দুই দিনের ব্যবধানে একজন সচিব এবং তিনজন পুলিশ কর্মকর্তাকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। হঠাৎ সরকারের এই শুদ্ধি অভিযানে প্রশাসনে চাপা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বাধ্যতামূলক অবসরের তালিকা আরও দীর্ঘ হতে পারে এমন গুঞ্জনের মধ্যে কর্মকর্তারা নড়েচড়ে বসেছেন। বিশেষ করে যাদের ব্যাপারে অভিযোগ রয়েছে তারা শাস্তির ভয়ে আতঙ্কিত।
গত রোববার (১৬ অক্টোবর) তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মকবুল হোসেনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কে এম আলী আজম স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মকবুল হোসেনকে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ধারা ৪৫ অনুযায়ী জনস্বার্থে সরকারি চাকরি থেকে অবসর দেওয়া হলো।
বিজ্ঞাপন
এর দুই দিনের মাথায় মঙ্গলবার (১৮ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে পুলিশ সুপার পদমর্যাদার তিন কর্মকর্তাকে চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অবসরে পাঠানো হয়। তারা হলেন- পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মীর্জা আবদুল্লাহেল বাকী ও মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা এবং পুলিশ সদর দফতরের এসপি (টিআর) মুহম্মদ শহীদুল্লাহ চৌধুরী। এদের মধ্যে মীর্জা আবদুল্লাহেল বাকী ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা এবং অন্য দু'জন ১২তম ব্যাচের। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে সিনিয়র সচিব আখতার হোসেন স্বাক্ষরিত পৃথক তিনটি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সরকারি চাকরি আইন ২০১৮ এর ৪৫ ধারার বিধান অনুযায়ী জনস্বার্থে সরকারি চাকরি থেকে অবসর দেওয়া হলো।
পরপর দুটি ঘটনায় সরকারি আমলাদের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, নির্বাচনের আগে এ ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আরও নেওয়া হতে পারে। কোনো কারণে সরকারের বিরাগভাজন হয়ে গেলে মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে শাস্তির।
এই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলো এ ব্যাপারে দায়িত্বশীল কেউই মুখ খুলছেন না। যাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে তারাও স্বীকার করছেন, সরকার চাইলে যে কাউকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অবসরে পাঠাতে পারে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সরকারবিরোধী নানা কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরকার শুদ্ধি অভিযান চালাচ্ছে। যাদের অভিযোগ গুরুতর তাদের বিরুদ্ধে ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে অনেকের বিরুদ্ধেই পর্যায়ক্রমে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে সরকার মূলত গোটা প্রশাসনকে বার্তা দিতে চায়।
বিজ্ঞাপন
তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া মনে করেন এতে প্রশাসনে অস্থিরতা সৃষ্টি হবে। তিনি বলেন, ‘এই বাধ্যতামূলক অবসর প্রশাসনে অস্থিরতার সৃষ্টি করবে। যেটা সরকারের জন্যও ভালো নয়, প্রশাসনের জন্য ভালো নয়। সবার মধ্যে এখন কাজ করতে গেলে এক ধরনের সংশয় কাজ করবে। এতে অনেক উন্নয়নমূলক কাজ বাধাগ্রস্ত হবে। আর সংবাদ মাধ্যমে সচিব বা তিনজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ লেখা হয়েছে তা যদি সত্যি হয় তাহলে তো তাদের অবসরে না পাঠিয়ে বিভাগীয় বা ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া যেত। বাধ্যতামূলক অবসর তো কোনো শাস্তি নয়। তিনি তো সকল সুযোগ সুবিধা পাবেন।’
ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘বিএনপি শাসনামলে এমন বেশ কয়েকজন সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। পরে সেই কর্মকর্তারা আদালতে গেলে আদালত তাদের পুনর্বহালের আদেশ দেন। কারণ যে আইনের বলে জনস্বার্থে তাদের অবসরে পাঠানো হয়েছে আদালতে সরকার সেই জনস্বার্থ প্রমাণ করতে পারেনি। এই ধারাটি মূলত করা হয়েছিল সরকারি কর্মচারীদের স্বার্থে। যাতে তারা ২৫ বছর পর চাইলে নিজেই অবসরে যেতে পারেন।’
তবে সাবেক জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুন জানান, এই ধরনের অবসরের মাধ্যমে আইনের কোনো ব্যত্যয় হচ্ছে না। আইন সরকারকে সেই সুযোগ দিয়েছে। এতে প্রশাসনে অস্থিরতারও কিছু নেই বলে মনে করেন তিনি।
নির্বাচনের আগে এই অবসর কোনো বার্তা বহন করে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের সঙ্গে প্রশাসনের শৃঙ্খলার কোনো সম্পর্ক নেই। এখন নির্বাচনের নামে সরকার তো হাত পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারে না। দৈনন্দিন কার্যক্রম তো স্বাভাবিক গতিতেই চলবে। সেখানে যদি কেউ অপরাধ করে তাহলে তার বিরুদ্ধে তো ব্যবস্থা নিতেই হবে। তা না হলে শৃঙ্খলা থাকবে না।’
উল্লেখ্য, সংসদ নির্বাচনের বাকি আর সাড়ে ১৪ মাস। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হবে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন। ভোটকে কেন্দ্র করে প্রশাসন ঢেলে সাজাতে নানা হিসাব-নিকেষ করছে সরকার। সেজন্য প্রশাসনের বদলি-পদায়নের বিষয়টি অনেকটা আলোচনায় এসেছে। কিছুদিন আগেও একযোগে ৪০ জেলার পুলিশ সুপার পদে বদলি করা হয়েছিল।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে- প্রশাসনে এমন অনেক কর্মকর্তা আছেন যারা সর্বোচ্চ পদ ব্যবহার করে দুর্নীতি, বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগও রয়েছে। কাজেই বিভিন্ন মহল মনে করে- আমলারা ব্যাপক পরিমাণে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন, এ কারণেই প্রশাসনের ভূমিকা এবং স্বচ্ছতা নিয়ে নানা সময়ে প্রশ্ন উঠে। এর ফলশ্রুতিতেই এমন ‘শুদ্ধি অভিযানে’ নেমেছে সরকার।
জেবি/আইএইচ

