চক্রটির টার্গেটই ছিল প্রবাসীরা, খাতির জমিয়ে লুটে নিতো সর্বস্ব

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২ অক্টোবর ২০২২, ০১:৫৬ পিএম
চক্রটির টার্গেটই ছিল প্রবাসীরা, খাতির জমিয়ে লুটে নিতো সর্বস্ব

প্রবাস থেকে কোনো যাত্রী এলেই তাদের টার্গেট করতো। সেজন্য বিমানবন্দর এলাকার বিভিন্ন বাস কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতো চক্রটির সদস্যরা। বিদেশ থেকে আসা কাউকে দেখলেই তার কাছে গিয়ে বলতেন কোনো জেলায় যাবেন। বিষয়টি জানার পরই সেই ব্যক্তিকে বলা হতো আমরাও সেই জেলায় যাব কিন্তু আমাদের একজন আসার কথা থাকলেও না আসায় একটি টিকিট বেশি রয়েছে। ভুক্তভোগী তাদের কথাগুলো সরলভাবে বিশ্বাস করতেন।

এরপর বাস অথবা মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে সেই ব্যক্তিকে নিয়ে গন্তব্যের দিকে রওনা হতেন। পথে খাতির জমিয়ে ক্রিমরোল ও বিস্কুট খাইয়ে প্রবাসীকে অজ্ঞান করার পর সঙ্গে থাকা লাগেজ এবং মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যেতেন। অনেক সময় খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে টার্গেট করা প্রবাসীকে খাইয়ে অজ্ঞান করে সবকিছু লুট করে নিয়ে যেতেন।

এভাবে ১৫ বছর ধরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসা প্রায় তিন শতাধিক প্রবাসীকে কৌশলে অজ্ঞান করে সর্বস্ব লুট করে নিয়েছে চক্রটি।

চক্রটির মূলহোতা আমিরসহ চারজন গতরাতে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হলে তাদের থেকে এসব তথ্য জানতে পারে এলিট ফোর্সটি। শনিবার রাতে রাজধানীর বিমানবন্দর ও কদমতলী থানা এলাকা থেকে গ্রেফতার করার সময় তাদের থেকে লুটকৃত স্বর্ণ, মোবাইল এবং অজ্ঞান করতে ব্যবহৃত উপকরণও জব্দ করা হয়।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন- চক্রটির মূলহোতা আমির হোসেন (৫২), তার সহযোগী লিটন মিয়া ওরফে মিল্টন (৪৮), আবু বক্কর সিদ্দিক ওরফে পারভেজ (৩৫) এবং জাকির হোসেন (৪০)। তাদের মধ্যে চক্রটির মূলহোতা আমিরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ১৫টির বেশি মামলা রয়েছে।‌‌‌‌‌

গ্রেফতারদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে রোববার কারওয়ান বাজারের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয় র‌্যাবের পক্ষ থেকে। সেখানে কথা বলেন এলিট ফোর্সটির মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

IMRUL-2তিনি বলেন, দীর্ঘদিন থেকে চক্রটি প্রবাস থেকে আসা ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রতারণা করে সবকিছু হাতিয়ে নিচ্ছিল। ধরাছোঁয়ার বাহিরে ছিল চক্রটি সদস্যরা। কিন্তু সম্প্রতি বিদেশ থেকে আসা বগুড়ার এক ব্যক্তির সঙ্গে প্রতারণা করতে গিয়ে ধরা পড়ে।

কমান্ডার আল মঈন জানান, ২ সেপ্টেম্বর কুয়েত প্রবাসী জনৈক ব্যক্তি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। ওই সময় বিমানবন্দর এলাকায় আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা তাকে টার্গেট করে। পরে ঢাকা থেকে বগুড়া যাওয়ার পথে তাকে অজ্ঞান করে সর্বস্ব লুট করে নেয়। ওই ঘটনায় ভুক্তভোগী থানায় একটি অভিযোগ করেন। সেই অভিযোগে প্রেক্ষিতে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা আরও জানান, চক্রটি বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের টার্গেট করতেন। এরপর খাতির জমি নিয়ে সেই ব্যক্তিকে বাসের টিকিট ধরিয়ে দিতেন। একই বাসে ওঠার পর কিছুদূর গিয়ে ভুক্তভোগীকে ক্রিম রোল ও বিস্কুট অফার করা হতো। সেই বিস্কুট ও ক্রিম রোল খেয়ে ভুক্তভোগী অজ্ঞান হয়ে পড়লে তার পকেটে থাকা বাসের টোকেন নিয়ে সুপারভাইজারকে বলা হত তারা মাঝপথে নেমে যাবেন। পরে মালামাল নিয়ে বাস থেকে নেমে পড়তো তারা। চক্রটি লুটকৃত স্বর্ণালঙ্কার রাজধানীর স্বর্ণ দোকানে পারভেজের কাছে বিক্রি করতো।

চক্রটির সঙ্গে বাসের কেউ সংশ্লিষ্ট কিনা এমন প্রশ্নের জনাবে খন্দকার আল মঈন বলেন, প্রাথমিকভাবে বাসের সুপারভাইজার ও চালকদের কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। তবে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

চোর চক্রের পরিচয়

চক্রের মূলহোতা আমির হোসেন। ‌তিনি বিমানবন্দর এলাকায় একটি ফাস্টফুডের দোকানে কাজ করেন। মূলত এই পেশার আড়ালে তিনি এমন প্রতারণা করেন। দুই তিন দিন পরপর প্রবাসীদের টার্গেট করে তিনি ও তার চক্রের সদস্যরা এসব কাজ করতেন।

‌‌‌‌‌‌‌‌‌গত ১৫ বছর ধরে এভাবে প্রবাসীদের সঙ্গে প্রতারণা করে তাদের স্বর্ণালঙ্কার টাকা-পয়সা লুট করে আসছিল আমির ও তার চক্র সদস্যরা। কয়েক বছর ধরে ৩০০ এর অধিক ব্যক্তির সঙ্গে প্রতারণা করে তাদের মূল্যবান জিনিসপত্র লুটে নিয়েছে তারা। চক্রটি সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে কারাগারে গেলেও জামিনে বেরিয়ে এসে একই কাজে জড়িয়ে পড়ে।

IMRUL-3গ্রেফতার লিটন তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করার পর ছেড়ে দেয়। পরে মাইক্রোচালকের পেশার আড়ালে দীর্ঘ ৩/৪ বছর ধরে আমিরের অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসছে। ইতোপূর্বে একাধিকবার একই ধরণের মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন। বিভিন্ন সময় চক্রটি কৌশলে প্রবাসী যাত্রীদের মাইক্রোবাসে পরিবহন করে সর্বস্ব লুট করে নেয়। তখন মাইক্রোবাস চালনোর দায়িত্বে থাকে লিটন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সময় বিমানবন্দর থেকে যাত্রীদের অনুসরণের কাজ করতেন।

গ্রেফতার আবু বক্কর ওরফে পারভেজ ৮/৯ বছর বিভিন্ন জুয়েলারি দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন। পরবর্তীতে ৬/৭ বছর পূর্বে নিজেই রাজধানীর শ্যামপুরে জুয়েলারির দোকান করেন। দোকানের আড়ালে ২/৩ বছর ধরে চক্রটির লুটকৃত স্বর্ণ গ্রহণ, রুপ পরিবর্তন ও বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

গ্রেফতারকৃত জাকির হোসেন ছাপাখানার ঠিকাদার হিসেবে কাজ করেন। গত ৩/৪ বছর পূর্বে আমিরের মাধ্যমে এই চক্রে যোগ দেয়। তিনি লুটকৃত স্বর্ণালঙ্কার ও অন্যান্য মালামাল রাজধানীর বিভিন্ন জুয়েলারি দোকানসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।

এমআইকে/এমআর