রাজধানীর স্থায়ী ও অস্থায়ী পূজামণ্ডপগুলোতে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগর ও আয়োজকরা। দেশের কয়েকটি স্থানে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনায় কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হলেও, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আশ্বাসে নির্বিঘ্ন ও আনন্দঘন পরিবেশে উৎসব উদযাপনের আশা করছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
আগামী ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এই আয়োজন।
এ বছর সারা দেশে প্রায় ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে পূজা উদযাপিত হবে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দেড় হাজার বেশি।
শাঁখারীবাজার, শ্যামবাজার, তাঁতীবাজার, রমনা কালী মন্দির এবং ঢাকেশ্বরী মন্দিরের বিভিন্ন মণ্ডপ ঘুরে দেখা যায়, প্রতিমার কাঠামো নির্মাণ শেষে এখন চলছে রঙের কাজ। দেব-দেবীর মূর্তিতে তুলির শেষ আঁচড় দিচ্ছেন নিবেদিতপ্রাণ শিল্পীরা। পাশাপাশি সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জার কাজও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
উৎসবের প্রস্তুতির মাঝেই কুষ্টিয়া, সিলেট, রাজবাড়ী, পঞ্চগড়, মানিকগঞ্জ, রংপুর ও টাঙ্গাইলসহ কয়েকটি জেলায় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও প্রতিমা ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। এর ফলে হিন্দু সম্প্রদায়ের সংগঠনগুলো পূজামণ্ডপে জোরদার নিরাপত্তা এবং এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সর্বশেষ গত শুক্রবার রাতে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে নির্মাণাধীন প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। রাত ২টার দিকে পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ‘খয়েরচারা মাতৃমন্দিরে’ এ ঘটনা ঘটে। এতে গণেশ, লক্ষ্মী ও দুর্গার বাহন সিংহের প্রতিমার বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন জানিয়েছেন, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে এ ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যেও এমন কোনো আভাস মেলেনি।
এর আগে গত ১ অক্টোবর সকালে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের জামুর্কি পশ্চিমপাড়ার একটি মন্দিরে দুর্গাপূজার জন্য তৈরি করা সাতটি প্রতিমা ভাঙচুর অবস্থায় পাওয়া যায়। জামুর্কি আর্য সমিতি পরিচালিত ৮৫ বছরের পুরোনো এই মন্দিরে প্রতিমাগুলোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত শুরু করেছে এবং সেখানে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
‘শান্তিপূর্ণ আয়োজনের প্রস্তুতি রয়েছে’
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী বলেন, মহালয়ার আনন্দঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে পূজার সূচনা হলো। পূজা ভালোই হচ্ছে, তেমন কোনো সমস্যা দেখছি না। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যেন স্বাধীনভাবে তাদের আচার-অনুষ্ঠান করতে পারে, সে বিষয়ে সরকার সুরক্ষা দেবে।
সমাজবিরোধীদের সম্ভাব্য তৎপরতা সম্পর্কে তিনি বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষ অত্যন্ত আত্মসচেতন এবং সমাজবিরোধীদের মোকাবিলায় সতর্ক থেকে শান্তিপূর্ণভাবে পূজা করার জন্য তাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। আমি মনে করি, কেউ কোনো ধরনের প্ররোচনার সুযোগ পাবে না। সরকারও নানাভাবে সহযোগিতা করছে।
বিগত সময়ের শঙ্কা কাটিয়ে ওঠার কথা জানিয়ে ঐক্য পরিষদের এই নেতা আশা করেন, মানুষের মধ্যে যে নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছিল, এবারের পূজায় সেটার কারণে কোনো বিঘ্ন ঘটবে না।
তিনি বলেন, এবার শান্তিতে অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে পূজা অনুষ্ঠিত হবে এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষ এই আনন্দ উৎসবে অংশ নিতে পারবে। জাতীয়ভাবে আমরা সেই রকম প্রস্তুতিই দেখতে পাচ্ছি।
পুলিশের তথ্য ও সরকারের পদক্ষেপ
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের দুর্গাপূজার সময় সারা দেশে ৪৯টি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছিল। তৎকালীন আইজিপি বাহারুল আলম জানিয়েছিলেন, এসব ঘটনায় ১৫টি মামলা ও ১৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তবে বেশিরভাগ ঘটনাই ছিল ছোটখাটো এবং বড় ধরনের কোনো সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছাড়াই সেগুলো শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা হয়েছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, এবার বড় ধরনের কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকির নির্দিষ্ট সতর্কতা বা তথ্য নেই। গত ৩০ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকের পর তিনি জানান, উৎসবজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক থাকবে এবং কোনো ঝুঁকি দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন পর্যন্ত কোনো মণ্ডপকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেনি জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সরকারি সংস্থাগুলোকে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ও আলাদাভাবে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে উৎসব চলাকালীন সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার প্রতিমা বিসর্জনের সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তার আহ্বান জানান এবং জনগণকে ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার অনুরোধ করেন।
তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খবর দ্রুত যাচাই করে ভুয়া তথ্য ছড়ানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার কথাও জানান তিনি।
এদিকে, আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। গত ২৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত অপরাধ পর্যালোচনা সভায়, পুলিশ ইউনিটগুলোকে দুর্গাপূজার জন্য নিজস্ব নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি করতে বলা হয়েছে। কর্মকর্তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুল তথ্য ও অপপ্রচারের বিষয়েও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
সারা দেশের পূজামণ্ডপগুলোতে শক্তিশালী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি অর্থায়নে প্রতিটি স্থায়ী ও অস্থায়ী মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট।
উৎসবের অন্তত ১০ দিন আগে থেকে উৎসব শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তা বজায় রাখা, কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ সেল গঠন, সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন এবং একটি সংখ্যালঘু কমিশন গঠনেরও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর জানান, নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে সরকার ও প্রশাসনের সঙ্গে তাদের বৈঠক হয়েছে।
তিনি বলেন, তারা আমাদের জানিয়েছেন যে দুর্গাপূজার সময় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। যেসব জায়গায় প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে সে বিষয়ে আমরা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি এবং প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।
এ বছর সরকার দুর্গাপূজার ছুটি বাড়িয়ে তিন দিন করেছে। শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় সাধারণ মানুষ এবার পূজায় টানা পাঁচ দিন ছুটি কাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন।
আরএনবি/এআরএম




