- সোহাগ ও খাদ্য কর্মকর্তা হারুন মিলে সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন
- পুরো চক্রকে ধরতে মাঠে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী
- সোহাগ ফকিরকে নিয়ে কথা বলছেন না সহকর্মীরা
যুব উন্নয়ন অধিদফতরের প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় সোহাগ ফকিরকে গ্রেফতারের পর চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। প্রশ্নফাঁসের টাকায় ঢাকায় সোহাগ ফকিরের একাধিক ফ্লাটের তথ্য পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থা। তবে এ ঘটনায় সোহাগ ফকির ছাড়াও কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের একাধিক কর্মকর্তা এই প্রশ্নফাঁসে জড়িত বলে সন্দেহ করছেন তারা।
সম্প্রতি যুব উন্নয়ন অধিদফতরের প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় গত ২০ অক্টোবর মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার বদরপাশা ইউনিয়নের দূর্গাবর্দী গ্রাম থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
চাকরিতে ঢুকেই প্রশ্নফাঁস, একাধিক ফ্ল্যাটের তথ্য মিলেছে সোহাগ ফকিরের
সিআইডির তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সোহাগ ফকির চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এরপর প্রশ্নফাঁস করে সোহাগ ফকির একাধিক ফ্লাট কিনেছেন। যা প্রাথমিক তদন্তের তথ্যে মিলেছে। এখন সেগুলো যাচাই-বাছাই করছেন তারা।
সূত্র আরও জানিয়েছে, সোহাগ ফকিরের সঙ্গে তার প্রতিষ্ঠান কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের আরও অনেকে জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও এখনো নাম পাওয়া যায়নি। তবে তাদের ব্যাপারে তদন্ত চলছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন তাদের সবার নাম উঠে আসবে। এজন্য সোহাগ ফকিরের সঙ্গে কার কার নিয়মিত যোগাযোগ হতো, তার মোবাইল নম্বর, হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে কারা কথা বলতেন, তিনি কোথায় কোথায় যেতেন এবং তার ব্যাংক ব্যালেন্স যাচাই করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তদন্তকারীরা সোহাগের ব্যাপারে কঠিনভাবে কাজ শুরু করেছেন।
এ বিষয়ে সিআইডির মিডিয়া বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার ছুফি উল্লাহ বলেন, তাকে আমরা এখনো রিমান্ডে পাইনি। কারণ গ্রেফতারের পরপরই তাকে আদালতে তোলা হলে পরে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আবেদন করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেই প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আমরা তার সম্পদ, ব্যাংক ব্যালেন্স সব কিছু যাচাই করব। এ ছাড়াও তার সঙ্গে আরও কারা কারা জড়িত; কে তাকে এই জগতে নিয়ে এসেছে; সেসবও জানার চেষ্টা করব।
সোহাগ ফকিরকে নিয়ে মুখ খুলছেন না সহকর্মীরা
জানা গেছে, সোহাগ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সাপোর্ট সার্ভিস ইউনিটের সহকারী পরিচালক। সরকারি চাকরিতে থেকেই সোহাগ ফকির দিনের পর দিন এমন অপরাধ করে যাচ্ছিলেন। সম্প্রতি গ্রেফতার না হলে তাকে কখনোই শনাক্ত করা যেত না। তবে তার পেছনে তার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদেরও সমর্থন ও সহায়তা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে সোহাগ ফকিরকে গ্রেফতার করা হলেও চাকরি থেকে এখনো বরখাস্ত করা হয়েছে কি না; তা জানতে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের সদস্য পরিচালক ড. মো. ছয়ফুল্লাহকে টানা দুই দিন কল করা হয়। তাকে দুই দিনই ফোনে পাওয়া সম্ভব হয়নি। এমনকি তাকে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
এদিকে আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, সোহাগ ফকির খুবই ধুরন্ধর ব্যক্তি। ফলে তিনি তার ফ্লাট ও সম্পত্তিগুলো বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের নামে করেছেন বলেও মনে করছেন তারা। তবুও তার যাবতীয় সম্পদের তথ্য সংগ্রহে তারা মাঠে নেমেছেন। যা খুব শিগগিরই প্রকাশও করবেন তারা।
এদিকে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই চক্রের অন্যতম সদস্য সোহাগ ফকির। তিনি ছাড়াও বিভিন্ন দফতরের যে পাঁচজন রয়েছে তাদেরও নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তারা এসব প্রতিষ্ঠানে ঢোকার আগে থেকেই এসব অপকর্ম করে আসছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে পুরো চক্রটিকে ধরতে আরও সময় লাগবে।
সোহাগ ফকির ও খাদ্য কর্মকর্তা হারুনের সিন্ডিকেট
যুব উন্নয়ন অধিদফতরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস চক্রে সোহাগ ফকির সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা হারুন অর রশিদের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। যদিও সম্প্রতি এমন অভিযোগ ওঠার পর থেকে নিজ কর্মস্থল ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন হারুন।
জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সহকারী পরিচালক (সংস্থাপন) সোহাগ ফকিরের কাছ থেকে প্রশ্ন যেত সিরাজগঞ্জের জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হারুন অর রশিদের হাতে। হারুন ছাড়াও তার নিচে কাজ করতেন আরও তিনজন। হারুন ও সোহাগ দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। পড়াশোনার সময় থেকেই তাদের মধ্যে বেশ সখ্যতা গড়ে ওঠে। বাকি ৩ কর্মকর্তা হলেন— বিসিএসআইআরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর কাজল আহমেদ, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির সহকারী পরিচালক রাফিউল ইসলাম ও ভরতখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক হরিপ্রসাদ রায়।
এসআরবির হাতে গ্রেফতার ৭
এর আগে গত ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদফতরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষা প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠায় শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়। এ ঘটনায় পরদিন ১১ অক্টোবর মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। তদন্তে তার নাম আসার পর সিআইডি সোহাগ ফকিরকে গ্রেফতার করে ঢাকায় নিয়ে আসে। এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় মোট আটজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার মধ্যে সাতজনকে গ্রেফতার করেছে এসআরবি।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন— পরিবেশ অধিদফতরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম, এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ এবং একই প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর। এ ছাড়াও মফিজুল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান সুজন নামে দুইজন চাকরিপ্রত্যাশী।
এ ছাড়াও গত ১৬ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদফতরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পরীক্ষা চলাকালে রাজধানীর বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে রেশমা আক্তার নামে এক পরীক্ষার্থীকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
এমআইকে/এফএ




