চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতি চিরস্থায়ী করে রাখতে নির্মাণ করা হয়েছে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’। এটি শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং জাতির সম্মিলিত স্মৃতি ও ঐক্যের প্রতীক বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীতে ডিএসসিসির নবনির্মিত জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ ও আধুনিকায়ন করা ওসমানী উদ্যানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
আবদুস সালাম বলেন, জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের ৯০ ফুট উঁচু কেন্দ্রীয় স্তম্ভের চারপাশে থাকা আটটি কলাম আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন পরিচয়ের মানুষের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা ও দৃঢ় ঐক্যের প্রতীক। কেন্দ্রীয় স্তম্ভের ৯ ফুট ব্রোঞ্জের অংশে লেজার কাটিংয়ের মাধ্যমে গেজেটভুক্ত ৮৩৬ জন শহীদের নাম খোদাই করা হয়েছে। পাশাপাশি স্মৃতিস্তম্ভের সামনে শহীদদের স্মরণে নির্মাণ করা হয়েছে প্রতীকী সমাধি।
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, সংস্থাটির আজিমপুর ও জুরাইন কবরস্থানে শহীদ ফায়াজ ও শহীদ জুনায়েদের মতো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ২৯ জন শহীদকে সমাহিত করা হয়েছে। তাঁদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা ডিএসসিসির জন্য গর্বের বিষয়।
বক্তব্যে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান তিনি। এ সময় স্বাধীনতার ঘোষক, শহীদ সিপাহসালার ও বীর উত্তম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকেও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে আবদুস সালাম বলেন, আদি ঢাকা ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত ঐতিহাসিক এ উদ্যানকে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও প্রাণবন্ত নাগরিক পরিসরে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে স্থাপত্য নির্মাণের পরিবর্তে প্রকৃতি ও স্থাপত্যের মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ওসমানী উদ্যান অতীত ও বর্তমানের মিলনস্থল। বিদ্যমান বৃক্ষরাজি ও পুনরুজ্জীবিত জলাধারের সমন্বয়ে উদ্যানটি মানুষ, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরি করবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ডিএসসিসির বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রশাসক বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার সামনে রেখে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করছে সংস্থাটি।
তিনি জানান, সার্কুলার ফিউচার মডেল বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলকে রিসোর্স সার্কুলেশন পার্কে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। থ্রি-আর (3R) নীতি অনুসরণ করে ডিএসসিসি এলাকায় চালু করা হয়েছে ‘বর্জ্যের বিনিময়ে বাজার’ ব্যবস্থা। একই সঙ্গে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়নের জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ এবং নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নার্সারি প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে জবাবদিহি ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ডিএসসিসির প্রতিটি অঞ্চলে নিয়মিত গণশুনানির আয়োজন করা হচ্ছে বলে জানান আবদুস সালাম। তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য চালু করা হয়েছে ‘ক্লিন কেয়ার ডিজিটাল ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’। এর মাধ্যমে নাগরিকেরা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে পরিচ্ছন্নতাসংক্রান্ত অভিযোগ জানাতে পারবেন এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির অগ্রগতিও পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রতি শনিবার ‘ক্লিনিং ডে’ পালন করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ডিএসসিসির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রথমবারের মতো প্রাক্-বর্ষা ও বর্ষাকালীন এডিস মশার লার্ভা জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। এ ছাড়া আদি ঢাকাকেন্দ্রিক নগর পর্যটনকে জনপ্রিয় করতে ‘হৃদয়ে ঢাকা’ ও ‘দক্ষিণের জানালা’ শীর্ষক উৎসবের আয়োজন করা হচ্ছে।
ঢাকার নাগরিক সমস্যাগুলো তুলে ধরে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, প্রায় দুই কোটি মানুষের এ নগরীতে জলবায়ু পরিবর্তন, অপর্যাপ্ত ট্রাফিক ব্যবস্থা, শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণসহ জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলা করে ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করে আবদুস সালাম বলেন, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম থেকে শুরু করে নগরীর সামগ্রিক পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে নজরদারি করছেন।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে জুলাই শহীদদের স্বপ্নের বৈষম্যহীন ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান ও প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা-৯ আসনের সংসদ সদস্য ও রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান (মিল্টন) এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যরা।
এম/এআর




