জাতীয় সংসদ ভবনসংলগ্ন আগারগাঁওয়ের উন্মুক্ত স্থানে নতুন সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)।
সংগঠনটি বলেছে, এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণের আগে জাতীয় সংসদ ভবনের স্থাপত্যিক ঐতিহ্য, উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ, যানজট এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর ব্যবস্থাপনার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করা জরুরি।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বাপার সভাপতি অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির এক বিবৃতিতে এ দাবি জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাজধানী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শেরেবাংলা নগর এলাকায় জাতীয় সংসদ ভবন ও এর পারিপার্শ্বিক পরিসরের পরিকল্পনা করা হয়। প্রায় ছয় দশক পর ওই এলাকায় বহুতল ভবনসমৃদ্ধ একটি বৃহৎ সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগের যৌক্তিকতা বর্তমান নগর বাস্তবতা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ চাহিদার আলোকে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বাপা জানিয়েছে, জাতীয় সংসদ ভবন বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়, ইতিহাস ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। ভবনটির স্থাপত্যিক স্বাতন্ত্র্য শুধু মূল স্থাপনার নকশায় সীমাবদ্ধ নয়। এর চারপাশের উন্মুক্ত পরিসর, সবুজ প্রান্তর, জলাধার, দৃশ্যমানতা, ভবনের উচ্চতা এবং সামগ্রিক ভূদৃশ্যের সঙ্গে এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ওই এলাকায় নতুন বহুতল স্থাপনা নির্মাণ করা হলে সংসদ ভবনের স্থাপত্যিক প্রাধান্য, দৃশ্যগত ভারসাম্য ও ঐতিহ্যগত মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংগঠনটি আরও বলেছে, সংসদ ভবন ও এর পারিপার্শ্বিক স্থাপত্যিক পরিবেশ সংরক্ষণের সঙ্গে বিদ্যমান আইন, ইমারত নির্মাণবিধি এবং নগর পরিকল্পনার নির্দেশনার সম্পর্ক রয়েছে। প্রতœসম্পদ আইন, ১৯৬৮, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ২০২০ এবং ঢাকা মহানগরের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা ২০২২-২০৩৫-এ ঐতিহাসিক স্থাপনা ও এলাকা সংরক্ষণের বিভিন্ন নির্দেশনা রয়েছে। প্রস্তাবিত সচিবালয় নির্মাণের ক্ষেত্রে এসব বিধান, ভূমি ব্যবহার, ভবনের উচ্চতা, দৃশ্যগত প্রভাব এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা জনসমক্ষে স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছে বাপা।
বিবৃতিতে উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাপা বলেছে, ঢাকা মহানগরে উন্মুক্ত স্থান, খেলার মাঠ ও সবুজ পরিসর ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। এ অবস্থায় বিদ্যমান বা সম্ভাবনাময় গণপরিসরকে বৃহৎ প্রশাসনিক স্থাপনায় রূপান্তর করা হলে নাগরিকদের খেলাধুলা, শরীরচর্চা, বিনোদন ও সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ আরও সীমিত হতে পারে। উন্মুক্ত স্থানকে শুধু অব্যবহৃত জমি হিসেবে বিবেচনা না করে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশগত ভারসাম্য ও নাগরিক অধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
আগারগাঁওয়ে নতুন সচিবালয় নির্মাণের ফলে যানজট ও নগর অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরির আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। বিবৃতিতে বলা হয়, আগারগাঁও ও রোকেয়া সরণি এলাকায় সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য নগর কার্যক্রম বেড়েছে। সেখানে বৃহৎ প্রশাসনিক কমপ্লেক্স নির্মিত হলে কর্মকর্তা-কর্মচারী, সেবাগ্রহীতা ও যানবাহনের চলাচল বাড়বে। এতে সড়ক যোগাযোগ, গণপরিবহন, পথচারীদের চলাচল এবং আশপাশের নগরজীবনে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
এ কারণে নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পূর্ণাঙ্গ যানবাহন চলাচল প্রভাব সমীক্ষা এবং সমন্বিত নগর পরিবহন সমীক্ষা পরিচালনার দাবি জানিয়েছে বাপা।
সংগঠনটির মতে, সচিবালয় স্থানান্তরের ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান স্থানসংকুলান বা প্রশাসনিক সুবিধাকে প্রাধান্য দিলে চলবে না। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের পরিধি, মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম, জনবল এবং ভবিষ্যতের সেবার চাহিদাও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রায় ছয় দশক আগের পরিকল্পিত এলাকায় বর্তমান ও ভবিষ্যতের বৃহৎ প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার যৌক্তিকতা নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বিকল্প স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে মেট্রোরেল, রেলপথ, সড়ক এবং সম্ভাব্য ক্ষেত্রে নৌপথের সঙ্গে সংযোগের বিষয়টি বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে বাপা। সংগঠনটির মতে, গণপরিবহনকেন্দ্রিক নগর উন্নয়ন নীতির আলোকে এমন স্থান নির্বাচন করা প্রয়োজন, যেখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নাগরিকদের যাতায়াত সহজ হবে এবং রাজধানীর যানজটপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে না।
একইসঙ্গে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের সম্ভাবনা বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। বাপার মতে, সব মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনিক কার্যক্রম একই স্থানে কেন্দ্রীভূত না রেখে কার্যক্রমের ধরন, জনসেবার চাহিদা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের ভিত্তিতে বিকেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। এ সম্ভাবনা পর্যালোচনা না করে আরও একটি বৃহৎ প্রশাসনিক কমপ্লেক্স নির্মাণ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও জনবান্ধব সমাধান নাও হতে পারে।
বিবৃতিতে বলা হয়, জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন স্থাপত্যিক ঐতিহ্য ও জনগণের উন্মুক্ত পরিসরের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, এমন সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক বিবেচনায় নেওয়া উচিত নয়। এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, পরিবেশবিদ, পরিবহন বিশেষজ্ঞ, ঐতিহ্য সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত নেওয়া প্রয়োজন।
বাপা আগারগাঁওয়ে জাতীয় সংসদ ভবনসংলগ্ন এলাকায় প্রস্তাবিত নতুন সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সমীক্ষা ও জনপরামর্শ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ-সংক্রান্ত বাস্তবায়ন কার্যক্রম স্থগিত রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
একইসঙ্গে জাতীয় সংসদ ভবনের স্থাপত্যিক ঐতিহ্য ও পরিবেশগত অখণ্ডতা রক্ষা, উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ, সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে বিকল্প পরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
এএইচ/এএইচ




