জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনে ভোগান্তি সমাধানের পথে এগোচ্ছে প্রশাসন

প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর ২০২২, ১১:১৯ পিএম
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনে ভোগান্তি সমাধানের পথে এগোচ্ছে প্রশাসন

ডিজিটাল যুগে প্রশাসনিক সব কর্মকাণ্ডে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন অপরিহার্য। পাসপোর্ট, আইডি কার্ড, জমি রেজিস্ট্রেশন, বিয়ে, গাড়ির নিবন্ধন, মুঠোফোনের সিম ক্রয়, করোনার টিকা কিংবা স্কুলে ভর্তি- এমন নানা কাজে প্রয়োজন হয় জন্ম নিবন্ধন কার্ডের। সবমিলিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১৮টি সেবা পেতে জন্ম ও মৃত্যুসনদ বাধ্যতামূলক। এ জন্য সন্তান জন্ম নেওয়ার পরপরই স্থানীয় প্রশাসনে জন্ম নিবন্ধন নিতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে মানুষ।

জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪ এর ৮ ধারা অনুযায়ী শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন এবং কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যে মৃত্যু নিবন্ধন করতে হয়। তবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নিবন্ধন হওয়ায় বর্তমানে ‘সার্ভার ত্রুটির’ অজুহাতে নানা ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়েও সময়মতো করা যাচ্ছে না জন্ম নিবন্ধন। আবার জন্ম নিবন্ধন না করলেও নানা ঝক্কি-ঝামেলায় পড়তে হয়।

যদিও সংশ্লিষ্টরা ডিজিটাল নিবন্ধনে বর্তমানে যে অসুবিধাগুলো রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

এমন পরিস্থিতির মাঝে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (৬ অক্টোবর) দ্বিতীয়বারের মতো দেশে জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস পালিত হতে যাচ্ছে। গত বছরের ৯ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে ৬ অক্টোবরকে ‘জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস’ ঘোষণা করে সরকার। এরপর ওই বছরই প্রথমবারের মতো দিবসটি পালিত হয়। জনসাধারণকে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনে উৎসাহী করার লক্ষ্য নিয়েই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ৮০ শতাংশ জন্ম এবং মৃত্যু নিবন্ধন সম্পূর্ণ করার লক্ষ্য নির্ধারিত রয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে এবার দিবসটিতে দেশের জেলা শহরগুলোয় সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচি পালিত হবে। তবে রাজধানী ঢাকার মূল কর্মসূচি পালিত হবে আরও কিছুদিন পর।

এ বিষয়ে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. আখতার জামিল ঢাকা মেইলকে বলেন, ৬ তারিখেই অনুষ্ঠান নির্ধারিত করা হয়। তবে মন্ত্রী মহোদয় দেশের বাইরে থাকায় ঢাকার অনুষ্ঠান পেছানো হয়েছে। ঢাকায় অনুষ্ঠান পরে হলেও ব্যানার-ফেস্টুন লাগানো হবে। এছাড়া ঢাকা ব্যতীত সকল জেলায় দিবসটি পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন পেতে মানুষের ভোগান্তি আর অভিযোগের অন্ত নেই। বিষয়টি নিয়ে কথা হলে সিরাজগঞ্জের বাসিন্দা শুকচাঁন বিবি বলেন, নাতির জন্ম নিবন্ধন করাতে ইউনিয়ন পরিষদে ছুটে অল্প সময়ে কাজ হয়নি। সব তথ্য ঠিকঠাকভাবে দেওয়ার পরও বেশ কয়েকবার ঘুরতে হয়েছে। যদিও পরে তাকে কার্ডটি দেওয়া হয়েছে।

তবে এমন হয়রানির ব্যাখ্যাও দিয়েছে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন অফিস। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, এই কার্ড সরবরাহের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও মহানগর এলাকার স্থানীয় প্রতিনিধিসহ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এই কার্ডে কোনো ভুল তথ্য দিলে তা সংশোধনের জন্য যেতে হয় প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে। যদিও এটি সংশোধনে পূর্বে এফিডেভিট করার নিয়ম ছিল।

বিষয়টি নিয়ে কথা হলে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ৫ নম্বর খোকশাবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সোহরাব হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, সন্তান জন্ম নেওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে জন্ম নিবন্ধনের কার্ড সংগ্রহ করতে হয়। বিনামূল্যে জন্ম সনদ দেয় ইউনিয়ন পরিষদ। এই সময়ের পর কেউ কার্ড নিতে চাইলে সরকার নির্ধারিত জরিমানা দিয়ে তা নিতে হয়।

এই ইউপি সদস্য জানান, স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে আমার কাছে অনেকেই জন্ম নিবন্ধন নিতে আসেন। আমি তাদের কার্ড নেওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করি। অনেক সময় তারা ইউনিয়ন পরিষদে গিয়েও এটি সংগ্রহ করেন। তবে এ ক্ষেত্রে আর আগের মতো ভোগান্তি নেই।

এ ব্যাপারে কথা হলে সিরাজগঞ্জ পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শাহরিয়ার শিপু ঢাকা মেইলকে বলেন, অনেক সময় সার্ভার জটিলতায় কেউ কেউ ভোগান্তির শিকার হন। আর জন্ম নিবন্ধনের কার্ড সারা বাংলাদেশের জন্য একটাই। এক সার্ভার থেকে এই কার্ড সরবরাহ করায় অনেক সময় সার্ভার জটিলতা দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলরদের কিছু করার থাকে না।

এদিকে, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্ডের অপব্যবহার রোধে এফিডেভিট না করে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নাগরিকদের যাওয়ার বিষয়ে কথা হলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত কুমার কর্মকার ঢাকা মেইলকে বলেন, পূর্বে আমাদের দেশে জন্ম নিবন্ধন কার্ড এফিডেভিট করে ভুল তথ্য দিয়ে নানা অন্যায়-অপকর্ম করার সুযোগ ছিল। জন্ম নিবন্ধনের কার্ডের অপব্যবহার রোধে এখন আর এফিডেভিট দিয়ে কোনো তথ্য সংশোধন করা যায় না।

অন্যদিকে ভোগান্তি রোধে একাধিক সার্ভার ব্যবহার করা যায় কি-না এমন প্রশ্নে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের রেজিস্ট্রার জেনারেল রাশিদুল হাসান ঢাকা মেইলকে বলেন, একাধিক সার্ভার ব্যবহারে জটিলতা বাড়বে। কিছু অদক্ষ লোকবল ও বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভোগান্তির শিকার হতে হয়। তবে এখন পর্যন্ত সারাদেশে ২২ কোটি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্ড প্রদান করা হয়েছে। আরও কিছু আছে, এনালগ পদ্ধতিতে করা। সেগুলো সার্ভারে যোগ করা হচ্ছে। আমরা খুব সহজেই ঝামেলামুক্তভাবে এই সনদ দিয়ে থাকি। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সামান্য ভোগান্তির শিকার হন নাগরিকরা। এর কারণ হচ্ছে, আমাদের অনেক অপারেটর আছেন যারা কম দক্ষ, আবার অনেক সময় কাজের চাপ বেড়ে গেলেও সার্ভারে প্রভাব পড়ে, এই সময়গুলো সনদটি প্রদানে সময় লাগে।

রাশিদুল হাসান বলেন, সবগুলো তথ্য একটি সার্ভারে সংরক্ষণ করা জরুরি। আলাদাভাবে করলে সঠিক হিসাব পাওয়া যাবে না। এই সার্ভার কিন্তু রাতদিন ২৪ ঘণ্টা ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশ ও দেশের বাইরে থেকে যে কোনো সময়ে এটি ব্যবহার করা যায়। নির্ধারিত সময় পর কেউ কার্ড নিতে আসলে তাকে জরিমানা দিতে হয় ৫০ টাকা। এই কার্ড ব্যবহার করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১৮টি কাজ করা যায়।

ভোগান্তি দূর করতে গৃহীত পদক্ষেপের বিষয়ে জানিয়ে তিনি বলেন, শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যেই জন্ম নিবন্ধন করা যায়। জন্ম নিবন্ধন বিষয়ে আমরা জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সচিবকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। তারা যেন জনসাধারণকে জন্ম নিবন্ধনে উদ্বুদ্ধ করে তার জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে জন্ম নিবন্ধনে প্রকৃতপক্ষে কোনো ভোগান্তি নেই। তবে কিছু কিছু অসুবিধা আছে। সেগুলোও দ্রুত চিহ্নিত করে সমাধানের দিকে এগোচ্ছি।

এআইএম/আইএইচ