ডিসিদের চালের বাজার মনিটরিংয়ের নির্দেশ

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট ২০২২, ০৫:৪০ পিএম
ডিসিদের চালের বাজার মনিটরিংয়ের নির্দেশ

দেশে বেড়েই চলছে চালের দাম। জনজীবনে এর চাপ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে জেলা প্রশাসকদের বাজার মনিটরিংয়ের নির্দেশ দিয়েছে সরকার।

রোববার (১৪ আগস্ট) সচিবালয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে সভা শেষে এ কথা জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার।

কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে চালের দাম বেড়েছে, সেক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ভোক্তা অধিকারকে মাঠে নামতে বলেছি। আমাদের মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর থেকে পাঁচটি মনিটরিং কমিটি হয়েছে। জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তারা যেন বাজারদর মনিটর করে। কোথাও যদি কোনো অবৈধ ধান বা চাল মজুদ থাকে সরকারের যে ক্রাশ প্রোগ্রাম আছে, সেটি চলবে।

চালের দাম বৃদ্ধির কারণ নিয়ে সাধন চন্দ্র বলেন, এখন দুইটা সিজনের সন্ধিক্ষণ। বোরো চলে গেছে, আমন আসবে। অনেক জায়গায় খরার কারণে মানুষে আমন লাগানোর বিষয়ে ভয়ভীতিতে আছে। তার সঙ্গে পরিবহন খরচও বেড়েছে।

মন্ত্রী বলেন, পরিবহন খরচ যেটা বেড়েছে সে হিসেবে চালের দাম বাড়েনি। সেখানে আবার অসাধু ব্যবসায়ী আছে, এটা পরিষ্কার। সে কারণে মনিটর করব। অবৈধ মজুত আছে কিনা সে ব্যাপারে নিয়মিত মনিটরিং আছে। আরও মনিটর জোরদারে আমাদের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

খাদ্যমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা নওগাঁ জেলায়। আবার দেশের বৃহত্তর ধান-চালের মোকামও নওগাঁয়। সেই নওগাঁয় এক সপ্তাহে মোটা এবং সরু চালের দাম বেড়েছে কেজিতে চার থেকে পাঁচ টাকা। এদিকে চালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবহন খরচ বেড়েছে। ফলে কিছুটা চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

সরজমিনে নওগাঁর পৌর খুচরা চাল বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে মোটা স্বর্ণা-৫, ৫৪-৫৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। যা এক সপ্তাহ আগে ছিল কেজিতে ৫০ টাকা। এছাড়াও সরু চাল জিরাশাইল কেজিতে ৪ থেকে ৫ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৬৫-৭০ টাকা, কাটারিভোগ ৭২-৭৪ টাকা এবং বিআর-২৮, ৫৮-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

 

নওগাঁ ক্ষুদ্র চাল বাজারের সাধারণ সম্পাদক নূর-নবী বলেন, গত এক সপ্তাহে মোটা চালের দাম কেজিতে ৪ থেকে ৫ টাকা বেড়েছে। পাশাপাশি সরু চালের দামও বেড়েছে।

কারণ হিসাবে তিনি বলেন, নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো ভাতের পাশাপাশি আটা ব্যবহার করতেন। কিন্তু তারা সেই পরিমাণ আটা পাচ্ছে না। এর ফলে মোটা চালে ঝুঁকেছেন নিম্নবিত্তরা। আর এ কারণে মোটা চালের দাম বেড়েছে।

নওগাঁ পৌর খুচরা চাল বাজারের চাল ব্যবসায়ী তাপস কুমার বলেন, মোকামগুলোতে মোটা চালের আমদানি খুব কম। ফলে বেশি দামে কিনে বেশি দামেই বিক্রি করছে হচ্ছে। আবার বেশি দাম দিয়েও চাহিদা মোতাবেক চাল পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিদিন ৫ বস্তা চাহিদার তুলনায় চাল পাওয়া যাচ্ছে ১ থেকে ২ বস্তা।

নওগাঁ সদর উপজেলার মেসার্স ফারিহা রাইস মিলের মালিক শেখ ফরিদ উদ্দিন জানান, সম্প্রতি তেলের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। ফলে পরিবহন খরচ বেড়েছে অনেক। এজন্যই চাহিদা অনুযায়ী মোটা চালের দাম বেড়েছে। এখানে মিল মালিকদের করার কিছু নেই।

নওগাঁ জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, মানুষ সরু চালের ভাত খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু বাজারে সরু ও মোটা চালের দাম বেড়েছে। যাদের সরু চাল ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে তারা এখন মোটা চালের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে মোটা চাউল কেনার ফলে বাজার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে সরু চালের চেয়ে মোটা চালের দাম।

তিনি বলেন, মোটা চালের চাহিদা না থাকায় কৃষকরা মোটা জাতের ধান চাষও কমিয়ে দিয়েছেন। বাজারে মোটা জাতের ধানের সংকট।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংবাদদাতা জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ধানের মোকামে ক্রমেই বাড়ছে ধানের দাম। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চালের দামও।

জানতে চাইলে আশুগঞ্জ উপজেলা অটোরাইস মিল মালিক সমিতির সদস্য হাসান ইমরান জানান, ধর্মঘটের কারণে ট্রাকের ভাড়া বাড়ানোর সময়ই আমরা বলা হয়েছিল যে, এর প্রভাব চালের বাজারে পড়বে। উৎপাদন খরচ বেড়েছে, তাই চালের দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প পথ নেই। যদি জ্বালানি তেলের দাম না কমে, তাহলে ধান-চালের বাজার দর কমবে বলে মনে হচ্ছে না। উল্টো বাজার আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে বলেও জানান তিনি।

গত শুক্র ও শনিবার (১৩ আগস্ট) রাজধানীর কারওয়ান বাজার, বাবুবাজারসহ বিভিন্ন মার্কেটসহ কয়েকটি খুচরা বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে বেড়েছে মোটা ও চিকন চালের দাম। যেখানে কেজি প্রতি পাইকারি বাজারে তিন থেকে চার টাকা এবং খুচরা পর্যায়ে ক্রেতাদের কিনতে হচ্ছে পাঁচ থেকে ছয় টাকা বেশি দিয়ে। ব্যবসায়ীরা শঙ্কা করছেন দাম আরও বাড়তে পারে।

বাদামতলি ঘাটের পাইকারি এক চাল ব্যবসায়ী ও রাইস এজেন্সির মালিক জানান,  ডলারের দামও বেশি ফলে সরকার আমদানির অনুমতি দিলেও আমদানি কম হচ্ছে। ফলে বাজারে চালের সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। আর মিল মালিকদের কাছে যে চাল আছে সেটা বেশি দামের আশায় বাজারে ছাড়ছে না। তাই সরকারকে মজুত পরিস্থিতি ও নতুন চাল না ওঠা পর্যন্ত মানে আগামী বৈশাখ মাস পর্যন্ত কী পরিমাণ চাহিদা রয়েছে সেটার হিসাব করতে হবে। সেভাবে আমদানি করতে হবে।

চালের বাজার নিয়ে যখন নানামুখী আলোচনা হচ্ছে তখন খাদ্যমন্ত্রীর এমন ঘোষণার ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগটি কম নিতে পারবেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

ডব্লিউএইচ/এমআর