মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

লালমাটিয়ায় মদের বার ঘিরে বিশৃঙ্খলা চরমে, কোণঠাসা এলাকাবাসী 

একে সালমান
প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৩১ পিএম

শেয়ার করুন:

লালমাটিয়ায় মদের বার ঘিরে বিশৃঙ্খলা চরমে, কোণঠাসা এলাকাবাসী 
পাশাপাশি দুটি ছবিতে লালমাটিয়ায় বার থেকে বের হচ্ছে নারী মাদকসেবীরা। মাঝে ইনসেটে বারটির পরিচালক মিনহাজুল ইসলাম

# প্রকাশ্যে মাদকসেবীদের মাতলামি বেড়েছে কয়েকগুণ
# নারী মাদকসেবীরা এলাকা জুড়ে বিশৃঙ্খলা করছে প্রতিনিয়ত
# বিএনপির নাম ভাঙিয়ে অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে বার

অপরাধের ‘হটস্পট’ হিসেবে পরিচিত রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নিকটবর্তী একটি পরিচিত আবাসিক এলাকা লালমাটিয়া। এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশেই অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে মদের বার। দিন গড়িয়ে রাত নামলেই সেখানে বসে মাদকসেবীদের আড্ডা। বারটি ঘিরে ওই এলাকায় বিশৃঙ্খলা চরমে। এতে কোণঠাসা সেখানে বসবাসরত সাধারণ নাগরিক।

‎অভিযোগ রয়েছে, বারের মালিক ‘বিএনপির লোক’ পরিচয় দিয়ে সেটি অবৈধবাবে পরিচালনা করছেন। ফলে আইননুগ ব্যবস্থা নিয়ে বারটি বন্ধ করতে পারছে না সংশ্লিষ্টরা।‎

শতভাগ ‎আবাসিক এলাকা লালমাটিয়ায় গড়ে ওঠা এই অবৈধ বারটি বন্ধে কয়েক দফায় লিখিত এবং মৌখিক অভিযোগ দেওয়ার পরও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ।‎

এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাত বাড়লেই এই বারে মাদকসেবীদের আড্ডা বাড়তে থাকে। বার থেকে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে বের হয়ে অনেকেই বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বিশৃঙ্খলা করে। উচ্চস্বরে গালাগালাজ, এমনকি বাসিন্দাদের সঙ্গে মারামারিতেও জড়িয়ে পড়ে। 

শুধু পুরুষ নয়, সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে নারী মাদকসেবীরাও বারের আশপাশে এসে ভীড় করে। ফলে উঠতি বয়সি কিশোর, ছোট ছোট শিক্ষার্থী ও বাসিন্দাদের পথচলায় ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

‎লালমটিয়া এলাকার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক আফজাল বারী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘স্কুল ছুটি শেষে অনেক সময় আমরা এই পথে হেঁটে যাই। কিন্তু বার থেকে মাদক সেবন করে ছেলে-মেয়েরা প্রকাশ্যে যেভাবে অশ্লীল অঙ্গ-ভঙ্গিতে কথা বলে, তাতে আমাদের চলাফেরা দুস্কর হয়ে পড়ছে।’

F
বারের সামনে প্রকাশ্যে ধুমপান করছে নারীরা

তিনি আরও বলেন, ‘নারী মাদকসেবীরাও প্রকাশ্যে মাদক সেবনের পর রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানতে থাকে। সিগারেটের ধোঁয়া অনেক সময় আমদের মুখের সামনে ছাড়ে। এমন পরিস্থিতিতে আমরা কীভাবে চলাচল করি? আমরা চাই, মদের বারটি যেন সরকার যেকোনো উপায়ে বন্ধ করে দেয়।’‎

‎একই এলাকার বাসিন্দা জেসমিন জাহান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা আমাদের শিশুদের নিয়ে এ পথ দিয়ে হেঁটে যেতে পারি না। সন্ধ্যার পর শিশুদের নিয়ে বের হলেই লজ্জায় পড়তে হয়। পাশেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, একটি পাঠাগারও আছে। এমন এলাকায় কীভাবে মাদকসেবীদের আখড়া বসে?’ 

তিনি আরও বলেন, ‘সন্ধ্যা হলেই সিগারেট হাতে মেয়েরা প্রকাশ্য রাস্তায় নেমে পড়ে, মদ্যপান করে মাতলামি করে। হাঁটতে গেলে নারী-পুরুষ মাদকসেবীরা মাতলামি করে গায়ের উপর এসে পড়ে। এরপর তারা শুরু করে অশ্লীল ভাষায় গালাগালি। ভয়াবহ এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এলাকাজুড়ে।’‎

‎জেসমিন জাহানের অভিযোগ, ‘পুলিশ প্রশাসন কেউ মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না। হয়তো গোপনে তাদের সঙ্গে আঁতাত উপঢৌকন পাঠায়। যার কারণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর কিংবা স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন কেউ কিছু বলে না।’‎

‎এদিকে লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটির সভাপতি বেলাল আহমেদ মদের বারটি বন্ধে কয়েক দফায় বারের মালিক ও ভবন মালিককে লিখিত নোটিশ দিয়েছেন। 

তিনি ঢাকা মেইলকে জানান, মদের বারের কারণে স্থানীয় স্কুল শিক্ষক-শিক্ষিকা ও এলাকাবাসী এবং অভিভাবকরা কয়েক দফায় আমার কাছে এসেছে। আমি যেন বার বন্ধে তাদেরকে নোটিশ করি। আমি তাদেরকে কয়েক দফায় নোটিশ করার পরও তারা বার বন্ধ না করে উল্টো আরও জমজমাট ভাবে শুরু করেছে। এতে বাসিন্দাদের ভোগান্তি চরমে উঠেছে। ‎আমি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে বিষয়টা জানিয়েছি। তারা কেন বার বন্ধ করার উদ্যোগ নেয় না, তা আমার জানা নেই।’‎

G
বারের সামনে দাঁড়িয়ে এক নারী মাদকসেবী

বেলাল আহমেদ আরও বলেন, ‘আমদের এ এলাকায় মদের বারের পাশেই তিন-চারটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। পুরো এলাকায় প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মদের বারে আসা মাদকসেবীদের কারণে শিক্ষার্থীরা নানা ভোগান্তিতে রয়েছে। আমরা চাই, একটা আবাসিক এলাকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে এমন মদের বার স্থায়ীভাবে বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।’

‎অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এই বারের মালিক কাজী মিনহাজুল ইসলামের সঙ্গে কয়েক দফায় যোগাযোগ করেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।‎

‎কয়লা রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারের সিইও শামীম চৌধুরী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘লালমাটিয়ার বারটিতে আমাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নাই। আমরা বারটি সম্পর্কে কিছুই জানি না। বারটি কীভাবে গড়ে উঠেছে, কোনো অনুমোদন আছে কি না, সে বিষয়ে একমাত্র বারের পরিচালকই বলতে পারবেন।’‎

‎এ বিষয়ে তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, ‘বারটি সম্পর্কে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। বিষয়টি মূলত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর বলতে পারবে। তারা আমাদের বললে আমরা অভিযানে তাদের সহায়তা করতে পারব।’‎

‎মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদফতরের ঢাকা মেট্রো উত্তর বিভাগের উপ-পরিচালক (অপারেশন) মো. রাজিউর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বারটি পরিচালনার জন্য তারা কোনো লাইসেন্স নেয়নি। আদালত থেকে একটা অনুমোদন নিয়ে সেটি পরিচালনা করছে। তাদের এ এলাকায় কোনো অনুমোদন নেই। তেজগাঁও এলাকা ঠিকানা দিয়ে এখানে তারা বার চালায়।’‎

‎তিনি আরও বলেন, ‘আমরা খুব শিগগিরই বারটিতে অভিযান চালাব। আবাসিক এলাকা এবং সেখানে এতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সেখানে এই ধরনের বার স্থায়ীভাবে বন্ধে আমরা চিঠি দিয়ে আদালতকে বিষয়টি জানাব।’‎

‎একেএস/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর