মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

পুঁজিপতিদের স্বার্থরক্ষায় শ্রমিকের জীবিকা কেড়ে সরকার টিকতে পারবে না

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম

শেয়ার করুন:

পুঁজিপতিদের স্বার্থরক্ষায় শ্রমিকের জীবিকা কেড়ে সরকার টিকতে পারবে না
প্রেসক্লাবের সামনে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়ন আয়োজিত শ্রমিক সমাবেশ ও মিছিল। ছবি: ঢাকা মেইল

ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে কাঠামোর আওতায় আনার নামে সরকার প্রকৃতপক্ষে জনতুষ্টিবাদী ও বৃহৎ পুঁজির স্বার্থরক্ষার নীতিমালা প্রণয়নের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়ন।

সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, এর ফলে এই খাতের প্রকৃত সমস্যা সমাধান না হয়ে উল্টো শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার সংকট ও জনদুর্ভোগ বাড়বে। সংকট নিরসনে যৌক্তিক উদ্যোগ না নিয়ে বৃহৎ পুঁজির স্বার্থরক্ষায় শ্রমিকের জীবিকার সংকট তৈরি করে কোনো সরকারই ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়ন আয়োজিত এক শ্রমিক সমাবেশ থেকে এসব কথা বলা হয়।

সমাবেশে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সংকট নিরসনে প্রয়োজন বর্তমানে নিয়োজিত শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও তাদের বিনিয়োগকৃত ক্ষুদ্র পুঁজির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি সুশৃঙ্খল সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং সার্বিক বিবেচনায় সকল অংশীজনের অংশগ্রহণে যৌক্তিক নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল কুদ্দুসের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা জলি তালুকদার, সহ-সভাপতি সুমন মৃধা ও মো. নুরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাকিম মাইজভান্ডারি, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম নাদিম, দপ্তর সম্পাদক রিপন হোসেন, ট্রেড ইউনিয়ন বিষয়ক সম্পাদক মো. হাসান এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কামাল হোসেন।

বিগত সরকারের পথেই বর্তমান সরকার

সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, সরকারের ভুলনীতি ও দুর্নীতির কারণে দেশ আজ অন্ধকারে নিমজ্জিত। দেশে বিদ্যুৎ নিয়মিত মেলে না। অথচ এর দায় প্রকৃত দোষীদের ওপর না চাপিয়ে দেশের শ্রমজীবী, মেহনতি ও প্রান্তিক মানুষের ওপর চাপানো হচ্ছে।

বিগত সরকারের দেখানো পথেই বর্তমান সরকার হাঁটছে মন্তব্য করে শ্রমিক নেতারা বলেন, দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হয়ে উল্টো নতুন নতুন বেকারত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। কথায় কথায় সড়কে ব্যাটারিচালিত যানবাহন বৃদ্ধির কথা বলা হয়, অথচ কর্মসংস্থান ও জীবিকা নির্বাহের জন্য পর্যাপ্ত উপার্জনের সংকটই যে এর প্রধান কারণ—তা নিরসনে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই। বরং রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানা বন্ধ করে ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর করাই যেন সরকারের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।

বক্তারা কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, সকল সরকারি কল-কারখানা আধুনিকায়ন করে পুনরায় চালু এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সংকট নিরসনে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

যানজট ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের দায় কার?

অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি ও গণপরিবহনের সংকটের কারণে সৃষ্ট যানজটের দায় শুধু রিকশাচালকদের ওপর চাপিয়ে সংকট থেকে মুক্তি মিলবে না বলে মন্তব্য করেন বক্তারা। তারা সকলের জন্য বাসযোগ্য ও মানবিক নগর পরিকল্পনার দাবি জানান।

ব্যাটারিচালিত যানে বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রসঙ্গে তারা বলেন, এই খাত দেশে শুধু কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করেনি, অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই খাতে ব্যবহৃত বিদ্যুতের বিপরীতে অর্থনীতিতে যে পরিমাণ রিটার্ন আসে, তা অন্য যেকোনো খাতের চেয়ে ২০ গুণ বেশি। তাই নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের ব্যবহারের চেয়ে অর্থনীতিতে এর ভূমিকাকেই প্রধান বিবেচনায় নেওয়ার দাবি জানান তারা।

নেতৃবৃন্দ বলেন, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলে তা চিহ্নিত করে বিচ্ছিন্ন করার দায়িত্ব বিদ্যুৎ বিভাগের। এই কাজের জন্যই জনগণের করের টাকায় লাইনম্যান-মিটারম্যানসহ বিভাগের জনবলকে বেতন দেওয়া হয়। চালকরা প্রতিদিন গ্যারেজ মালিককে বিদ্যুতের অর্থ পরিশোধ করেন। সেই অর্থ সরকারের কাছে না পৌঁছানোর পেছনে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা ও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীই দায়ী।

বৃহৎ পুঁজির স্বার্থরক্ষার কৌশল

সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ সড়কের পাশাপাশি শ্রমিকের নিরাপদ জীবিকা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে দেশের সড়ক-উপযোগী নকশায় ব্যাটারিচালিত যানবাহনের আধুনিকায়ন, বিআরটিএ কর্তৃক লাইসেন্স প্রদান এবং সকল অংশীজনের অংশগ্রহণে যৌক্তিক নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানানো হয় সমাবেশ থেকে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, সরকার স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষকে লাইসেন্স প্রদানের এখতিয়ার দেওয়ার যে পাঁয়তারা করছে, তার মূল উদ্দেশ্য লুটপাট ও ধনিকশ্রেণির স্বার্থরক্ষা। একইসঙ্গে ফিটনেস সার্টিফিকেট ও সোলার প্যানেল স্থাপনের প্রস্তাব প্রকারান্তরে সবাইকে বৃহৎ পুঁজির মালিকদের কারখানায় তৈরি ব্যাটারিচালিত বাহন কিনতে বাধ্য করারই কৌশল। এতে সংকট আরও বাড়বে।

শ্রমিক ইউনিয়নের প্রস্তাবিত ১২ দফা

প্রকৃত সংকট নিরসনে বিআরটিএ কর্তৃক লাইসেন্স প্রদানসহ রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ১২ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো—দেশের সড়ক-উপযোগী নকশায় আধুনিকায়নসহ ব্যাটারিচালিত যানবাহনের বিআরটিএ কর্তৃক লাইসেন্স ও যৌক্তিক রুট পারমিট দেওয়া, চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান করা; ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলাচলে সকল অংশীজনের অংশগ্রহণে নীতিমালা প্রণয়ন করা;

শ্রমিকদের ওপর জুলুম, নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও হয়রানি এবং অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নের নামে বৈদ্যুতিক মিটারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন বন্ধ করা;

শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা কমিটি গঠন করা এবং সড়কের লেন পদ্ধতি সচল করে সার্ভিস লেন ও চার্জিং স্টেশন নির্মাণ করা।

এছাড়াও ব্যাটারিচালিত যানবাহন সংক্রান্ত সব রিট দ্রুত নিষ্পত্তি এবং শ্রমিক নেতৃবৃন্দের নামে দায়ের করা হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা, জীবিকা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা, ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে গণপরিবহন ও শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং বর্তমান গ্যারেজগুলোকে ট্রেড লাইসেন্সের আওতায় আনার দাবি জানায় রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিকদের এই সংগঠন।

সমাবেশে শ্রমিক নেতাদের দাবি, অসাধু বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে রিকশার যন্ত্রাংশসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমাতে হবে, শ্রমিকদের জন্য রেশন ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক ও মানবিক বিবেচনায় ব্যাটারিচালিত যানবাহনের পুঁজিকে নিরাপদ করে পর্যায়ক্রমে মানুষকে প্যাডেলচালিত বাহনের অমানবিক শ্রম থেকে মুক্ত করতে হবে।

সমাবেশ শেষে শ্রমিকরা একটি লাল পতাকার মিছিল বের করেন। মিছিলটি রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।

আরএনবি/এআর

 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর