রাজধানীতে একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয় ও থানা প্রাঙ্গণ—কোনো জায়গাই বাদ যাচ্ছে না।
এসব ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের পক্ষ থেকে এসব ঘটনার জন্য কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগকে দায়ী করা হয়েছে।
রোববার (৮ নভেম্বর) সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, মালিবাগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান কার্যালয়, পল্লবী থানা প্রাঙ্গণ, নীলক্ষেত ও রাজধানীর আরও কয়েকটি স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

একই দিন ভাটারার নতুনবাজার এলাকায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি স্কুলবাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এসব ঘটনায় পল্লবী থানা প্রাঙ্গণে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) এক সদস্য আহত হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে দুজনকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
ঘটনাগুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিস্ফোরণের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সন্ধ্যা ৬টা থেকে এক ঘণ্টার ব্যবধানে ক্যাম্পাসের টিএসসি, প্রশাসনিক ভবনসংলগ্ন এলাকা, উপাচার্য চত্বর, ডাকসু, মধুর ক্যানটিনসহ বিভিন্ন স্থানে অন্তত সাত থেকে আটটি ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া নীলক্ষেতের মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ, শাহবাগ ও বাংলা একাডেমির আশপাশেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
টিএসসি এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের চেষ্টার সময় দুজনকে আটক করেন শিক্ষার্থীরা। পরে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. ইসরাফিল প্রাং জানান, আটক দুজনকে শাহবাগ থানা-পুলিশের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পাসের সিসিটিভি ফুটেজও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
রাত সাড়ে ৭টার দিকে মালিবাগে সিআইডি ও বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধান কার্যালয় প্রাঙ্গণে একটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের পর সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে।
এর কিছুক্ষণ পর রাত সোয়া ৮টার দিকে পল্লবী থানা প্রাঙ্গণে ককটেল নিক্ষেপ করে দুর্বৃত্তরা। ফ্লাইওভার থেকে মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি ককটেল ছুড়ে দ্রুত পালিয়ে যায় বলে জানা গেছে। বিস্ফোরণে এসআরবি-৪-এর এক সদস্য সামান্য আহত হন।
এদিকে একই দিন সন্ধ্যায় ভাটারা থানা এলাকার নতুনবাজার ১০০ ফুট সড়কে জলসিঁড়ি ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। বাসটি রাস্তার পাশে দাঁড় করানো ছিল। আগুনে জ্বলতে থাকা বাসের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
রাজধানীতে নাশকতার ঘটনা অবশ্য রোববারই প্রথম নয়। এর আগের দিন শনিবার (৭ নভেম্বর) রাতেও মিরপুরের পল্লবী মেট্রো স্টেশনের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা বিহঙ্গ পরিবহনের একটি বাসে আগুন লাগে। একই রাতে মহাখালী বাস টার্মিনালের পেছনে পার্কিং করে রাখা সোহাগ পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। এতে বাসটি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। ওই দিন বনানী ও মহাখালী এলাকার সেতু ভবনের সামনেও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
এভাবে পরপর দুই দিন রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নগরীর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে পুলিশি স্থাপনা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও গণপরিবহণকে লক্ষ্য করে এসব ঘটনা ঘটায় উদ্বেগ বেড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

এসব ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস ক্যাম্পাসে ককটেল বিস্ফোরণের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে দায়ী করেছেন।
তার অভিযোগ, সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত ও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই এসব কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। এ ধরনের তৎপরতা প্রতিহত করতে শিগগিরই কর্মসূচি ঘোষণার কথাও জানিয়েছেন তিনি। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) বলছে, ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো পরিকল্পিতভাবে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি ও নাশকতার উদ্দেশ্যে ঘটানো হচ্ছে।
রোববার মিন্টো রোডের ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপকমিশনার মো. আকতার হোসেন জানান, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব নাশকতা চালাচ্ছে বলে পরিস্থিতি বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, প্রতিটি ঘটনা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও তদন্ত করা হচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে টহল ও নজরদারি।
এছাড়া ককটেল তৈরির সরঞ্জাম ও বিস্ফোরকদ্রব্য সংগ্রহের উৎস এবং নাশকতায় ব্যবহারের জন্য দাহ্য পদার্থ কেনার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
জেবি



