শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

নিষেধাজ্ঞায় আটকে গেল পুলিশের আকাশযাত্রার স্বপ্ন

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৪ পিএম

শেয়ার করুন:

নিষেধাজ্ঞায় আটকে গেল পুলিশের আকাশযাত্রার স্বপ্ন
  • চুক্তির পাঁচ বছর পরও দেশে পৌঁছেনি দুই হেলিকপ্টার
  • পরিশোধ করা হয়েছে প্রায় ৪২৮ কোটি টাকা
  • প্রশিক্ষিত চার পাইলট এখন অন্য দায়িত্বে
  • মধ্যস্থতাকারী পেয়েছেন প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি টাকা

বাংলাদেশ পুলিশ স্থল ও নৌপথের পাশাপাশি আকাশপথেও সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছিল। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২১ সালে রাশিয়া থেকে দুটি হেলিকপ্টার কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর হেলিকপ্টার কিনতে রাশিয়ায় যায় পুলিশের প্রতিনিধি দল। কয়েক দফায় তিন বছরে হেলিকপ্টারের মূল্য বাবদ প্রায় ৪২৮ কোটি টাকা পরিশোধও করা হয়। তবে প্রায় পাঁচ বছরেও দেশে আসেনি হেলিকপ্টার দুটি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে হেলিকপ্টার দুটি দেশে আনার প্রক্রিয়া আটকে গেছে। শুধু হেলিকপ্টার কেনাই নয়, এগুলো পরিচালনার জন্য চার পাইলট ও একজন রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলীকে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছিল। হেলিকপ্টার না আসায় প্রশিক্ষণ নেওয়া পাইলট ও প্রকৌশলীকে অন্য দায়িত্বে পদায়ন করা হয়েছে।

হেলিকপ্টার দুটি গ্রহণ করা হবে কি না, অর্থ পরিশোধের বিষয়টি কীভাবে নিষ্পত্তি হবে এবং ভবিষ্যতে এগুলোর ব্যবস্থাপনা কী হবে—এসব নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

চুক্তির পর টাকা পরিশোধ হলেও হেলিকপ্টার আসেনি

জানা যায়, ২০২১ সালে বাংলাদেশ পুলিশকে দুটি হেলিকপ্টার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল পুলিশের নিজস্ব আকাশ সক্ষমতা গড়ে তোলা। দুর্গম এলাকায় দ্রুত পৌঁছানো, উদ্ধার ও জরুরি অভিযান এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দ্রুত মোতায়েনের মতো কাজে হেলিকপ্টার ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল।

হেলিকপ্টার পরিচালনার জন্য জনবল তৈরির কাজও শুরু করা হয়। পুরো প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৫৬ কোটি টাকা। রাশিয়ার একটি কোম্পানি থেকে এমআই-১৭১-এ২ মডেলের দুটি হেলিকপ্টার কেনার জন্য বাংলাদেশ সরকার চুক্তি করে। ২০২২ সালের অক্টোবরে ক্রয় প্রক্রিয়ার অনুমোদন এবং নভেম্বরে চুক্তি সম্পন্ন হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চুক্তির সময়ই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি সামনে আসে। এরপরও ২০২৪ সাল পর্যন্ত হেলিকপ্টার দুটির মূল্য বাবদ প্রায় ৭০ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করা হয়। এর পরিমাণ প্রায় ৪২৮ কোটি টাকা। পরে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হেলিকপ্টার দুটি গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয়।

চার পাইলট এখন অন্য বিভাগে

হেলিকপ্টার পরিচালনার জন্য ২০২২ সালে চার পুলিশ সদস্যকে পাইলট এবং একজনকে রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তবে হেলিকপ্টার না আসায় তাঁরা এখন সেগুলো পরিচালনা করছেন না।

প্রশিক্ষণ নেওয়া চার পাইলট ও একজন রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলীকে র‍্যাবের এয়ার উইংয়ে পদায়ন করা হয়েছে। সেখানে তাঁদের দক্ষতা ধরে রাখার প্রশিক্ষণও চলছে।

মধ্যস্থতাকারী পেয়েছেন প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি টাকা

রাশিয়া থেকে হেলিকপ্টার দুটি আনতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) চুক্তি করে। এ প্রক্রিয়ায় একজন মধ্যস্থতাকারীকে মোট চুক্তিমূল্যের ৪ শতাংশ দেওয়ার শর্তে নিয়োগ করা হয়। এতে প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ছিলেন সৈয়দ আহসান আহমেদ সায়মুম। তিনি তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের ক্যাশিয়ার ছিলেন বলে সূত্রের দাবি। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তিনি ১৭ কোটি ১২ লাখ টাকা পেয়েছেন। তবে বর্তমানে তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

এখন যে অবস্থা

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চুক্তি অনুযায়ী ৭০ শতাংশ অর্থ পরিশোধের পরও হেলিকপ্টার দুটি গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রাশিয়ার কাছ থেকে হেলিকপ্টার কিনলে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব রাজনীতি, অর্থনীতি, বাণিজ্য ও পররাষ্ট্রনীতিতেও পড়তে পারে।

আরেক কর্মকর্তা বলেন, চুক্তির পর যে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে, তা এখন অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে হেলিকপ্টার পাওয়া যেতে পারে। তবে তা কবে সম্ভব হবে, তা বলা কঠিন। রাশিয়ার সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত।

কী বলছে বাংলাদেশ পুলিশ

বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া বিভাগের এআইজি সাহাদাত হোসেনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, হেলিকপ্টার কেনার সব আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। কিছু অর্থও পরিশোধ করা হয়েছে। তবে হেলিকপ্টার এখনো দেশে আসেনি। কবে নাগাদ আসবে, তা তিনি জানাতে পারেননি।

তবে চার পাইলট এখন আবার পুলিশ বিভাগে ফিরে তাঁদের নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানান তিনি।

চলতি বছরের মে মাসে এক অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এই মুহূর্তে পুলিশের জন্য আলাদা এভিয়েশন উইং প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন নেই। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

এমআইকে/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর