দেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যভান্ডার বা বর্জ্যের পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই। পাশাপাশি এ খাতে নীতিমালার ঘাটতি, সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং দায়িত্ব পালনে দুর্বলতা রয়েছে। ফলে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হচ্ছে না বলে মনে করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক ই-বর্জ্য দিবস উপলক্ষে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সুশাসন: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক অধিপরামর্শমূলক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। টিআইবি ও ওয়েস্ট ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইকুইপমেন্ট সোসাইটি বাংলাদেশ যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ২০২১ সালে বিধিমালা প্রণয়ন করা হলেও এর বাধ্যবাধকতাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। দক্ষতা ও সচেতনতার ঘাটতির পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এর অন্যতম কারণ। দেশে অনেক আইন ও বিধিমালা থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন পণ্য উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরির সুযোগও রয়েছে। কিন্তু এসব সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ই-বর্জ্য সংগ্রহের ৯০ শতাংশের বেশি কাজ অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের মাধ্যমে হয়ে থাকে। অথচ এসব কর্মীর প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই। তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও উপেক্ষিত। ফলে ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের যে উদ্দেশ্য, তা পুরোপুরি অর্জিত হচ্ছে না।
তিনি বলেন, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন নীতি ও কৌশল থাকলেও সেগুলো বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। সামগ্রিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে একটি কার্যকর নীতিকাঠামো নেই। এ ছাড়া ই-বর্জ্যের পরিমাণ, ধরন ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার বা তালিকা না থাকায় পরিকল্পনা গ্রহণ ও অগ্রগতি মূল্যায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে।
ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উৎপাদক, আমদানিকারক ও ব্যবহারকারীদের দায়িত্বও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, বিধিমালা অনুযায়ী উৎপাদকদের বর্জ্য সংগ্রহের দায়িত্ব ধাপে ধাপে বাড়ানোর কথা থাকলেও এ ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতির বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। টিআইবির গবেষণায়ও এ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সক্ষমতার ঘাটতি ও সমন্বয়হীনতার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। নীতিকাঠামোয় দায়িত্ব বণ্টন ও বাস্তবায়নের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রতিটি জেলায় উপকরণ পুনরুদ্ধার কেন্দ্র এবং বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপনের অঙ্গীকার সময়োপযোগী। পাশাপাশি পুনর্ব্যবহার, পুনরায় ব্যবহার এবং বর্জ্য কমানোর মাধ্যমে আবর্তনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগের সঙ্গে ভবিষ্যৎ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও যুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি। বলেন, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লে একসময় ব্যবহৃত সৌরপ্যানেল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি বর্জ্যে পরিণত হবে। এসব বর্জ্য কীভাবে সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার ও নিরাপদে ব্যবস্থাপনা করা হবে, তা এখনই নির্ধারণ করা দরকার। শুরু থেকেই কার্যকর পরিকল্পনা না থাকলে ভবিষ্যতে এ খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে পরিত্যক্ত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) উদাহরণ তুলে ধরেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪১ জেলায় প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ইভিএম পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। এগুলোর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কার, কীভাবে এগুলো সংরক্ষণ বা পুনর্ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। অন্যদিকে, এসব যন্ত্র সংরক্ষণের জন্য সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। ভবিষ্যতে সৌরপ্যানেলসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে এখনই প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক পণ্য বর্জ্যে পরিণত হওয়ার পর সেগুলো যত্রতত্র ফেলে দেওয়ার প্রবণতা কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। এ জন্য জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদক, আমদানিকারক, ব্যবহারকারী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী (অব.) প্রমুখ।
এএইচ/এআরএম




