রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারের মনসুর খান প্লাজায় লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার ১১ ঘণ্টা পরও পুরো নির্বাপন সম্ভব হয়নি। আগুন লাগার প্রায় ২৪ ঘণ্টা হতে চললেও ভবনটি থেকে এখনো ধোঁয়া বের হচ্ছে। আর তাপের কারণে ভেতরে ঢুকতে পারছেন না ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে গিয়ে দেখা যায, তখনো ব্যস্ত ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। ব্যবসায়ীরা তাদের আশপাশে ভীড় করছে। তবে বাড়তি লোকের ভীড় সামাল দিতে হিমসিম খেতে হচ্ছে পুলিশ সদস্যদের।
ফায়ার সার্ভিসের কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভেতরে তারা রাত তিনটার পর থেকে কাজ করেছেন। তবে সকাল ১১ টার পর আর ঢুকতে পারছেন না। কারণ ভেতরে প্রচণ্ড তাপ ও গরম। তাপে ভেতরে ঢোকা কষ্টকর হওয়ায় তারা অনেকে বাইরে বসে আছেন।
তাদের ভাষ্য, এখন আর আগুন নেই। শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া।
সরেজমিনে যা দেখা গেল
ফায়ারের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলার পর তাদের কথার সত্যতা মিলল কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে। দেখা গেল, ভবনটির পাঁচ, ছয় ও সাত তলা থেকে এখনো সাদা ধোঁয়া বের হচ্ছে। পোড়া মালামালের গন্ধে ভারী হয়ে আছে আশপাশের বাতাস। মাঝে মধ্যে ভবনের ওপরের তলার জানালার কাচ ভেঙে পড়ছে নিচে। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার স্বার্থে ভবনটির সামনের সড়কে চলাচল সীমিত রাখা হয়েছে। তবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ছয় তলা। কারণ হিসেবে জানা গেল, এই ছয় তলা থেকেই আগুনের উৎপত্তি।
এদিকে ভবনটির সামনে নিরাপত্তাবেষ্টনী দিয়ে রেখেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। উৎসুক মানুষের ভীড় সামলানোর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ ঠেকানো হচ্ছে। অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা গুদামের ভেতরে পানি ছিটানো ও পোড়া মালামাল সরানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। পানি সরবরাহে সহায়তা করছে ওয়াসার পানিবাহী গাড়ি। নিচতলার কয়েকটি দোকান থেকে মালামাল সরিয়ে নিতে দেখা গেছে কর্মচারীদেরও।
ফায়ার সার্ভিসের সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানিয়েছে, আগুন ছয় তলা থেকে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যবসায়ীরা নিজেরাই ঘণ্টা খানেক চেষ্টা করেছেন। পরে তারা ফায়ারকে জানালে ফায়ারের গাড়ি চকবাজারে ঢুকলেও লোকজনের ভীড় ঠেলে ঘটনাস্থলে যেতেই লেগেছে আধা ঘণ্টা। ততোক্ষণে ছয় তলা পুঁড়ে ছাঁই। এরপর সেই আগুন সাততলা ও পঞ্চমতলায় ছড়িয়ে পড়েছে। এই তিন তলায় ছিল গুদাম। ফলে মালামাল থাকায় ক্ষতির আশঙ্কা বেশি করা হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, আগুনের দৃশ্যমান শিখা না থাকলেও গুদামে স্তূপ করে রাখা পণ্যের নিচে তাপ জমে থাকতে পারে। সেখান থেকে আবার আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে প্রতিটি গুদাম পরীক্ষা করে পানি দেওয়া হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান জানান, ভবনের ষষ্ঠতলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সপ্তম তলায় ক্ষতি তুলনামূলক কম। ছয় তলায় থাকা ১২ থেকে ১৪টি বড় গুদামের মধ্যে সাত থেকে আটটিতে আগুন লাগে। এসব গুদামে ছাতা, কসমেটিকস, আতরের বোতল ও আতরসহ বিভিন্ন পণ্য মজুত ছিল।
তিনি বলেন, গুদামগুলো মালামালে পূর্ণ থাকায় সেগুলো সরিয়ে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করতে সময় লাগছে। বর্তমানে ছয়টি ইউনিট ঘটনাস্থলে কাজ করছে।
সরু রাস্তা, ধোঁয়া ও পানির সংকট
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান জানান, সরু রাস্তা ও যানজটের কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সময় লেগেছে। ভবনের ছয় ও সাত তলায় ধোঁয়া বের হওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় ভেতরে প্রচণ্ড তাপ তৈরি হয়। গুদামের শাটার ও একাধিক তালা কাটতে গিয়েও বেগ পেতে হয়েছে। পাশাপাশি আশপাশের পানির রিজার্ভ শেষ হয়ে আসায় বিকল্প উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন কাজী নজমুজ্জামান।
তিনি আরও বলেন, আগুন পাশের তিন থেকে চারটি মার্কেটে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের প্রচেষ্টায় সেগুলোকে বড় ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা করা গেছে। আগুন নির্বাপণের সময় চার সদস্য আহত হয়েছেন।
এমআইকে/এমএইচ/এসআই




