# ওঁৎপেতে থাকেন ছিনতাইকারীরা
# টার্গেট বেশি নারীরা
# মোটরসাইকেলে এসে কখনো সরাসরি অস্ত্র ঠেকিয়ে ছিনতাই
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। দূরপাল্লার বাস থেকে নেমে রিকশায় গন্তব্যের দিকে রওনা হয়েছেন কেউ। কেউ আবার স্ত্রী-সন্তান বা স্বজনকে নিয়ে ব্যক্তিগত গাড়িতে ফিরছেন বাসায়। এমন সময় পেছন থেকে মোটরসাইকেল কিংবা অন্য কোনো গাড়িতে এসে পথ আটকে দাঁড়াচ্ছে ছিনতাইকারীরা। কখনো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে, কখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে কেড়ে নিচ্ছে টাকা, মুঠোফোন ও মূল্যবান জিনিসপত্র।
রাজধানীতে ভোরের সড়কে এমন ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ছে। ছিনতাইকারীদের বিশেষ লক্ষ্য নারীরা। দূরপাল্লার বাসে করে দেশে ফেরা প্রবাসীরাও বাদ যাচ্ছেন না। রিকশা, অটোরিকশা কিংবা ব্যক্তিগত গাড়িতে চলাচল করেও নিরাপদ থাকতে পারছেন না অনেকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত ছিনতাইকারীদের গ্রেফতার করছেন। তবু ভোরের ছিনতাই বন্ধ হচ্ছে না।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৬৫টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জুলাইয়ে ২০টি, আগস্টে ২২টি এবং সেপ্টেম্বরে ২৩টি মামলা হয়। তবে ভুক্তভোগীদের অনেকে ছিনতাইয়ের শিকার হলেও মামলা করতে চান না। ফলে অনেক ঘটনা থেকে যাচ্ছে আড়ালে।
ঢাকায় ছিনতাইয়ের মামলায় গ্রেফতার ব্যক্তিদের বেশির ভাগের বয়স ২০ থেকে ২৫ বছর। তারা সাধারণত তিনটি ধাপে ছিনতাই করেন। বিশেষ করে মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত তাদের তৎপরতা বেশি।
প্রবাসীরা অন্যতম লক্ষ্য
গত ২ অক্টোবর শুক্রবার রাত ১১টার দিকে সৌদি এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন ৩০ বছর বয়সী ওমার। তাকে নিতে বিমানবন্দরে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন বাবা দুদু মিয়া। সঙ্গে ছিলেন চাচাতো ভাই আব্দুর রহমান ও দুলাল মিয়া।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে রাত সাড়ে ১২টা বেজে যায়। গভীর রাতে ছিনতাইয়ের আশঙ্কায় তারা তখনই বাড়ির উদ্দেশে রওনা হননি। পরে ভোর পৌনে পাঁচটার দিকে ব্যক্তিগত গাড়িতে করে কেরানীগঞ্জের সুবর্ণসুর গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন।
ওমারের ভাষ্য, গণভবনসংলগ্ন জুলাই জাদুঘর ও জিয়া উদ্যানের সিগন্যাল পার হয়ে বামে ইউটার্ন নেওয়ার সময় পেছন থেকে একটি হায়েস গাড়ি তাদের গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। ওই গাড়ি থেকে চার-পাঁচজন নেমে নিজেদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দেন। গাড়িতে অবৈধ মালামাল রয়েছে—এমন তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়ে তারা তল্লাশি করতে চান। একপর্যায়ে গাড়ির চাবি নিয়ে নেন। এরপর তল্লাশির নামে ওমারের কাছে থাকা ৪ হাজার ৭০০ সৌদি রিয়াল ও প্রায় ৮৮ গ্রাম স্বর্ণালংকার নিয়ে যান বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ঘটনাটি ঘটে ভোর পাঁচটার দিকে। ওমার বলেন, পুরো ঘটনা দেড় মিনিটের মধ্যে ঘটে। যাওয়ার সময় ছিনতাইকারীদের একজন তাকে চুপচাপ চলে যেতে হুমকি দেন। তখন একজনের হাতে ছুরি এবং আরেকজনের হাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবহৃত লাইট স্টিক দেখতে পান তিনি।
ওমার ২০২০ সালের মার্চে সৌদি আরবে যান। সেখানে একটি কোম্পানির ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন। দীর্ঘ প্রবাসজীবনে সঞ্চয় করা অর্থ ও স্বর্ণালংকার নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন তিনি।
সম্প্রতি ভোরে ছিনতাই বেড়েছে
গত ১৭ অক্টোবর সকাল সোয়া সাতটার দিকে রাজধানীর শ্যামলীতে স্ত্রীসহ ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন সাংবাদিক শাহজাহান আকন্দ শুভ। তারা কুষ্টিয়া যাওয়ার জন্য শ্যামলী থেকে রিকশায় করে বের হয়েছিলেন। কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার পথে একটি মোটরসাইকেল তাদের রিকশার কাছে আসে। মোটরসাইকেলে থাকা দুই ছিনতাইকারীর একজন তার স্ত্রীর হাতে থাকা ভ্যানিটি ব্যাগটি টান দিয়ে নিয়ে যান। এ সময় তারা নগদ টাকা, মুঠোফোন ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র হারান।
এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সাদেক খান রোডে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। সেদিন সকাল সাড়ে সাতটার দিকে হৃদয় মিয়া নামে এক ব্যবসায়ী জরুরি কাজে মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হন। পথে সাদেক খান রোডে তার গতিরোধ করে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করেন ছিনতাইকারীরা। পরে তার মোটরসাইকেল ও টাকা নিয়ে পালিয়ে যান তারা।
সম্প্রতি মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার কবরস্থানেও ছিনতাইয়ের শিকার হন এক যুবক। তার ভাষ্য, বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করতে ভোরে কবরস্থানে গিয়েছিলেন তিনি। জিয়ারত শেষে পেছনে ফিরে কয়েকজন যুবককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। তাদের সবার হাতে ছিল চাপাতি। একপর্যায়ে তাকে ঘিরে ধরে মুঠোফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে চলে যান তারা।
গাবতলী ও শ্যামলী রুটে বেশি ঘটনা
এর আগে গত ২৯ আগস্ট ঢাকায় এসে ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারান বগুড়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রনজিলা পারভীন। পরে এ ঘটনায় র্যাব ও পুলিশ পৃথকভাবে কয়েকজন ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করে। এরও আগে চলতি বছরের শুরুতে উত্তরায় মুক্তা আক্তার এবং গত জুনে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে সোহেলি ইসলাম একই কৌশলে ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে প্রাণ হারান বলে জানা গেছে।
বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজধানীতে ভোরে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটছে গাবতলী থেকে শ্যামলী অভিমুখী সড়কগুলোতে। গাবতলীতে দূরপাল্লার বাস থেকে নেমে যারা রিকশায় করে বাসার দিকে রওনা হন, তাদের বেশি লক্ষ্য করেন ছিনতাইকারীরা। এ ক্ষেত্রে নারীরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। টেকনিক্যাল মোড়, শ্যামলী ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালসংলগ্ন সড়কে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটেছে।
রাতের ফ্লাইওভারও হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ
শুধু ভোরের সড়ক নয়, গভীর রাতেও রাজধানীর বিভিন্ন ফ্লাইওভারে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। অভিযোগ রয়েছে, ছিনতাইকারীরা ফ্লাইওভারের সড়কে শক্ত নাইলনের সুতা বেঁধে রাখছেন। মোটরসাইকেল নিয়ে ওই সুতা অতিক্রম করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে আহত হচ্ছেন চালকেরা। এরপর ছিনতাইকারীরা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তাদের টাকা, মুঠোফোন, ল্যাপটপ, এমনকি মোটরসাইকেলও নিয়ে যাচ্ছেন।
মহাখালী, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরা-গাজীপুর ফ্লাইওভারে এ ধরনের ছিনতাইয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনা নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপেও পোস্ট দিচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।
এমন একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী সাইফুর রহমান। তিনি সম্প্রতি গভীর রাতে মহাখালী ফ্লাইওভার দিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। ফ্লাইওভারের মাঝামাঝি পৌঁছানোর পর হঠাৎ তার গলায় সুতার মতো কিছু একটা লাগে। মুহূর্তেই মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে যান তিনি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কয়েকজন যুবক ছুটে এসে তার পকেটে থাকা মুঠোফোন ও মানিব্যাগ নিয়ে যান।
এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর রাত আড়াইটার দিকে আইটি বিশেষজ্ঞ তানভীর আহমেদ মহাখালী ফ্লাইওভারে একইভাবে ছিনতাইয়ের শিকার হন বলে অভিযোগ করেছেন। তার দামি স্মার্টফোন, ল্যাপটপের ব্যাগ ও মানিব্যাগ নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।
পুলিশ যা বলছে
ডিএমপির কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীতে ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই মাদকাসক্ত। ফলে কারাগার থেকে বেরিয়ে এসেও অনেকে আবার ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ছেন।
এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ওসমান গণি ঢাকা মেইলকে বলেন, এমন অভিযোগ তারা পাচ্ছেন। সেগুলো আমলে নিয়ে পুলিশ কাজ করছে। এ জন্য সকাল ও ভোরের দিকে টহল বাড়ানো হয়েছে। ছিনতাইকারীদের তালিকাও নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে।
এআরএম




