- দুই বছর মেয়াদ বাড়াতে চায় এসজিএফএল
- খননে চুক্তি ৪৩৩ কোটি টাকার
- সড়ক নির্মাণেও ধীরগতি
- অনুসন্ধান শুরুর আগেই মেয়াদ শেষ
- জমি জটেই পিছিয়ে গ্যাস অনুসন্ধান
দেশে গ্যাসের বাড়তি চাহিদা মেটাতে সিলেটে দুটি অনুসন্ধান কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দুই বছরেও শুরু করা যায়নি মূল খননকাজ। জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতা, স্থানীয় জমির মালিকদের আপত্তি এবং সংযোগ সড়ক নির্মাণে ধীরগতির কারণে আটকে আছে ৬৪৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকার প্রকল্প। গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়েছে। অথচ সিলেটের জৈন্তাপুরে ডুপিটিলা-১ ও গোলাপগঞ্জে কৈলাসটিলা-৯ নম্বর কূপের খননকাজ এখনো শুরু হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (এসজিএফএল) এবার মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এতে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে দুটি অনুসন্ধান কূপ থেকে ১০ বছরে মোট ৫৬ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে এসজিএফএল। দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কূপ দুটি খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণেই দীর্ঘ সময় চলে গেছে। ফলে সম্ভাব্য গ্যাসের মজুদ যাচাইয়ের কাজই শুরু করা যায়নি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সরেজমিন পরিদর্শন ও পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে প্রকল্পের ধীরগতির চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ছিল ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দুই কূপের খননকাজ শুরু করার মতো প্রস্তুতি সম্পন্ন করা যায়নি। একদিকে জমি অধিগ্রহণের জটিলতা, অন্যদিকে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা তৈরি করেছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়। তবে প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। দুই বছর মেয়াদি প্রকল্পে জমি হুকুমদখলের মাধ্যমে কূপ খননের স্থান প্রস্তুত করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু স্থানীয় জমির মালিকদের আপত্তির কারণে সেই প্রক্রিয়া এগোয়নি। পরে হুকুমদখলের পরিবর্তে জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, স্থানীয়দের বাধা এবং সংযোগ সড়ক নির্মাণে ধীরগতির কারণে প্রকল্পে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমি অধিগ্রহণের আগেই কূপ এলাকায় পূর্তকাজ শুরু করা হয়েছে। এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে সংস্থাটি। জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত ও সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে নির্মাণকাজের সামঞ্জস্য ছিল কি না, তা পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৪৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৪১৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং এসজিএফএলের নিজস্ব অর্থায়ন ২৩১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় ডুপিটিলা-১ এবং গোলাপগঞ্জ উপজেলায় কৈলাসটিলা-৯ নম্বর অনুসন্ধান কূপ খনন করার কথা। ডুপিটিলা কাঠামোয় প্রায় ৩ হাজার ৪৫০ মিটার এবং কৈলাসটিলায় প্রায় ৩ হাজার ৬০০ মিটার গভীরতায় খনন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এসজিএফএলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কূপ দুটিতে গ্যাস পাওয়া গেলে প্রথম পাঁচ বছর প্রতিদিন মোট ২০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং পরবর্তী পাঁচ বছর প্রতিদিন মোট ১২ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। এই হিসাবে ১০ বছরে মোট ৫৬ বিসিএফ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা ধরা হয়েছে। তবে এটি সম্ভাব্য উৎপাদনের হিসাব। অনুসন্ধান কূপ খনন ও পরীক্ষার পরই প্রকৃত মজুদ এবং উৎপাদনক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। এখনো খনন শুরু না হওয়ায় প্রকল্পের এই লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা নির্ভর করছে জমি অধিগ্রহণ, অবকাঠামো নির্মাণ ও পরবর্তী খননকাজ কত দ্রুত সম্পন্ন করা যায়, তার ওপর।
প্রকল্পের শুরু থেকেই জমি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। ডিপিপিতে কূপ দুটির জন্য ভূমি হুকুমদখলের বিধান রাখা হয়েছিল। এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব ২০২৩ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়। পরে ডুপিটিলা-১ কূপের জমির মালিকদের আপত্তির কারণে প্রক্রিয়াটি আটকে যায়। একই বছরের নভেম্বরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নোটিশ জারি করা হলেও ভূমির মালিকদের আপত্তির কারণে হুকুমদখলের উদ্যোগ কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।
এ পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে হুকুমদখলের পরিবর্তে জমি অধিগ্রহণের সুপারিশ করা হয়। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির সভায় দুই কূপের জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় আসে। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদনের প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ হয়নি। ফলে জমি অধিগ্রহণের পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং মাঠপর্যায়ের কাজ এগিয়ে নেওয়ার মধ্যে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমি হুকুমদখলের পরিবর্তে অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদনের আগে কূপ এলাকায় পূর্তকাজ শুরু করা হয়েছে। এ বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন ও নির্মাণকাজের অনুমোদন যথাযথভাবে সমন্বয় করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন।

ডুপিটিলা-১ কূপের ক্ষেত্রে কিছু নির্মাণকাজ এগোলেও তা মূল খনন শুরু করার জন্য যথেষ্ট নয়। আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কূপটির ৭৮৩ মিটার সংযোগ সড়কের মধ্যে ২৩২ মিটার নির্মাণ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ৬০ মিটার সেতুও রয়েছে। বাকি ৫৫১ মিটারে সেতু ও বড় কালভার্টসহ বিভিন্ন কাজ চলছে। পাশাপাশি কূপের স্থানে বালু ভরাটের কাজ করা হচ্ছে। তবে জমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতা এবং স্থানীয়দের আপত্তির কারণে এসব কাজের গতি কম।
অন্যদিকে কৈলাসটিলা-৯ নম্বর কূপের অগ্রগতি আরও সীমিত। সেখানে ভূমি উন্নয়ন কিংবা সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু করা যায়নি। ফলে কূপ খননের জন্য প্রয়োজনীয় স্থান প্রস্তুত করার কাজও পিছিয়ে রয়েছে। দুটি কূপের মধ্যে একটির সংযোগ সড়কের আংশিক কাজ চললেও অন্যটির ভূমি উন্নয়ন শুরু না হওয়ায় প্রকল্পের সামগ্রিক বাস্তবায়ন আরও জটিল হয়ে পড়েছে।
ডুপিটিলা-১ কূপের জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াতেও নতুন করে পরিবর্তন আনতে হয়েছে। সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) উপমহাব্যবস্থাপক ও প্রকল্প পরিচালক মো. মুশতাক আহমেদ জানিয়েছেন, কূপে যাওয়ার পথে বিদ্যমান একটি সেতু কাঠামোগতভাবে শক্তিশালী করা সম্ভব নয়। এ কারণে আগের ভূমি অধিগ্রহণ প্রস্তাব বাতিল করে ২০২৬ সালের ১৬ এপ্রিল জেলা প্রশাসনের কাছে সংশোধিত প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরে ৩ আগস্ট জেলা ভূমি বরাদ্দ কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়ায় নতুন করে সময় প্রয়োজন হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, কৈলাসটিলা-৯ নম্বর কূপের জন্য ক্ষতিপূরণ বাবদ জেলা প্রশাসনের প্রাক্কলিত অর্থও এসজিএফএলের পরিচালন বাজেট থেকে জমা দেওয়া হয়েছে। ২ সেপ্টেম্বর এ অর্থ জমা দেওয়া হয়। তবে ক্ষতিপূরণের অর্থ জমা দেওয়ার পরও কূপের ভূমি উন্নয়ন ও সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়নি।
জানা গেছে, প্রকল্পের কাজের বড় অংশজুড়ে রয়েছে কূপ খনন, প্রয়োজনীয় মালামাল সংগ্রহ, প্রকৌশল ও পূর্তকাজ। ডিপিপিতে এসব খাতে ৫২৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর খননকাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। নির্বাচিত ঠিকাদারের সঙ্গে ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ৪৩৩ কোটি ৯১ লাখ টাকার চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষ হলেও মূল খননকাজ শুরু করা যায়নি।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রকল্পটির আওতায় গ্যাস পাওয়া গেলে কূপ থেকে গ্যাস সংগ্রহ ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য গ্যাদারিং পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা স্থাপনা, ড্রেন, সীমানাপ্রাচীরসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। কিন্তু কূপ খননের আগেই জমি ও সংযোগ অবকাঠামোর কাজ শেষ করা জরুরি। এসব প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়ায় অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করতে আরও সময় লাগতে পারে।
প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রকল্পটি অনেক আগেই অনুমোদন পেয়েছে। কিন্তু জমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে এখনো উল্লেখযোগ্য কাজ শুরু করা যায়নি।
এসজিএফএলের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রকল্প নেওয়ার সময় কৃষিজমি হুকুমদখলের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু জমির মালিকদের আপত্তির কারণে শুরু থেকেই কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। এসব আপত্তি ও জটিলতা নিরসন করতে দীর্ঘ সময় চলে গেছে। এখন ভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে কাজ এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে প্রকল্পের নকশায়ও পরিবর্তন আসতে পারে। তাই মেয়াদ বাড়ানো প্রয়োজন।
শিল্প ও শক্তি বিভাগের তৈল, গ্যাস ও প্রাকৃতিক সম্পদ উইংয়ের যুগ্ম প্রধান মো. নজরুল ইসলাম জানান, প্রকল্পের অগ্রগতি খুবই সীমিত। এ কারণে নতুন করে প্রায় দুই বছর সময় প্রয়োজন হতে পারে। মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয় পর্যালোচনার প্রয়োজন হলে প্রকল্পটি একনেক সভায় পাঠাতে হতে পারে।
প্রকল্পের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে নিয়মিত প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভা আয়োজনের সুপারিশ করেছে আইএমইডি। ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তি করে নির্মাণকাজ ও খনন কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
এএইচ/এএস




