কূটনীতির কেন্দ্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিট (জিআইইউ) ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘এআই অ্যান্ড ইনোভেশন ডায়ালগ’ শীর্ষক সম্মেলনে নীতিনির্ধারকেরা এ কথা জানান। ২০১৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত ‘ট্রেড, গ্রোথ অ্যান্ড ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসি কনফারেন্স’-এর তৃতীয় থিমেটিক সেশন থেকে উদ্ভূত ধারাবাহিক সংলাপের এটি তৃতীয় আয়োজন।
অনুষ্ঠানে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিনির্ভর কূটনীতি ও জনসেবা নিশ্চিত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মূল কেন্দ্রে রাখার জাতীয় অগ্রাধিকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জনপ্রশাসনবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিটের প্রধান মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুফল কাজে লাগাতে পুরো সরকার ব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। তিনি দেশের প্রথম তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) নীতি প্রণয়নে সদ্যপ্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। দিনব্যাপী অধিবেশনগুলোর পর্যালোচনা করে তিনি প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারমূলক বিষয়গুলো বাস্তবায়ন, বিশেষ করে সব ধরনের জনসেবা খাতের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন আন্তঃপরিচালনযোগ্যতা চালুর বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রেহান আসিফ আসাদ জনগণের জন্য ডিজিটাল প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সর্বস্তরের মানুষের জন্য আধুনিক ডিজিটাল ডিভাইস ও কম্পিউটিং প্ল্যাটফর্মের সহজলভ্যতা বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি আরও জানান, বর্তমান সরকারের বাস্তবমুখী নীতির ফলে শিগগিরই বাংলাদেশ সাশ্রয়ী মূল্যে উন্নত ফিচার ফোন উৎপাদনে সক্ষম হবে। তিনি বলেন, আগামী ১২ মাসের মধ্যে বাংলাদেশ নিজস্ব ‘সোভারেন এআই’ বা সার্বভৌম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা চালু করবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং চিপস ও মেমোরি ব্লক ইতিমধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত তৈরি পোশাক ও রেমিট্যান্স খাত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির ডিএনএ-র ‘ডাবল হেলিক্স’ বা মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের জন্য যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন, তা অর্জনে প্রয়োজন ‘তৃতীয় একটি ভিত্তি—জ্ঞানভিত্তিক কর্মী’।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জনে দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তির প্রধান অক্ষ হিসেবে কাজ করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। প্রযুক্তিকে দেশীয় সংস্কৃতির উপযোগী ও নিজস্ব করার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর দর্শনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি জানান, প্রযুক্তিনির্ভর উদীয়মান খাত ও সৃজনশীল অর্থনীতির প্রতি নতুন করে মনোযোগ দিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে ইতিমধ্যে বেশ কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আনা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী বলেন, এই মুহূর্তে মূল প্রশ্ন হলো—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং এর সুবিধা কারা ভোগ করবে। বাংলাদেশ এআইয়ের কেবল ভোক্তা না হয়ে এর সমান অংশীদার ও সুবিধাভোগী হতে চায়। এ ক্ষেত্রে বৈশ্বিক বিভিন্ন শক্তির মধ্যে সেতুবন্ধনকারী ভূমিকা পালন করবে বাংলাদেশ।
অধিবেশনের মান নির্ধারণ ও ঢাকায় ‘এআই পলিসি ল্যাব’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইটিআইটি উইং ও ইউএনডিপি একটি টেকনিক্যাল পেপার উপস্থাপন করে। ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের চেয়ারম্যান লে. জেনারেল (অব.) মো. মাহফুজুর রহমান বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তাঝুঁকি ও সুরক্ষার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। বিশেষ বক্তব্য দেন ব্ল্যাঞ্চার্ড হাউস ইনস্টিটিউটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক জোয়ান আই। অনুষ্ঠানের সমাপনীতে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন জিআইইউয়ের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. দেলোয়ার হোসেন।
অনুষ্ঠানে ২৫টি আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের ৮৫টি কূটনৈতিক মিশন অনলাইনে যুক্ত হয়। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কূটনৈতিক কোরের সদস্য, উন্নয়ন সহযোগী এবং প্রযুক্তি শিল্প, স্টার্টআপ, বড় উদ্যোগ, চেম্বার, একাডেমিয়া ও থিঙ্কট্যাংকের প্রতিনিধিরা সংলাপে অংশ নেন।
এসএইচ/এআর




