পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাক্ষাতের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর প্রসঙ্গটি আবার সামনে এসেছে। গত মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) এই সাক্ষাৎ হয়।
আগামী নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী ভারত যাচ্ছেন কি না- এমন গুঞ্জন সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, তারা (তিনি ও ভারতীয় হাইকমিশনার) আলোচনা করেছেন এবং নিকট ভবিষ্যতে হয়তো ‘পজিটিভি আউটকাম (ইতিবাচক ফল)’ আসতে পারে।
ভারতীয় হাইকশিনারও সে সময় বলেন, সবকিছু ইতিবাচক ও যথাসময়ে এই সফর হবে। তিনি এটাও বলেন, দুই প্রধানমন্ত্রীর সুবিধাজনক সময়েই এটি অনুষ্ঠিত হবে।
তবে কূটনৈতিক পরিভাষায় বিষয়টিকে ‘সম্ভাব্য সফর’ বলা হলেও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান ইস্যুগুলো নিয়ে পররাষ্ট্র দফতর প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরুর ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলছেন, এই সফরে বাংলাদেশ কোনো ইস্যুগুলোকে গুরুত্ব দেবে সেগুলোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফরের অনেক আগে থেকেই দেশের অবস্থান ঠিক করে প্রস্তুতি চূড়ান্ত করতে হবে। তার ধারণা, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এখন সেই কাজটিই করছেন। তবে দুই দেশের সম্পর্কটাই যে সিদ্ধান্তহীনতার ভেতরে পড়ে গেছে, সেখান থেকে উত্তরণ হবে এই সফর প্রস্তুতির বড় চ্যালেঞ্জ।’
প্রতিমন্ত্রী ও ভারতীয় হাইকমিশনার যা বলেছেন
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে গত মঙ্গলবার সকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। পরে সাংবাদিকদের ত্রিবেদী জানান, হুমায়ুন কবির প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ায় তিনি সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন।
পরে হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেন, দুই দেশের পারস্পারিক সম্পর্ক অনুকূলে পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের তারিখ ও সময় নিয়ে আলোচনা হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। কিছু চ্যালেঞ্জেস আছে। সেগুলো আমরা ডায়ালগের মাধ্যমে ওভারকাম করব।’
হুমায়ুন কবির জানান, ‘ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফর নিয়েও আলোচনা হয়েছে, ভিজিট নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিছু চ্যালেঞ্জেস আছে, যেগুলো আলোচনার মাধ্যমে অ্যাড্রেস করা হচ্ছে।’
একজন সাংবাদিক ‘নভেম্বরেই’ সফরটি হতে পারে বলে গুঞ্জন চলছে- উল্লেখ করে এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘গুঞ্জন মানে তো গুঞ্জনই। গুঞ্জন নিয়ে তো আমি কথা বলি না। আমি কথা বলি রিয়েলিটি নিয়ে। রিয়েলিটি হলো, আজ আমাদের মধ্যে ভালো বৈঠক হয়েছে। আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। আন্তরিক পরিবেশে হয়েছে। যেসব চ্যালেঞ্জ আছে, সেগুলো কথাবার্তার মাধ্যমেই সমাধান হবে।’
অন্যদিকে দীনেশ ত্রিবেদী সাংবাদিকদের বলেন, ‘পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে যা আলোচনা হলো তা নিয়ে ভারতের দিক থেকে তারা খুশি। কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে কথা হয়নি। তবে খুবই ভালো আলোচনা হলো। সবসময় একটা পজিটিভিটি আছে।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ইনভাইটেশন ইজ ওপেন। এ নিয়ে তাড়াহুড়োর দরকার আছে বলে মনে হয় না। সময় হলে হবে। সবকিছু ইতিবাচক। একটা সময় সবকিছু পজিটিভ হবে। আমরা আত্মবিশ্বাসী। উভয় প্রধানমন্ত্রীর সুবিধাজনক সময়ে এটা হবে।’
পরে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় দেওয়া পোস্টে বলা হয়, হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন।
পোস্টে বলায় হয়, ‘প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করায় তাকে হাই কমিশনার অভিনন্দন জানান। আলোচনায় প্রতিবেশী এই দুই দেশের মধ্যে অব্যাহত সহযোগিতার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়, যাতে ভারত ও বাংলাদেশের জনগণের জন্য পারস্পারিক কল্যাণের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফলাফল অর্জন করা যায়।’
আর কী জানা গেল?
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে যাবেন- এমনটি নীতিগত ধরেই নিয়ে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে তিস্তার পানি, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নসহ বিদ্যমান বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশ তার অবস্থান ঠিক করতে কাজ শুরু করেছে।
এর বাইরে এই সফরকে কেন্দ্র করে বড় যেই বিষয়টি সামনে আসতে পারে তা হলো- ভারতে পলাতক বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইস্যু। কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, এ নিয়ে সরকারের অবস্থান রাজনৈতিক নেতৃত্বই ঠিক করবেন।
সরকারের দিক থেকে আগেই প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির শর্ত হিসেবে ‘শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের হস্তান্তরের’ কথা বলা হয়েছিল।
সাবেক কূটনীতিক মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বলছেন, ডোমেস্টিক অডিয়েন্সের (অভ্যন্তরীণ জনমত) কারণেই হয়তো ভারত সফর নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্বে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘এসব সিদ্ধান্ত দূর করে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করে সেটিই সফরে তুলে ধরতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। মনে রাখতে হবে, ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই দু দেশের মধ্যে সক্রিয় ও সহজ সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। টানাপড়েন থাকলে দুদেশই, বিশেষ করে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সফরটি হওয়া উচিত এবং সেখানে প্রধানমন্ত্রী দেশের অবস্থানই তুলে ধরতে পারবেন।’
তার মতে, ‘আমরা জানি যে আমরা কী চাই। কিন্তু চাইলে হয়তো সব হবে না। কিন্তু তারপরেও চাইতে হবে। সম্পর্কের ক্ষেত্রে আলোচনা এবং সম্পর্কের আদান প্রদান গুরুত্বপূর্ণ।’
এর আগে আগস্টে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা তৈরি হলেও গত ১৬ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে বলেছিল, ‘এই সফরের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।’
এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম তখন বলেছিলেন, ‘দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের দ্রুত ফেরত পাঠাতে এবং শহীদ শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ঘাতকদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি। বাংলাদেশ এই জবাবের অপেক্ষায় আছে।’
তিনি অবশ্য তখন বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে উভয় দেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে।’
এর আগে ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব এফসিসি সাউথ এশিয়া ওই সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার কথা বলার দিনেই কড়া ভাষায় একটি বিবৃতি দিয়েছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
প্রসঙ্গত, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা ভারতীয় লোকসভার স্পিকার দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
এছাড়া ভারতের দিক থেকে আরও একটি আমন্ত্রণ ছিল। সেটি হলো, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের যে সম্মেলন হয় সেখানে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তখন জানায়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে তিনি সেই আমন্ত্রণে দিল্লি যাননি। সূত্র: বিবিসি
এএইচ



