যুক্ত হচ্ছে ৬৬০ মেগাওয়াট, বিদ্যুতে মিলতে পারে কিছুটা স্বস্তি

প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১:৪৬ এএম
যুক্ত হচ্ছে ৬৬০ মেগাওয়াট, বিদ্যুতে মিলতে পারে কিছুটা স্বস্তি

গত কয়েক মাসজুড়ে সারাদেশে চলছে বিদ্যুৎ সংকট। এই সংকট কাটাতে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে আগামী অক্টোবর মাস থেকেই উৎপাদনে যাচ্ছে বহুল আলোচিত বাগেরহাটে কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের (মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট) প্রথম ইউনিট।

এই ইউনিটটি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে ৬৬০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ, যা চলমান বিদ্যুৎ সংকটে কিছুটা স্বস্তির বার্তা বয়ে আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে।

বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগে নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট উৎপাদনে যাওয়ার সব প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। সম্প্রতি ভারত সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১৩২০ মেগাওয়াট সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাচালিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মৈত্রী পাওয়ার প্ল্যান্টের ইউনিট-১ যৌথভাবে উদ্বোধন করেন। ভার্চুয়ালি বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উদ্বোধনের আগে দুই প্রধানমন্ত্রী ভারতের হায়দ্রাবাদ হাউজে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর ঢাকা ও নয়া দিল্লির মধ্যে স্বাক্ষরিত সাতটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বিনিময় প্রত্যক্ষ করেন।

প্রকল্পের অগ্রগতি কতটুকু

প্রকল্পটির অগ্রগতি সম্পর্কে সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, গত ৩০ আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ছিল ৮৭ শতাংশ ও আর্থিক অগ্রগতি ৮২.৭১ শতাংশ। প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় ১৩,২৩৩ কোটি টাকা। এছাড়াও প্রকল্পের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আগস্ট-২০২২ শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত অগ্রগতির মধ্যে রয়েছে প্রকল্পটির ইউনিট ১ বয়লার স্টিম ব্লোয়িং গত ১১ জুলাই এবং টারবাইন-এ স্টিম ডাম্পিং ১৪ আগস্টে সম্পন্ন হয়েছে। ১৫ আগস্টে গ্রিডের সাথে টেস্ট সিনক্রোনাইজেশন সম্পন্ন হয়েছে।

rampal2

এছাড়াও শিপ আনলোডার, অ্যাশ ও জিপসাম মজুদ/লোডিংয়ের জন্য জেটি সাইলো, কোল স্ট্যাকিং পথ, কোল ডিরেক্ট ফিডিং ও রিক্লেইমিং পথ, কোল শেড, কোল মিল ও বাঙ্কারিং, লাইমস্টোন ও জিপসাম কনভেয়িং, লাইমস্টোন ফিডিং, জিপসাম ডিসপোজাল ইত্যাদির বিভিন্ন ইরেকশন/কমিশনিং কাজ চলমান। টারবাইন ড্রিভেন বয়লার ফিড পাম্প (টিডিবিএফপি), ইএসপি (সি, ডি পথ), পিএ ফ্যান, ইন্টার কানেক্টিং ট্রান্সফর্মার (আইসিটি)-২, ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, এইচপি হিটার ইত্যাদির বিভিন্ন ইরেকশন/কমিশনিং কাজ চলছে। বিভিন্ন ইক্যুইপমেন্ট ও ড্রাইভের পরীক্ষামূলক চালুর প্রক্রিয়া চলমান। বিভিন্ন স্থানের সুইচগিয়ার ও সার্ভিস ট্রান্সফর্মারের ইরেকশন ও কমিশনিংয়ের কাজও চলছে। কুলিং টাওয়ার ১এ, ১বি এর ইক্যুইপমেন্ট ইরেকশন সম্পন্ন হয়েছে।

এদিকে ইউনিট-২ এর বয়লার ড্রেইনেবল সার্কিটের হাইড্রো টেস্ট গত ৭ আগস্ট সম্পন্ন হয়েছে। কোল মিল, কোল বাঙ্কার, আইডি ফ্যানসমূহ, পিএ ফ্যান-১, এফডি ফ্যান-১ ইত্যাদির ইরেকশন সম্পন্ন হয়েছে। টারবাইন জেনারেটর-২ এর এইচপি টারবাইন ইরেকশন ও এলপি টার্বাইন বক্স আপ সম্পন্ন হয়েছে, অ্যালাইনমেন্টের কাজ চলমান। ফিড-পাম্প, ডিএয়ারেটর, কন্ডেন্সেট এক্সট্রাকশন পাম্প, এলপি ও এইচপি হিটার ইরেকশন সম্পন্ন হয়েছে। ইএসপি-২ এর স্ট্রাকচারাল ও কেসিং প্যানেল, আউটলেট ফানেল ইরেকশন সম্পন্ন হয়েছে; ইনলেট ফানেল ইরেকশন সম্পন্ন হওয়ার পথে। কনডেন্সার এ টিউব ইরেকশন চলমান আছে। কুলিং টাওয়ার ২বি এর ইক্যুইপমেন্ট ইরেকশন সম্পন্ন হয়েছে।

আরও পড়ুন: জ্বালানি সংকটের সমাধান কোন পথে?

এছাড়াও পাওয়ার ইভাকুয়েশনের জন্য ২৩০ কেভি ডাবল সার্কিট ট্রান্সমিশন লাইনের (২৪ কি.মি.) কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ২০২১ সালের ২৯ আগস্ট লাইন চার্জিং এবং একই বছরের ৯ সেপ্টেম্বর ২৩০ কেভি জিআইএস চার্জিং এবং ২৬ সেপ্টেম্বর স্টার্ট-আপ ট্রান্সফর্মার চার্জিং সম্পন্ন হয়েছে। ৪০০ কেভি ডাবল সার্কিট ট্রান্সমিশন লাইন (১৭৩ কি.মি.) এর কাজ বাস্তবায়নাধীন। এরমধ্যে গোপালগঞ্জ- রামপাল লাইন-১ চার্জ করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ রামপাল আইসিটি-১ দিয়ে ২৩০ কেভি খুলনাতে সংযোগ করা হয়েছে। ইউনিট-১ লোডিংয়ের জন্য গোপালগঞ্জ- রামপাল লাইন-২ এবং আইসিটি-২ শিগগির চালু করা হবে।

প্রকল্প বিলম্বিত করেছে করোনার প্রকোপ

প্রকল্প পরিচালক সুভাষ চন্দ্র পান্ডে ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘নির্ভরযোগ্যতা পরীক্ষা ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। ইউনিট-১ এর বাণিজ্যিক উৎপাদন অনেক আগেই শুরু করা সম্ভব হতে পারত, যদি কোভিড-১৯ এর কোনো প্রভাব না থাকত। কারণ মহামারিটি এক বছরেরও বেশি সময় খেয়ে ফেলে।’

rampal2

বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা সরবরাহ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন কয়লা ইতোমধ্যে কেন্দ্র এলাকায় পৌঁছেছে এবং সেপ্টেম্বরে কয়লা বোঝাই আরও দুটি জাহাজ আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।’

এই কর্মকর্তা জানান, একটি দীর্ঘমেয়াদী কয়লা চুক্তি ইতোমধ্যে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, তবে কিছুটা সময় লাগবে। দৃশ্যত পরিবেশগত সমস্যাগুলো আরও সুবিবেচনাপূর্ণভাবে মোকাবেলা করার জন্য চারটি বিশাল শেড নির্মাণ করা হচ্ছে, যার কয়লা মজুদ ক্ষমতা দশ লাখ মেট্রিক টন। একবার এই শেডগুলো সম্পন্ন হলে এটি উভয় ইউনিটের তিন মাসের অপারেশন চালানোর জন্য যথেষ্ট হবে।

আরও পড়ুন: দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা কতদূর?

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ধরনের কেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ আমদানিকৃত কয়লার দামের ওপর নির্ভর করে এবং তাও পরিবর্তনশীল। এটা নির্ভর করে বাইরের কয়লার দামের ওপর এবং আমদানি করা কয়লার বাজার মূল্যের ওপরও।

তিনি জানান, কেন্দ্রের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কয়লা আমদানি করা হবে।

মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রকল্পটি ভারত সরকারের কনসেশনাল ফাইন্যান্সিং স্কিমের অধীনে নির্মিত হচ্ছে। এটি বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেডের (বিআইএফপিসিএল) জন্য নির্মাণ করছে ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেড (বিএইচইএল)। প্রকল্পটি ভারতের এনটিপিসি লিমিটেড এবং বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (বিপিডিবি) মধ্যে একটি ৫০:৫০ জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি। ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাচালিত তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি প্রায় দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে স্থাপন করা হচ্ছে।

টিএই/জেবি