আজিমপুর টু কুড়িল বিশ্বরোডে চলা দেওয়ান বাসে ওয়েবিলের নামে যাত্রীদের কাছে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ অনেক দিনের। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর থেকে এমন অভিযোগ আরও বেড়েছে। এরই মধ্যে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি গণপরিবহনে ওয়েবিল প্রথা বাতিল করেছে। সরকার নির্ধারিত দূরত্ব অনুসারে ভাড়া নির্ধারণসহ পরিবহনে ভাড়া তালিকা ঝুলিয়ে রাখা বাধ্যতামূলক হলেও পরিবহনটি এমন সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ।
নির্ধারিত রুটে চলাচল করা দেওয়ান পরিবহনের কয়েকটি বাস পর্যবেক্ষণ করে প্রতিবেদক। অনুসন্ধানে দেখা যায়, বর্তমানে নির্ধারিত রুটে পরিবহনগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়েবিল লেখার লোক না থাকলেও, স্থান হিসাব করেই নেওয়া হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। ওয়েবিলে চলাচল করা অন্য বাসগুলোর চেয়ে দেওয়ান পরিবহনে ওয়েবিল প্রতি ভাড়া কিছুটা বেশি।
যাত্রী পরিচয়ে বাসের কন্ডাক্টরের কাছে ওয়েবিল না কেটেই সমপরিমাণ ভাড়া আদায় প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বলেন, রাস্তা কিছুটা গরম। মোবাইল-কোর্ট বসছে মাঝেমধ্যেই। পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হলে আবারও ওয়েবিল পদ্ধতিতে যাবেন তারা।
বিজ্ঞাপন

ভাড়া বেশি আদায় করার বিষয়ে জানতে চাইলে কন্ডাক্টর বলেন, পরিবহনটি অন্য যে কোনো বাস থেকে উন্নত। এখানে বসার ব্যবস্থাসহ অন্য সুবিধা বেশি, তাই ভাড়াও বেশি।
যাত্রীদের অভিযোগ, পরিবহনটি এ রুটে চলাচল করা অন্য গাড়িগুলো থেকে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি আদায় করে থাকে। যাত্রীদের সাথে অসদাচরণসহ যাত্রীদের বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া, বাড়তি ভাড়া না দিলে মাঝপথে গাড়ি বন্ধ করে যাত্রীদের জিম্মি করে টাকা আদায় করার মতো অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া নিতেও আপত্তি তাদের। নিলেও দাবি করা অতিরিক্ত ভাড়ার অর্ধেকের সাথে আরও পাঁচ টাকা বেশি আদায় করে থাকে পরিবহনটি।
জানা যায়, আগেই সরকার নির্ধারিত সাব ভাড়া বেশি আদায় করত পরিবহনটি। তেলের দাম বৃদ্ধির পর এখন আরও বাড়ানো হয়েছে। নতুন ভাড়া এখন যাত্রীদের জন্য ‘জুলুমে’ পরিণত হয়েছে। পরিবহনটি চলে আজিমপুর-নিউমার্কেট-সিটি কলেজ-সাইন্সল্যাব-কাঁটাবন-শাহবাগ-বাংলামটর-ফার্মগেট-জাহাঙ্গীর গেট-মহাখালী-ওয়ারলেস মোড়-গুলশান-১-বাড্ডা-নতুন বাজার-বসুন্ধরা আবাসিক-কুড়িল বিশ্বরোড।
বিজ্ঞাপন
আক্ষেপ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরে মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, বাস কোম্পানিটি ১০ টাকার ভাড়া ২০ টাকা রাখছে, নিঃসন্দেহে এটা একটা ‘জুলুম’। পিজি হাসপাতাল থেকে কারওয়ান বাজারের দূরত্ব কতটুকুই-বা, সেখানে কী করে ২০ টাকা ভাড়া হতে পারে? এটা জুলুমই। দিনে আমাকে চার থেকে ছয়বার এ রুটে আসা-যাওয়া করতে হয়। অন্যবাস গুলো ১০ টাকা মানলেও এটা নেয় না। অপমানজনক কথা বলে। গায়ে তেড়ে আসে। টেনে আনে ওয়েবিলের কথা।
ঢাকা কলেজ শিক্ষার্থী শাওন বলেন, শুরু থেকেই আমি দেওয়ান ও স্মার্ট উইনারের যাত্রী। প্রথমে এটি যে অবস্থায় ছিল, এখন আর সে অবস্থায় নেই। কলেজের সামনে দিয়ে যেতে গেট বন্ধ করে রাখে। বাড্ডা নতুন বাজার পর্যন্ত ৩৮ টাকার স্থানে ৫৫ টাকা নেয়। শিক্ষার্থী হলে ত্রিশ টাকা দিতে হচ্ছে। কিছুদিন আগেও ২৫ টাকা নিলেও এখন শিক্ষার্থীদের থেকে ত্রিশ টাকা নেয়। এর মূল কারণ এ রুটে বাস মাত্র দুইটি।

বেসরকারি কোম্পানির চাকরিজীবী আসিক হাসানএ পরিবহনের বাসে নিয়মিত যাতায়াত করেন। তিনি বলেন, নতুন ভাড়া হয়রানিমূলক হয়ে গেছে। সরকার নির্ধারিত দূরত্ব অনুসারে ভাড়া নির্ধারণসহ পরিবহনে ভাড়ার তালিকা ঝুলিয়ে রাখা বাধ্যতামূলক। এদের কোথাও তালিকা নেই। কিছু বললে তারা বলে এসব নিয়মে তারা চলতে পারবে না।
আরেক চাকরিজীবী হোমায়রা হিমু প্রতিদিন শাহবাগ থেকে আসেন নতুন বাজার। তিনি বলেন, শাহবাগ থেকে নতুন বাজার আগে ভাড়া নিতো ৪০ টাকা। তেলের দাম বৃদ্ধির পর থেকে ৫২ টাকা চাইছে। ৫০ টাকা দিলেও বলে দুই টাকা কম নিয়েছে। একশ টাকার নোট দিলে রাখে ৫৫ টাকা। বলে ভাঙতি নেই। সরকারি কিলোমিটার প্রতি ভাড়া হিসেবে ভাড়া আসবে ৩২ টাকার বেশি না। এ রুটে শাহবাগ থেকে আর কোনো বাসও নেই যাতায়াতের। এছাড়া সরকার নির্ধারিত ভাড়া দিতে চাইলে বাস থেকে নেমে যেতে বলে।
আফসানা শেখ নামে আরেক যাত্রী জানান, আমরা তাদের কাছে জিম্মি। একদিকে নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে কয়েকগুণ বেশি আদায় করছে। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার পাওয়া যায় না।
দেওয়ান পরিবহনের বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়া দিতে চাওয়ার অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে এই যাত্রী বলেন, প্রথম প্রথম বেশি ভাড়া দিতে প্রতিবাদ করতাম। ৯৯৯ এ ফোন করে অভিযোগও জানিয়েছি। শুধু আমি না অনেকেই জানিয়েছে। কোনো সমাধান আসেনি।
তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী নাসরিন আক্তার ঢাকা মেইলকে বলেন, দেওয়ান পরিবহন খুবই বেপরোয়া। তারা কারোর কথা মানে না। একদিকে বেশি ভাড়া আদায় করেছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের থেকে হাফ ভাড়ার সাথে আরও পাঁচ টাকা দাবি করে সবসময়। বলে ওয়েবিল ২০ টাকা।
এদিকে বাসে তালিকা দৃশ্যমান রাখা ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ডিজিটাল ভাড়ার তালিকা টানানোর নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেছিলেন একজন আইনজীবী। গত জানুয়ারিতে দেওয়া আদেশে এক মাসের মধ্যে বিআরটিএকে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত কিছুই জানায়নি সংস্থাটি।
রিটকারী আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবু তালেব ঢাকা মেইলকে বলেন, জানুয়ারিতে আদালত আদেশ দিলেও এখনও কোনো কিছু জানায়নি বিআরটিএ। অন্যদিকে ভাড়ার নামে যাত্রীদের পকেট কাটছে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
বিআরটিএ নতুন ভাড়ার তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশ হওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লায় চলাচলকারী ডিজেল চালিত বাস-মিনিবাসের যাত্রী প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ২০ পয়সা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী সড়ক ও জনপথ অধিদফতর থেকে প্রাপ্ত দূরত্ব এবং সড়ক ও জনপথ অধিদফতর, বিআইডব্লিউটিসি ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ থেকে প্রাপ্ত ব্রিজ টোল/ফেরি ভাড়ার তালিকা অনুসরণ করে যাত্রী প্রতি প্রত্যেক পারাপারে টোল/ফেরি ভাড়া (প্রযোজ্য ক্ষেত্র) নির্ধারণ করে ভাড়ার চার্ট প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রস্তুতকৃত ভাড়ার তালিকা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পাঠানো হলো।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর ৬ আগস্ট রাতে বনানীতে বিআরটিএ কার্যালয়ে দীর্ঘ বৈঠকে বাস-মিনিবাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। সিটি সার্ভিসে কিলোমিটার প্রতি বাড়ছে ৩৫ পয়সা। আর দূরপাল্লায় ৪০ পয়সা করে বাড়বে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি জানিয়েছে, ঢাকা শহর ও শহরতলী রুটে চলাচলকারী গাড়ির ওয়েবিলে কোনো স্ল্যাব থাকবে না। রাস্তায় কোনো চেকার থাকবে না। এক স্টপেজ থেকে আরেক স্টপেজ পর্যন্ত গাড়ির দরজা বন্ধ থাকবে, খোলা রাখা যাবে না। রুট পারমিটের স্টপেজ অনুযায়ী গাড়ি থামাতে হবে।
একই সঙ্গে আরও জানানো হয়, বিআরটিএর চার্ট অনুযায়ী ভাড়া আদায় করতে হবে- চার্টের বাইরে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা যাবে না। প্রতিটি গাড়িতে দৃশ্যমান স্থানে ভাড়ার চার্ট অবশ্যই টানিয়ে রাখতে হবে।

বলা হয়, কোনো পরিবহনের গাড়িতে বিআরটিএর পুনঃনির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত যাতে আদায় না করা হয়, সে বিষয়ে সভায় মালিকদের সমন্বয়ে ৯টি ভিজিলেন্স টিম গঠন করা হয়। এসব টিম বিআরটিএর ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে থেকে সব অনিয়ম তদারকিসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।
এর আগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণে বাসমালিকদের দাবির মুখে বাসভাড়া বাড়ায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। ৭ আগস্ট থেকে নতুন এ ভাড়া কার্যকর হয়।
এবিষয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতি মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, গেল নভেম্বরে জ্বালানি তেলের মূল্য লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানোর সময়ে বাসভাড়া ৩৫ শতাংশ হারে বাড়ানো হয়েছে। এর ৯ মাসের মাথায় আবারও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সঠিক ব্যয় বিশ্লেষণ ছাড়া একলাফে বাসভাড়া আবারও ২২ শতাংশ হারে বাড়ানো হয়। প্রতিটি পুরনো লক্কড়-ঝক্কড় বাসকে শো-রুম থেকে নামানো নতুন বাসের দাম, ব্যাংক সুদ ও অন্যান্য নতুন বাসের সুযোগ-সুবিধার হিসাব ধরে ব্যয় বিশ্লেষণ করা হলেও সিটি সার্ভিসে ৯৮ শতাংশ বাস-মিনিবাস চলাচলের অযোগ্য।
তিনি আরও বলেন, বাস মালিকদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করা হলেও সরকার নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর নেই। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার কয়েকগুণ বেশি ভাড়া আদায় হলেও সরকার কার্যত এসব বাসের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। সিটি সার্ভিসে সরকার কিলোমিটার প্রতি ভাড়া নির্ধারণ করলেও বাসে বাসে ওয়েবিলে যাত্রীর মাথা গুণে গুণে ভাড়া আদায় করা হয়। ঢাকা মহানগরীর কথিত সিটিং সার্ভিসে স্বল্প দূরত্বে যাতায়াত করলেও সর্বশেষ গন্তব্য পর্যন্ত ভাড়া পরিশোধ করতে হয়।
ডিএইচডি/এএস




