মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

জামায়াতের বক্তব্য গবেষণা তথ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ: টিআইবি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:১০ পিএম

শেয়ার করুন:

জামায়াতের বক্তব্য গবেষণা তথ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ: টিআইবি
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর লোগো।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যকে ‘অসত্য’ ও ‘বিভ্রান্তিকর’ আখ্যা দিয়ে দলটির দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে সংস্থাটি।

টিআইবি বলছে, ‘জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গণমাধ্যমে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা গবেষণার তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং অপ্রাসঙ্গিক তথ্য ব্যবহার করে দলের প্রকৃত রাজনৈতিক চর্চাকে আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) টিআইবি থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এমন প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তি বলা হয়, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২-এর ৯০বি(১)(খ)(অ) ধারা অনুযায়ী, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে সব পর্যায়ের কমিটিতে নারীদের জন্য ন্যূনতম ৩৩ শতাংশ সদস্যপদ সংরক্ষণের লক্ষ্য নির্ধারণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে তা অর্জনের বিধান রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব বিশ্লেষণ করলে এই বিধান পালনে ব্যাপক ঘাটতি দেখা যায়।

টিআইবির গবেষণায় কেন্দ্রীয় কমিটি বলতে কেন্দ্রীয় বা জাতীয় নির্বাহী কমিটি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ কিংবা কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদকে বোঝানো হয়েছে। সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে একই ধরনের কমিটির তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২০২৩-২৫ মেয়াদের ১৯ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী সদস্য নেই। টিআইবির মতে, এটি আরপিওর সংশ্লিষ্ট বিধানের স্পষ্ট লঙ্ঘন। কারণ, আইনে দলের প্রতিটি কমিটিতে নারীদের অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হয়েছে।

অন্যদিকে জামায়াতের বক্তব্যে বলা হয়েছে, দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদে ২১ জন নারী সদস্য এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরায় ১২২ জন নারী সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া দলের রুকনদের মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী।

এ প্রসঙ্গে টিআইবি বলছে, গবেষণায় শুধু কেন্দ্রীয় কমিটি অর্থাৎ কেন্দ্রীয় বা জাতীয় নির্বাহী পরিষদ কিংবা কমিটিতে নারীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কোনো দলের জাতীয় বা কেন্দ্রীয় কাউন্সিল, সম্মেলন কিংবা মজলিসে শুরায় কতজন নারী রয়েছেন, তা গবেষণার আলোচ্য বিষয় ছিল না। আরপিও ১৯৭২-এ কোনো দলে মোট কতজন নারী সদস্য থাকতে হবে, সে বিষয়ে বাধ্যবাধকতা নেই। বরং নারী কর্মীদের মধ্য থেকে বিভিন্ন কমিটিতে কতজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

টিআইবির মতে, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের বক্তব্যে কেন্দ্রীয় কমিটির পরিবর্তে কর্মপরিষদ, মজলিসে শুরা ও রুকনদের মধ্যে নারীর সংখ্যা তুলে ধরা হয়েছে। এসব তথ্য গবেষণার বিষয়বস্তুর সঙ্গে প্রাসঙ্গিক নয়। ফলে এ ধরনের তথ্য উপস্থাপন সত্যের অপলাপ ছাড়া আর কিছু নয়।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতিটি স্তরে একটি করে কমিটি রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন হারে নারীদের অন্তর্ভুক্তি দেখা যায়। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রে শুধু নারীদের মধ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিটি স্তরে পৃথক কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি স্তরে পুরুষদের জন্য একটি এবং নারী কর্মীদের জন্য আলাদা কমিটি রয়েছে। একইভাবে নারী কর্মীদের জন্য পৃথক মজলিসে শুরা ও কর্মপরিষদ রাখা হয়েছে।

তবে নারীদের জন্য পৃথক কমিটি থাকলেও দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী সদস্য নেই। এমনকি নারীদের জন্য পৃথক কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদও গঠন করা হয়নি। দলটির আমির, নায়েবে আমির, সেক্রেটারি জেনারেল ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের মতো নেতৃত্বস্থানীয় পদেও নারী কর্মীদের অন্তর্ভুক্তির নজির নেই।

টিআইবি বলছে, শুধু নারীদের মধ্যে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পৃথক কমিটি গঠন করাকে দলের সামগ্রিক কার্যক্রমে নারীর অন্তর্ভুক্তি বলা যায় না। বরং এ ধরনের ব্যবস্থা নারীদের একটি নির্দিষ্ট পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখে। পৃথক নারী কমিটিকে দলে নারীর অন্তর্ভুক্তি হিসেবে দাবি করা এক ধরনের শুভঙ্করের ফাঁকি।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী থেকে কোনো আসনে নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। দলটির দাবি অনুযায়ী, সদস্যদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ নারী থাকলেও তাঁদের মধ্য থেকে একজনকেও নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তবে এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী তাদের বিবৃতিতে কোনো মন্তব্য করেনি।

এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের বিভিন্ন ধারা বাংলাদেশের সংবিধানের কয়েকটি মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও গবেষণায় উল্লেখ করেছে টিআইবি। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও চেতনার ভিত্তিতে সমাজ গঠন, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হিসেবে স্বীকার না করা, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য সব নিয়মনীতি ও পদ্ধতি প্রত্যাখ্যান এবং ইসলামি আকিদাবিরোধী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখার মতো বিষয়।

টিআইবির মতে, এসব বিধান সংবিধানের জনগণের ক্ষমতার মালিকানা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ধর্ম ও লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য না করার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সংস্থাটি বলছে, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে গবেষণায় পাওয়া তথ্যকে অসত্য বা বিভ্রান্তিকর বলার কোনো সুযোগ নেই। বরং দলটির বিবৃতির মাধ্যমে গবেষণার তথ্য অস্বীকার এবং অপ্রাসঙ্গিক তথ্য ব্যবহারের মাধ্যমে দলের প্রকৃত রাজনৈতিক চর্চাকে আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

টিআইবি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ সব রাজনৈতিক দলকে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনের ফলাফল গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে উত্থাপিত সুপারিশ অনুযায়ী নিজ নিজ দলের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবি জানায়, সংস্থাটির প্রতিটি গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও সমাজবিজ্ঞানে অনুসৃত গবেষণাপদ্ধতি ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণার তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা ও যথার্থতা নিশ্চিত করতে প্রাথমিকভাবে সংগৃহীত তথ্যের সঙ্গে বিভিন্ন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উৎসের তথ্যের সামঞ্জস্য যাচাই করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন স্তর ও পর্যায়ে ক্রসচেকসহ সম্ভাব্য সব উৎস থেকে তথ্য যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।

আলোচ্য গবেষণায় রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় পর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ও মনোনীত প্রতিনিধি, দলীয় নেতা-কর্মী, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, শিক্ষক ও গবেষকদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর ওয়েবসাইট, দলীয় দপ্তর, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, গবেষণা প্রবন্ধ ও বই থেকে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে।

এএইচ/এএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর