জাতিসংঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত ফোর্থ ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম (সিভিএফ) লিডার্স মিটিং অন ডেভেলপমেন্ট রিসেট অ্যান্ড কোঅপারেশন-এ বাংলাদেশের পক্ষে অংশ নিয়ে ক্লাইমেট জাস্টিস ও ন্যায্য ক্লাইমেট ফাইন্যান্সের জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ।
ড. সাইমুম পারভেজ বর্তমানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে (ইউএনজিএ ৮১) অংশ নিতে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন।
মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ইউএনজিএ ৮১-এর সাইডলাইনে অনুষ্ঠিত এই হাই-লেভেল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের চেয়ার ও বার্বাডোসের প্রধানমন্ত্রী এইচ. ই. মিয়া আমোর মোটলি।
এতে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল, উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
বৈঠকে বক্তব্য প্রদানকালে ড. সাইমুম পারভেজ ন্যায়বিচার (জাস্টিস), উচ্চাকাঙ্ক্ষা (অ্যাম্বিশন) ও সংহতিকে (সলিডারিটি) বৈশ্বিক ক্লাইমেট অ্যাকশনের মূল কেন্দ্রে রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্লাইমেট ও ডেভেলপমেন্ট ডিসিশন-মেকিংয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব ও কণ্ঠস্বর আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বন্যা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহ প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন আগামীকালের কোনো সংবাদ শিরোনাম নয়; এটি আজ আমাদের অস্তিত্বের লড়াই।’
জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি ঢাকা ডিক্লারেশন ২০১১ থেকে ঢাকা-গ্লাসগো ডিক্লারেশন ২০২১ পর্যন্ত বিভিন্ন মাইলফলকের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
তিনি বলেন, ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ইস্যুকে বৈশ্বিক নেগোসিয়েশনের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।’
ড. সাইমুম পারভেজ সতর্ক করে বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো যখন ঐক্যবদ্ধভাবে কথা বলে, তখন বিশ্ব আর মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারে না।’
বৈঠকে ‘ভালনারেবিলিটি টু ভায়াবিলিটি’ (ভিটুভি) কমপ্যাক্ট এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানায় বাংলাদেশ। পাশাপাশি জলবায়ু অভিঘাতের কারণে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে (ব্যালান্স অব পেমেন্টস) সৃষ্ট চাপ মোকাবিলায় দ্রুত তারল্য সহায়তা দিতে প্রস্তাবিত 'লাইফলাইন ফান্ড' চালুর প্রতি জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করা হয়।
ড. পারভেজ উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর ক্ষেত্রে একটি বড় জলবায়ু দুর্যোগই বিগত কয়েক বছরের অর্জিত উন্নয়ন ভেস্তে দিতে পারে। তাই ক্লাইমেট শকের পর দ্রুত ও কার্যকর আর্থিক সহায়তা নিশ্চিতের মেকানিজম গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
আলোচনায় ক্লাইমেট ভালনারেবল দেশগুলোর জন্য সাশ্রয়ী ও দীর্ঘমেয়াদি ফাইন্যান্সের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ধরে রাখতে আরও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের ওপর জোর দেওয়া হয়।
তিনি বাংলাদেশের হালনাগাদ ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন (এনডিসি) অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ২০ শতাংশ হ্রাস এবং ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে অর্জনের লক্ষ্যমাত্রার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
জলবায়ু সংকট ও ক্রমবর্ধমান ঋণের দ্বৈত ব্যবস্থার কথা তুলে ধরে ড. সাইমুম পারভেজ বলেন, ঋণের চাপে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ দেশকে বাধ্য হয়ে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক খাত থেকে অর্থ সরিয়ে ঋণ পরিশোধে ব্যয় করতে হচ্ছে।
আসন্ন কপ৩১ সম্মেলনকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য চারটি সুনির্দিষ্ট অগ্রাধিকার প্রস্তাব করেন তিনি। তা হলো-
১. পূর্বাভাসযোগ্য (প্রেডিক্টেবল), সুবিধাজনক (কনসেশনাল) ও ন্যায্য জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করা। ২. লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড পুরোপুরি কার্যকর করে দ্রুত ও সহজে অর্থ ছাড় নিশ্চিত করা। ৩. ডেট রিলিফ ও কনসেশনাল ফাইন্যান্সিং বাড়াতে বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর (গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল আর্কিটেকচার) মৌলিক সংস্কার। ৪. জলবায়ু দায়বদ্ধতা জোরদারে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসের (আইসিজে) অ্যাডভাইজরি ওপিনিয়ন কাজে লাগানো।
ড. সাইমুম পারভেজ জোর দিয়ে বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে যেন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও মৌলিক উন্নয়নের অগ্রাধিকার এবং জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তোলার মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নিতে না হয়-সেই লক্ষ্যে বৈশ্বিক ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেমকে আরও সঙ্গতিপূর্ণ ও ন্যায্য করতে হবে।
বক্তব্যের শেষভাগে তিনি একটি টেকসই ও সমতাভিত্তিক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে বৈশ্বিক জলবায়ু পদক্ষেপগুলোকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।
বিইউ/এমআই




