রোববার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

সমুদ্রে প্লাস্টিকের আধিক্য, প্রাণ যাচ্ছে মাছসহ লাখ লাখ প্রাণীর 

তাহজীবুল আনাম, কক্সবাজার 
প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৭ পিএম

শেয়ার করুন:

সমুদ্রে প্লাস্টিকের আধিক্য, প্রাণ যাচ্ছে মাছসহ লাখ লাখ প্রাণীর 
সাগরে প্লাস্টিকের দূষণের বিভিন্ন চিত্র

সাগরে মাছ ধরতে গেলে জেলেদের জালে মাছের পাশাপাশি উঠে আসছে প্লাস্টিকের বর্জ্য। ধরা পড়া মাছের মুখ ও পেটেও মিলছে পলিথিন ও প্লাস্টিকের টুকরা। যা মাছসহ সমুদ্রের বহু প্রাণীর অকাল মৃত্যু ঘটাচ্ছে। 

কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে জেলেদের সঙ্গে কথা বলে এমনই তথ্য মিলেছে। সামুদ্রিক মাছের ওপর সাম্প্রতিক গবেষণাতেও উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক চিত্র। কক্সবাজার উপকূলের প্রায় ৭৭ থেকে ৮২ শতাংশ মাছের ফুলকা ও পরিপাকতন্ত্রে রয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। 

সম্প্রতি সাগরে মাছ ধরার সময় বোটে রান্নার জন্য একটি সামুদ্রিক পাঙ্গাস মাছ কাটেন জেলেরা। সেটির পেটের ভেতর পাওয়া যায় পলিথিনের টুকরা। কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে এ অভিজ্ঞতার কথা জানান জেলে আবু জাফর। 

তিনি বলেন, ‘সাগরে এখন মাছের চেয়ে প্লাস্টিক বেশি মনে হচ্ছে। জাল ফেললে উঠে আসছে প্লাস্টিক। এর পরিমাণ এতটাই বেড়েছে যে, মাছের মুখ ও পেটেও প্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে। মাছ কাটলে অনেক সময় পলিথিনের টুকরা বের হয়।’ 

শুধু একজন জেলের অভিজ্ঞতা নয়, সামুদ্রিক মাছ নিয়ে গবেষণাতেও উঠে এসেছে প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহ চিত্র। 

বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বোরি) পরিবেশ, ওশানোগ্রাফি ও জলবায়ু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু শরীফ মো. মাহবুব-ই-কিবরিয়া জানান, বঙ্গোপসাগর ও কক্সবাজার উপকূলের বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের ওপর পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রায় ৭৭ থেকে ৮২ শতাংশ মাছের ফুলকা ও পরিপাকতন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

S

তিনি বলেন, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন বাণিজ্যিক মাছের ওপর পরিচালিত গবেষণায় প্রতিটি মাছে গড়ে সাতটি বা তার বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।

বোরির গবেষণায় দেখা গেছে, এসব মাইক্রোপ্লাস্টিকের বড় একটি অংশ আসে সিন্থেটিক ফাইবার বা সুতা থেকে। পুরনো জাল ও কাপড় থেকে এসব কণা ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া পলিইথিলিন বা পলিথিন ব্যাগ এবং পলিপ্রোপিলিনও মাইক্রোপ্লাস্টিকের অন্যতম উৎস। উপকূলীয় অঞ্চলে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের মাত্রা অনেক দেশের তুলনায় বেশি বলেও জানান তিনি।

মাছের শরীরে বিষাক্ত পদার্থ 

মাছের পরিপাকতন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক ঢুকে পড়লে তা শুধু মাছের জন্যই ক্ষতিকর নয়, এর প্রভাব খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।

মাহবুব-ই-কিবরিয়া বলেন, মাছ প্লাস্টিক খেয়ে ফেললে তাদের পরিপাকতন্ত্রে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। এতে পুষ্টি গ্রহণ ব্যাহত হয়ে অপুষ্টি দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর কারণে মাছের মৃত্যুও হতে পারে। 

তিনি বলেন, শুধু প্লাস্টিক নিজেই ক্ষতিকর নয়, এসব প্লাস্টিক সমুদ্রের পানি থেকে ক্যাডমিয়াম, সিসা ও নিকেলের মতো বিষাক্ত ভারী ধাতু এবং বিভিন্ন রাসায়নিক শোষণ করতে পারে। ফলে মাছের শরীরে এসব ক্ষতিকর উপাদান জমা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। মাছের মাধ্যমে এসব দূষিত পদার্থ খাদ্যশৃঙ্খলের একপর্যায়ে মানুষের শরীরেও প্রবেশ করতে পারে। 

মাহবুব-ই-কিবরিয়া আরও বলেন, বিভিন্ন গবেষণায় মানুষের রক্ত, পরিপাকতন্ত্র ও টিস্যুতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। দীর্ঘমেয়াদে এসব কণা শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করা এবং হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাতসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। 

S

নদী-খাল হয়ে সাগরে যাচ্ছে প্লাস্টিক

কক্সবাজারের নদী-খাল ও উপকূলীয় এলাকায় যত্রতত্র ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বর্জ্যই শেষ পর্যন্ত সাগরে গিয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন পরিবেশকর্মীরা। 

ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’র (ধরা) কক্সবাজারের যুগ্ম আহ্বায়ক এইচএম ফরিদুল আলম শাহীন বলেন, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে। তা না হলে অচিরেই সমুদ্রে মাছের আধিক্য কমে আসবে।

তিনি বলেন, বাকখালী, মাতামুহুরী ও নাফ নদীর তীরে গেলে দেখা যায়, টনের পর টন প্লাস্টিক বর্জ্য জমে আছে। এসব বর্জ্য প্রতিনিয়ত নদী ও খালের মাধ্যমে সমুদ্রে গিয়ে মিশছে। এতে সামুদ্রিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।

তার মতে, নদী ও সমুদ্রের তীরে যত্রতত্র প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। 

পুরনো জালও বড় উৎস 

সাগরে মাছ ধরতে ব্যবহৃত পুরনো ও ছেঁড়া জাল এবং প্লাস্টিকের দড়িও মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের অন্যতম উৎস হয়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারের অনুপযোগী জাল ও দড়ি সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়। পরে সেগুলো ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে পানিতে মিশে যায়। 

বোরির বিজ্ঞানী মাহবুব-ই-কিবরিয়া বলেন, জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবহৃত ও পরিত্যক্ত জাল নিরাপদে অপসারণের ব্যবস্থা করতে হবে। একইসঙ্গে উপকূলীয় শহরগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। 

একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বা সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক ব্যবহারে সরকারি নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়নের প্রয়োজন বলেও মনে করেন এই পরিবেশ বিজ্ঞানী। 

প্রতিদিন ৩৪.৫ টন প্লাস্টিক বর্জ্য যাচ্ছে সমুদ্রে

ব্র্যাকের একটি বেসলাইন জরিপ অনুযায়ী, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় প্রতিদিন গড়ে ৩৪.৫ টন প্লাস্টিক বর্জ্য কক্সবাজারের সমুদ্র ও সৈকতে পতিত হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিবেশ অধিদফতর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, পরিবেশ অধিদফতরের বিভিন্ন গবেষণায় ইতোমধ্যে কক্সবাজারকে প্লাস্টিক দূষণের হটস্পট হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশে যত নদী আছে, সে সমস্ত নদীর আল্টিমেট গন্তব্য হলো কক্সবাজার সমুদ্র। প্লাস্টিকগুলো সরাসরি সমুদ্রে পতিত হচ্ছে, সমুদ্রের করসিভ ন্যাচারের কারণে প্লাস্টিকগুলো মাইক্রোপ্লাস্টিকে রূপান্তরিত হচ্ছে। 

এসব প্লাস্টিক খাওয়ার ফলে মাছের সমস্যা তো হয়ই, সেসব মাছ মানুষের শরীরে প্রবেশ করে বিভিন্ন ধরনের মরণব্যাধি রোগ সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি জানান, সরকার চেষ্টা করছে, একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার থেকে মানুষকে সরিয়ে আনতে। পলিথিন শপিং ব্যাগ বন্ধে কাজ চলছে। 

আইন আছে, প্রয়োগ নেই 

প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ২০০২ সালে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে উপকূলীয় অঞ্চলেও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশজুড়ে চলছে পলিথিন ও প্লাস্টিকবিরোধী অভিযান।

তবে এসব উদ্যোগের পরও থামছে না প্লাস্টিকের ব্যবহার। বাজার, পর্যটনকেন্দ্র, নদীর তীর, খাল এবং সমুদ্রসৈকতে এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে পলিথিন ও বিভিন্ন ধরনের একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক।

২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে বাতাসে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্য উঠে আসে। 

S

গবেষণা অনুযায়ী, বিভাগীয় শহরগুলোতে প্রতি গ্রাম ধুলায় গড়ে ৫২টি এবং ঢাকায় প্রতি গ্রাম ধুলায় ১০৬টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। গবেষণায় অনুমান করা হয়, গঙ্গা ও এর উপনদীগুলোর মাধ্যমে প্রতিদিন ১০০ কোটি থেকে ৩০০ কোটি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ছে। এসব কণার মধ্যে রেয়নের উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে বেশি। 

২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় দেশের ৭৩ শতাংশ মাছে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা থাকার তথ্য উঠে আসে। বাজারে পাওয়া দেশীয় মাছের ওপর গবেষণা চালিয়ে ১৫ প্রজাতির মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়।

এছাড়া ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বাতাসেও অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতির তথ্য উঠে আসে। 

২০৫০ সালে সাগরে মাছের চেয়ে প্লাস্টিক হবে বেশি! 

প্লাস্টিক দূষণ এখন শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক সংকট। আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের (ডব্লিউডব্লিউএফ) তথ্য অনুযায়ী, প্লাস্টিক দূষণের কারণে প্রতি বছর প্রায় এক লাখ সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যু হচ্ছে। 

সংস্থাটির বিভিন্ন পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ২০৫০ সালে সাগরে মাছের চেয়ে প্লাস্টিকের পরিমাণ বেশি হতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য নদী ও বিভিন্ন জলপথ দিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ছে। ফলে একদিকে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমে খাদ্যশৃঙ্খলও দূষিত হচ্ছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, বড় প্লাস্টিক বর্জ্য চোখে দেখা যায় বলে এর ক্ষতি সহজে বোঝা যায়। কিন্তু এসব প্লাস্টিক ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হলে তা অদৃশ্যভাবে ছড়িয়ে পড়ে পানি, মাটি, বাতাস ও খাদ্যশৃঙ্খলে। 

তাই শুধু সৈকত পরিষ্কার বা পলিথিনবিরোধী অভিযান নয়, প্লাস্টিকের উৎপাদন, ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন পরিবেশ বিশারদরা।

এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর