১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় ভারতের পূর্বরাজ্য বিহার থেকে বাংলাদেশে আসা অবাঙালিরা ‘বিহারি' নামে পরিচিত। সে সময় বিহারিদের সঙ্গে আসে কিছু বাঙালিও। যাদের বলা হয়, ক্যালকেশিয়ান বাঙালি। এই বাঙালিরা ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে বিহারিদের দ্বারা নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছেন।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সে সময় ছিল সিটি কলোনি (সুইপার কলোনি)। টাউন হলের সিটি কলোনিতে সে সময় বসবাস করা আবুল কাশেম ১৯৭১ সালের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ঢাকা মেইলকে জানিয়েছেন এই তথ্য।
বিজ্ঞাপন
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রত্যক্ষ সাক্ষী আবুল কাশেম ২৫ মার্চ রাতে ছিলেন মোহাম্মদপুরে। মায়ের কথায় ঘর ছেড়ে তাকে যেতে হয় বর্তমান শেরে বাংলা নগরে।
সে রাতের স্মৃতিচারণ করে আবুল কাশেম বলেন, ‘২৫ শে মার্চ রাতে হঠাৎ কইরা গোলাগুলির শব্দ। আমার আম্মা ওই শব্দ শুইনা আমারে কয়, তুমি এই জায়গা ছাইড়া, যেহেতু এইডা বিহারি এলাকা, তুমি তোমার ভাইর বাসায় চইলা যাও। রাত্রে বেলায় আমি বাইর হইয়া, তখন ইকবাল রোডের মাঝখান থিকা রাস্তা ছিল, তখন কম বিল্ডিং ছিল, আমি চুপাচুপা দিয়ে গিয়া সেকেন্ড ক্যাপিটাল, যেটা এখন শেরে বাংলা নগর, প্রধানমন্ত্রীর যে বাসভবন তার পাশ দিয়া রাস্তা ছিল এমএলএ রেস্ট হাউজে যাওয়ার। ওই এমএলএ রেস্ট হাউজে আমার ভাই চাকরি করত। এক রুমের কটার ছিল। আমার ভাই আর ভাবি থাকত। আমি ওইহানে গেলাম গা। কিছুক্ষণ পর দেহি গাড়ি ঢুকতাছে। আমরা ঝোঁপে মধ্যে ঢুইগা থাকলাম। ওইটার মধ্যে পাকিস্তানের এমপিরা থাকত। এইজন্য বেশি কিছু করে নাই। আধা ঘণ্টার মত ছিল।’
২৬ মার্চ সকালের বর্ণনা দেন আবুল কাশেম। বলেন, ‘সকালে দেহি, ৮টা, ৯টার দিকে কিছু কিছু মানুষ বাইর হইতাছে। ওই সুযোগে আমি আমার ভাই, একটা ভাজতি কোয়াটারে তালা দিয়া দ্যাশের বাড়ির দিকে রওনা হই। জাগায় জাগায় দেখি, মানুষ পইরা আছে, ভ্যান গাড়ি উপরে, রাস্তায় মানুষের লাশ। পায়ে হাইটা ডেমরা পর্যন্ত গেছি। ডেমরা পর্যন্ত যাইতে যাইতে অসংখ্য লাশ দেখছি। তারপর তারাবো গেলাম, ভুলতা গেলাম, তারপর নিজের বাড়ি।’
২৫ মার্চ রাতে তার মা তাকে কেন মোহাম্মদপুর ছাড়তে বলেছিলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে আবুল কাশেম জানান, ১৯৭১ সালে বিহারিরা পাকিস্তান সরকারের সমর্থন পেয়েছিল। তিনি বলেন, ‘৬৯ সালে বিহারিরা আমগো মারছে। বোম মাইরা, আগুন লাগাইয়া দিত। আমরা বাঙালি পরিবার যে দিকে থাকতাম, ওই দিকে নির্যাতন করত।’
‘এখন যেইডা আসাদ এভিনিউ, ওইটা আইয়ূব এভিনিউ ছিল। ওইখান দিয়া পাকিস্তানি গাড়ি যাইত। আমরা পাকিস্তানিগো হারিকেন দিয়া সিগন্যাল দিতাম, আমগো বাঁচান। হ্যারা আমরা না বাঁচাইয়া, উল্টা আমগো দিকে গুলি করত। তখন আমগো তিনজন মারা গেছিল।’
কাশেম বলেন, ‘ওই সময় মোহাম্মদপুরে বাঙালি কম ছিল। যাও কিছু ছিল তার মধ্যে কিছু বাঙালি ছিল তাদেরকে বলত, ক্যালকেশিয়ান বাঙালি। যারা মুরশিদাবাদ, এই ওই জায়গা থেকে ৪৭ সালে বিহারিগো সাথে আসছে। ওই সব বাঙালি। এ অঞ্চল আছিল বিল।’
৬৯ এর আগে থেকে স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার বাঙালিরা বিহারিদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হতো জানিয়ে আবুল কাশেম বলেন, ‘বিহারিরা যারা ওই সময় যুবক হইয়া উঠছে, ওই ধরনের পোলাপানরা বাঙালিদের দেখলেই টাইনা নিয়া মাইর ধইর করত, এইডা করত, ওইডা করত। এইডা ৬৯ এর আগে থেকেও চলছে, স্বাধীন হওয়ার আগেও চলছে। পরে আর হয় নাই।’
কী কারণে বিহারিরা বাঙালিদের মারধর করত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সাধারণ কথা নিয়াই। এই শালা বাঙালি জাত। সাধারণ কথার মধ্যেই গালাগালি করত। মাইরধোর করত।’
ঢাকা মেইলের সঙ্গে ১৯৭১ সালের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার আনন্দের কথা জানাতে গিয়ে আবুল কাশেম বলেন, ‘আমগো মা-বোনরা রাজাকারগো হাতে যেইভাবে নির্যাতন হইছে তা বলা যায় না। মুখে বলা যায় না। যে দেখছে, সেই বুঝব। স্বাধীন দেশে ভালো লাগে। একজনের মাইর খাইলেও ভালো লাগে, আমার মাতৃভূমির মানুষ মারছে।’
কারই/জেবি

