পদ্মা সেতুতে চলবে রেল, গতি পাবে নেটওয়ার্কে

প্রকাশিত: ০১ মার্চ ২০২২, ০৬:০১ পিএম
পদ্মা সেতুতে চলবে রেল, গতি পাবে নেটওয়ার্কে

পদ্মা সেতু, পদ্মা নদীর ওপর নির্মাণাধীন একটি বহুমুখী সড়ক ও রেল সেতু। শুধু সেতু নয়, ১৭ কোটি মানুষের স্বপ্ন এটি। কোটি কোটি মানুষের স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন উদ্বোধনের অপেক্ষায়। এরই মধ্যে বহু চ্যালেঞ্জ আর বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে এই সেতু। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই সেতুর কাজ ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। চলছে ফিনিশিংয়ের কাজ।

চলতি বছরের জুনে উদ্বোধন হতে পারে স্বপ্নের এই সেতুটি। তবে রেল চালু হবে আরও কিছু দিন পর। এর মাধ্যমে মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের সঙ্গে শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলা যুক্ত হবে। ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব অংশের সংযোগ ঘটবে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য পদ্মা সেতু একট বিস্ময়ই বটে! এই সেতু ঘিরে বদলে যাবে দেশের রেল যোগাযোগের নেটওয়ার্ক। কমে আসবে দক্ষিণ পশ্চিম জেলাগুলোর দূরত্বও। সেতু ব্যবহার করে রেলপথে রাজধানী থেকে যশোরের দূরত্ব অর্ধেকেরও বেশি কমে আসবে। চলতি বছরের ডিসেম্বরে চালু হবে রেল। পদ্মা সেতু এবং রেল লিঙ্ক প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঢাকা মেইলকে এই তথ্য জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, পদ্মা সেতু ঘিরে দেশের রেলওয়ে নেটওয়ার্কে যুগান্তকারী পরিবর্তন হবে। ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত প্রকল্পটির কাজ চলছে এখন পুরোদমে। সেতুর দুই প্রান্তের ১৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ রেল লিঙ্ক প্রকল্প সম্পন্ন হলে রেলপথে ঢাকা থেকে যশোরের দূরত্ব কমবে ১৯০ কিলোমিটার। দোতলা সেতুর উপরে চলবে যানবাহন নিচে ট্রেন।

জুনে পদ্মা সেতু উদ্বোধন হলেও চলবে না ট্রেন। সেখানে রেললাইন বসানোর কাজ এখনো শুরু হয়নি। কর্তৃপক্ষ বলছেন, গ্যাসলাইনের কাজ শেষে জুনে রেলের অংশ বুঝিয়ে দেবে সেতু বিভাগ। এরপর ছয় মাসে লাইন বসিয়ে ডিসেম্বর নাগাদ শুরু হতে পারে রেল চলাচল।

সেতু উদ্বোধনের ক্ষণগণনা শুরু হয়ে গেছে। যা খুলে দিতে কাজ চলছে পুরোদমে। যেখানে রেললাইন বসবে তার পাশে এখনো গ্যাসলাইন নির্মাণ শেষ হয়নি। জানুয়ারি পর্যন্ত এর অগ্রগতি প্রায় ৯০ ভাগ। বাকি রয়েছে ওয়াকওয়ে নির্মাণ।

পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, সুনির্দিষ্টভাবে এখনও বলা যাবে না। ফিক্সড কিছু হয়নি। কাল পারলে কালই, ছয় মাস পর হলে ছয় মাস পর খুলে দেবো।

তিনি আরও জানান, পদ্মা সেতুর নিচ তলায় গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শেষ পর্যায়ে। লাইন বসানোর পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে।

podma-2

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের পরিচালক আফজাল হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা রেললাইন স্থাপন করলে গ্যাসলাইনে সমস্যা হবে। তারা জুন মাসে আমাদের ব্রিজ হস্তান্তর করবে। আগামী ডিসেম্বরে ভাঙ্গা থেকে মাওয়া অংশ চালু করা যাবে। ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত রেল নেটওয়ার্ক ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে চালু করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।

ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৪ সালে। স্টেশন তৈরি, লাইন, সেতু,কালভার্টসহ পুরো প্রকল্পের অবকাঠামো এখন দৃশ্যমান। রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন জানিয়েছেন, প্রথমে মাওয়া থেকে ভাঙ্গা অংশে প্রায় ৪২ কিলোমিটার রেলপথ পদ্মা সেতুর সড়কপথের সঙ্গেই আগামী জুনে চালুর কথা ছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ যথাসময়ে সেতুর নিচতলা হস্তান্তর না করার কারণেই এই বিলম্ব হচ্ছে।

সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালে শেষ হতে পারে পদ্মা সেতুর রেল লিঙ্ক প্রকল্পের কাজ। যার মধ্যে ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে মাওয়া অংশ চলতি বছরেই সম্পন্ন হবে। আর ঢাকাকে পদ্মা সেতুর সঙ্গে এই সময়ের মধ্যেই যুক্ত করার কর্মযজ্ঞও চলমান রয়েছে। পুরো প্রকল্পে ২০টি রেলস্টেশন থাকছে। এরমধ্যে পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তে দুটি রেলস্টেশনের কাজও দ্রুত এগোচ্ছে। সাসপেনডেন্ট প্ল্যাটফর্ম সমৃদ্ধ দেশের সর্বাধুনিক মাওয়া রেল স্টেশনের অগ্রগতি ৬০ শতাংশ। অপর প্রান্ত জাজিরার ‘পদ্মা’ রেলস্টেশনের অগ্রগতি ৩৫ ভাগ।

পদ্মা সেতু রেল লিঙ্ক প্রকল্পের জুনিয়র প্রকৌশলী মিল্টন সরকার জানিয়েছেন, গুণগত মান নিশ্চিত করেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন চলছে।

রেললিঙ্ক প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, পদ্মা সেতুর নিচতলা হস্তান্তরের পরই রেললাইন বসানো শুরু হয়ে যাবে। তবে সড়ক পথ চালু থাকায় রেলপথে পাথরবিহীন লাইন বসানোর ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কারণ সেতুতে ঢালাই করে পাথরবিহীন লাইন বসাতে হবে। তাই যান চলাচলে ভায়োব্রেশন থাকার কারণে বিশেষ ব্যবস্থায় এই লাইন বসাতে হবে। মূল সেতুতে রেললাইন বসানো না হলেও দুই পাশের সংযোগে পাথরবিহীন রেললাইন স্থাপনের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। এই প্রকল্পের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন। নির্মাণ পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

২০১৪ সালের ৭ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এরপর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রথম স্প্যান বসানো হয়েছিল ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারের ওপর ভাসমান ক্রেনের সাহায্যে এই স্প্যান বসানো হয়। নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে ধাপে ধাপে স্প্যান বসতে থাকে।

শুরুর দিকে একেকটি স্প্যান বসানো হয়েছে কয়েক মাসের ব্যবধানে। পরে অবশ্য দ্রুতই কাজ শেষ হয়। পাশাপাশি অভিজ্ঞতাও বাড়তে থাকে প্রকৌশলীদের। এ কারণেই শেষ দিকের স্প্যান বসাতে সময় কম লেগেছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর ১২ ও ১৩তম পিলারে ৪১তম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয় পুরো সেতু। বাংলাদেশের জন্য পদ্মা সেতু হতে যাচ্ছে ইতিহাসের একটি বড় চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ প্রকল্প।

ডব্লিউএইচ/জেবি