাসের পাতায় হয়ত ঈদ কার্ডের নাম জানবে।’

এদিকে পুরো রমজানজুড়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, মিরপুর-১, মিরপুর-২, মিরপুর-১০, বাড্ডা, গুলশান, মহাখালি, ফার্মগেট, মগবাজার এলাকা ঘুরে একটিও ঈদ কার্ডের দোকান খুঁজে পাননি এই প্রতিবেদক।

কারই/এমআর