সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

নারীস্বাস্থ্য খাতে টেকসই বিনিয়োগে বৈশ্বিক অংশীদারত্ব চান জুবাইদা রহমান

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৭ পিএম

শেয়ার করুন:

নারীস্বাস্থ্য খাতে টেকসই বিনিয়োগে বৈশ্বিক অংশীদারত্ব চান জুবাইদা রহমান
বার্লিনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ডা. জুবাইদা রহমান। ছবি: সংগৃহীত

নারীস্বাস্থ্য খাতে টেকসই বিনিয়োগে বৈশ্বিক অংশীদারত্ব ও উদ্ভাবনী অর্থায়নের আহ্বান জানিয়েছেন ডা. জুবাইদা রহমান।

সোমবার (১২ অক্টোবর) জার্মানির রাজধানী বার্লিনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী এই আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘নারীর স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ কেবল স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয় নয়। আমাদের জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী। নারীর স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ মানে মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং আমাদের জাতিগুলোর ভবিষ্যতের ওপর বিনিয়োগ। একটি সুস্থ ও অধিক সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলার যে স্বপ্ন, তার কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে এই বিশ্বাস। প্রচলিত উন্নয়ন সহায়তা দিয়ে আমাদের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন উদ্ভাবনী অর্থায়ন, জাতীয় পর্যায়ে অঙ্গীকার, সহজ শর্তে বিনিয়োগ, অনুদানভিত্তিক কারিগরি সহায়তা এবং টেকসই অভ্যন্তরীণ সম্পদের সমন্বয়।’

বাংলাদেশ সরকারের নারীস্বাস্থ্যসেবার পরিকল্পনা তুলে ধরে জুবাইদা রহমান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে গঠিত বর্তমান সরকার নারীর স্বাস্থ্যে নতুন প্রজন্মের রূপান্তরমূলক বিনিয়োগ এগিয়ে নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই উদ্যোগ শুধু মাতৃস্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিটি মেয়েশিশু যেন শিক্ষিত, পুষ্টিসমৃদ্ধ ও ক্ষমতায়িত হয়ে বেড়ে উঠতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।’

গত ১১ অক্টোবর শুরু হওয়া এই সম্মেলনে ‘দ্য মোমেন্ট ইজ নাউ: আনলকিং নিউ ক্যাপিটাল ফর উইমেন্স হেলথ বিয়ন্ড এইড’ (সহায়তার গণ্ডি পেরিয়ে নারীর স্বাস্থ্যে নতুন অর্থায়নের পথ উন্মোচন—এখনই সময়) শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে বাংলাদেশের নারীস্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিতকরণ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বক্তব্য দেন জুবাইদা রহমান।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ নারীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথ সুগম করছে। কিশোরীদের রক্তস্বল্পতা, মাতৃ অপুষ্টি, প্রতিরোধযোগ্য মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু এবং নারীদের মধ্যে প্রাণঘাতী ক্যানসারের ক্রমবর্ধমান বোঝা মোকাবিলায় সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্যোগ নয়; বরং বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী লাখ লাখ নারীর জীবনচক্রজুড়ে নেওয়া পরস্পর-সম্পর্কিত বিনিয়োগ। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা বিশেষভাবে কিশোরী ও নারীবান্ধব হবে, তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা দেবে, তাদের মর্যাদার প্রতি সম্মান জানাবে এবং বাড়ির কাছাকাছি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেবে।

image

নারীর ক্ষমতায়নে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে জুবাইদা রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশে নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার অঙ্গীকারের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং পরিবারের স্বাস্থ্য ও কল্যাণের উন্নয়ন ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। গ্রামীণ উন্নয়ন, পরিবার পরিকল্পনা, জনগণের অংশগ্রহণ এবং নারীর ক্ষমতায়নের ওপর তাঁর গুরুত্বারোপ বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে।’

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নারী উন্নয়নে নেওয়া পদক্ষেপগুলোও বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে তুলে ধরেন জুবাইদা রহমান।

তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মেয়েদের শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রীদের উপবৃত্তি চালুসহ মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে তাঁর সরকারের উদ্যোগ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তরুণীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই অবদানগুলোর মধ্য দিয়ে একটি মৌলিক সত্য প্রতিফলিত হয়েছে—একজন শিক্ষিত, সুস্থ ও ক্ষমতায়িত নারীই একটি শক্তিশালী পরিবার এবং সমৃদ্ধ জাতির ভিত্তি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরিকল্পনা তুলে ধরে জুবাইদা রহমান বলেন, বর্তমান সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হলো মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবায় রূপান্তর ঘটানো। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশজুড়ে মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করতে এক লাখ কমিউনিটি ও কল্যাণকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যাঁদের প্রায় ৮০ শতাংশই নারী। পাশাপাশি আরও ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ বা ধাত্রী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসবে উৎসাহিত করা, অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা হস্তক্ষেপ কমানো এবং প্রত্যেক নারীকে দক্ষ ও সহানুভূতিশীল মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের কোনো প্রান্তের নারীকে প্রয়োজনীয় সমন্বিত মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা পেতে নিজের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা জেলা হাসপাতালের বাইরে যেতে হবে না। ইনশাআল্লাহ, রাজনৈতিক অঙ্গীকার, উদ্ভাবনী অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের সমন্বয়ে কীভাবে নারীস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটানো যায়, বাংলাদেশ তা করে দেখাবে।

নারীস্বাস্থ্যসেবা জোরদারে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে আন্তর্জাতিক অংশীদার, উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান, দাতব্য সংস্থা ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন জুবাইদা রহমান।

নারীস্বাস্থ্য উদ্যোগে ২৫ কোটি ইউরোর ঋণ পুনর্বিন্যাস

বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের ২৫ কোটি ইউরোর একটি সার্বভৌম ঋণ নারীস্বাস্থ্য উদ্যোগে ব্যবহারের জন্য পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে একটি চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের আওতায় ২০২৭ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ নারী ও কিশোরীকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উদ্যোগটি বাস্তবায়নে সরকারের সঙ্গে অংশীদার হিসেবে কাজ করবে ইউএনএফপিএ।

অধিবেশনে ইউএনএফপিএর নির্বাহী পরিচালক দিয়েন কেইতা, ঘানার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কোয়াবেনা মিনতাহ আকানদোহ, ইআইবির ভাইস প্রেসিডেন্ট মারেক মোরা, জার্মানির অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়নবিষয়ক ফেডারেল মন্ত্রণালয়ের বির্গিট পিকেল এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।

সম্মেলনের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল টেকসই স্বাস্থ্য অর্থায়ন এবং মিডওয়াইফারি খাতে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা নিয়েও আলোচনায় অংশ নেয়। এ ছাড়া নারীস্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে প্রতিনিধিদলটি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের অংশীদারদের সঙ্গে বৈঠক করে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল বায়ার, রোশে, বার্লিন ইনস্টিটিউট অব হেলথ এবং শারিতে—ইউনিভার্সিটেটসমেডিজিন বার্লিন।

বিইউ/এআর

 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর