রোববার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

সাইবার আইনের পরিবর্তে মানহানি আইন কার্যকর করার পরামর্শ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৭ পিএম

শেয়ার করুন:

সাইবার আইনের পরিবর্তে মানহানি আইন কার্যকর করার পরামর্শ
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কার্যালয়ে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬ নিয়ে আয়োজিত আলোচনা সভা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে ব্যক্তির সম্মানহানি ঠেকাতে সাইবার আইনের পরিবর্তে প্রচলিত মানহানি আইন কার্যকর করার পরামর্শ দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রেস সচিব ও ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম বলেছেন, সাইবার আইনের মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলা করতে গেলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বরং ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ ও কারও চরিত্রহননের জন্য আর্থিক জরিমানাসহ কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

রোববার (১৮ অক্টোবর) রাজধানীর ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) কার্যালয়ে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬ নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।

শফিকুল আলম বলেন, প্রস্তাবিত আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের মধ্যে ইতোমধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ২৫ ধারায় মানহানি সংক্রান্ত বিধান অন্তর্ভুক্ত করা এবং ৮ ধারাসহ কয়েকটি বিধানের বিষয়ে আপত্তি রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সংশোধন আনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের এখতিয়ার নিয়েও আপত্তি রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যাপক পরামর্শের ভিত্তিতে আইনটি প্রণয়ন করেছিল। বর্তমান সরকার কেন নতুন করে আইনটি সংশোধন করতে চাইছে, তাও বোঝা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং সেখানে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের কারণে নতুন ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তবে এসব সমস্যা সমাধানে কী ধরনের আইন প্রয়োজন, তা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত।

শফিকুল আলম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন অনেকেই ক্ষোভ বা মতামত প্রকাশ করছেন। ইউটিউবার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাবশালীদের অনুসারী এবং বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত গণমাধ্যমের চেয়েও বেশি। তাদের বক্তব্য থেকে কখনো কখনো সামাজিক অস্থিরতাও তৈরি হতে পারে। এসব বিষয় জরুরি ভিত্তিতে মোকাবিলা করা আবশ্যক।

তবে তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে মানহানি সংক্রান্ত প্রচলিত আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না। ফলে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের শিকার ব্যক্তিদের প্রতিকার পাওয়ার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই।

ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক বলেন, বাংলাদেশে যে কেউ যা ইচ্ছা লিখতে পারেন, টেলিভিশনে গিয়ে যে কারও নামে মিথ্যা কথা বলতে পারেন। একজন ব্যক্তি বা তার পরিবারের সদস্যরা ইন্টারনেটে খোঁজ করলে তার সম্পর্কে অসংখ্য মিথ্যা সংবাদ দেখতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালীরা নন, পাঠক আকৃষ্ট করার জন্য কিছু গণমাধ্যমও অতিরঞ্জিত ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ করে। এ ধরনের সাংবাদিকতা ও অপপ্রচারের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

শফিকুল আলম বলেন, মানহানির অভিযোগে কাউকে কারাগারে পাঠানোর পরিবর্তে দেওয়ানি আইনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির প্রতিকার নিশ্চিত করা যেতে পারে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে মানহানির ঘটনায় দেওয়ানি ব্যবস্থায় ক্ষতিপূরণ বা আর্থিক জরিমানার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।

তিনি আরও বলেন, কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করে অন্যের সামাজিক মর্যাদা ও সুনাম ক্ষুণ্ন করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। এক্ষেত্রে আর্থিক জরিমানার মতো প্রতিকার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

সাবেক এই প্রেস সচিব বলেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আক্রমণ করে দিনের পর দিন মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হলে ভুক্তভোগীর প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকা দরকার। অন্যথায় কেউ মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে; পরে নিজেকেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, ইন্টারনেটে প্রকাশিত তথ্য দীর্ঘদিন থেকে যায়। কেউ পরে জনজীবন থেকে সরে গেলেও তার সম্পর্কে প্রকাশিত নেতিবাচক বা মিথ্যা তথ্য অনলাইনে থেকে যেতে পারে। এতে ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা ও সুনাম দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

শফিকুল আলম বলেন, সাংবাদিক হিসেবে আমি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চাই। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল হতে হবে, যাতে ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে লক্ষ্যবস্তু করে মিথ্যা তথ্য প্রচার করা না হয়।

শফিকুল আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মিথ্যা সংবাদ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চরিত্রহননের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। প্রচলিত মানহানির আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা গেলে এসব সমস্যা মোকাবিলায় সাইবার আইনকে আরও কঠোর করার প্রয়োজন কমে আসতে পারে।

এমআর/এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর