নদী, সমুদ্র, জলজ জীববৈচিত্র্য, উপকূলীয় জীবন ও জলবায়ু সংকটের নানা চিত্র তুলে ধরে পাঁচ দিনব্যাপী জাতীয় আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনী শেষ হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির চিত্রশালা গ্যালারি-২ এ সমাপনী অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে এ আয়োজনের সমাপ্তি হয়।
ইউথ ফর ওশান, ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ ও মিশন গ্রিন বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে গত ১৮ অক্টোবর এ প্রদর্শনী শুরু হয়। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণ আলোকচিত্রীদের নির্বাচিত ছবিতে উঠে আসে নদী ও সমুদ্রের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, জলজ প্রাণী ও বাস্তুতন্ত্রের সংকট, পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাব এবং প্রকৃতিনির্ভর মানুষের জীবন সংগ্রাম।
সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানম। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক, ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) এর সদস্য এবং ইউথ ফর ওশানের মেন্টর ও উপদেষ্টা শরীফ জামিল।
প্রতিযোগিতায় জলজ জীবিকা ও উপকূলীয় দূষণ বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন ইমরান পারভেজ। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন সাঈদ আব্বাস। জ্বালানি ও পরিবেশ বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন রাজীব রাইহান।
তিনটি বিভাগে রানারআপ হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন, মোহাম্মদ তাহিদুল ইসলাম ও আয়মান নাকিব। বিশেষ স্বীকৃতি পেয়েছেন জাকির হোসাইন, গালিব রহমান নাদিম, মোহাম্মদ শাহজাহান ও আয়মান নাকিব।
প্রতিযোগিতার বিচারক ছিলেন আলোকচিত্রী ও আলোকচিত্র শিক্ষাবিদ আবির আবদুল্লাহ, জার্মানির হামবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত সমুদ্র বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মফিজ রহমান এবং ধরা এর সদস্য ও রিভার বাংলার সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফরিদা খানম বলেন, প্রদর্শনীর ছবিগুলো পরিবেশ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। সমাজের পরিবর্তন ছাড়া জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষা সম্ভব নয়। পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানাই। ভবিষ্যতে এ ধরনের আয়োজনে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হবে।
শরীফ জামিল বলেন, সমুদ্রের সম্ভাবনা ও সমস্যা সম্পর্কে মানুষ সচেতন হলে সরকারও এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে আগ্রহী হবে।
পৃথিবীকে ‘নীল গ্রহ’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমুদ্রকে অসুস্থ করে তুললে মানুষের জনপদও টিকে থাকতে পারবে না।
মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, মৎস্য, জলজ চাষ ও সামুদ্রিক শৈবালসহ সমুদ্রসম্পদ ভিত্তিক বিভিন্ন খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করা সম্ভব। এ আয়োজন সেই সম্ভাবনাগুলো সামনে আনার সুযোগ তৈরি করেছে।
ইনাম আল হক বলেন, মানুষ নিজের ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখতে চাইলেও পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন নয়। পরিবেশের অবনতি রোধে সবাইকে সতর্ক হওয়ার পাশাপাশি কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
ফয়সাল আহমেদ বলেন, নদী ও সমুদ্রের বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হবে।
কেফায়েত শাকিল বলেন, সমুদ্র ও পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব সবার। এ বিষয়ে সচেতনতার বার্তা নিজেদের মধ্যে ধারণ করার পাশাপাশি অন্যদের কাছেও পৌঁছে দিতে হবে।
আবুল বাশার মিরাজ বলেন, বাংলাদেশের সমুদ্রসম্পদ ও সমুদ্র অর্থনীতিতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও নীল অর্থনীতির বিকাশে তরুণ গবেষক ও আলোকচিত্রীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।
আলোকচিত্রী সাঈদ আব্বাস বলেন, সমুদ্র ও উপকূল নিয়ে এ আয়োজন সামুদ্রিক দূষণ এবং এর প্রতিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আয়োজকদের মতে, এ আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনী শুধু ছবি দেখানোর আয়োজন নয়; তরুণদের সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক তুলে ধরা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ। এ ধরনের আয়োজন তরুণদের নদী, সমুদ্র ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সার্ক কৃষি কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ কর্মসূচি কর্মকর্তা আবুল বাশার মিরাজ, সামুদ্রিক সাংবাদিক নেটওয়ার্কের সম্পাদক ও মিশন গ্রিন বাংলাদেশের পরিচালক কেফায়েত শাকিল, জীববৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞ আবু সাঈদ, মাকজিওন লিমিটেডের চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেন, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জলজ চাষ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী, সামুদ্রিক অনুসন্ধানী ও সেভ আওয়ার সি এর পরিচালক সুফি মো. আতিকুর রহমান এবং আলোকচিত্রী সাঈদ আব্বাস ও আয়মান নাকিবসহ অনেকে।
টিএই/এফএ




