আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ১৩২ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে বিভিন্ন পণ্য ও সেবা কেনার পরিকল্পনা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গাড়ি, ব্যালট বক্সের তালা, নির্বাচনী সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য কেনার পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি, নিরাপত্তা, জনসচেতনতা ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)–সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবায়ও অর্থ ব্যয় করবে ইসি।
ইসির বাজেট শাখার কর্মকর্তারা জানান, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনায় বিভিন্ন পণ্য ও সেবা কেনার জন্য মোট প্রায় ১৩২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এরই মধ্যে এ পরিকল্পনা অনুমোদন হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় কেনাকাটাকে এতে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
ইসির সচিব আখতার আহমেদের স্বাক্ষরিত বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা অনুযায়ী, টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম কেনা ও মেরামতে ১৭ লাখ টাকা, পোশাক খাতে ৮ লাখ, আপ্যায়নে ৪৫ লাখ, ডাক বিল বাবদ ১ লাখ ৫০ হাজার, টেলিফোন বিল বাবদ ২০ লাখ, মনিহারি পণ্য কেনায় ৩৫ লাখ, অন্যান্য পণ্যে ৪৫ লাখ এবং প্রিন্টারের কালি বা টোনারে ৬৭ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া কম্পিউটার সরঞ্জামাদিতে ৮ লাখ, ইলেকট্রনিক পণ্যে ৪০ লাখ, কম্পিউটার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতিতে ১ কোটি, অফিস সরঞ্জামাদিতে ৫১ লাখ ৭১ হাজার, আসবাবপত্রে ৭০ লাখ, উপহারসামগ্রীতে ৫ লাখ ২৫ হাজার, বাগান পরিচর্যায় ৭ লাখ ৯০ হাজার এবং স্ট্যাম্প ও সিলে ১ লাখ ৫ হাজার টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: জানুয়ারিতে ইউপি নির্বাচন, তফসিল নভেম্বরে
অনাবাসিক ভবন মেরামতে ১ কোটি ৭৫ লাখ, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাপনায় ১ কোটি ৬০ লাখ, আসবাবপত্র মেরামতে ৩ লাখ ২০ হাজার, অফিস সরঞ্জামাদি মেরামতে ৫ লাখ ২৫ হাজার, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ৫২ লাখ ৫০ হাজার, আউটসোর্সিং জনবলে ২ কোটি এবং নিরাপত্তাসেবা কিনতে ১১ কোটি ৪৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা ধরা হয়েছে।
গাড়ি কিনবে ১০ কোটি টাকায়
১০টি জিপ, ২টি প্রাইভেট কার, ৪টি মাইক্রোবাস ও ৫০টি মোটরসাইকেলসহ মোট ৬৬টি গাড়ি কিনতে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যমান বিভিন্ন গাড়ির চাকা, ব্যাটারি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি কিনতে ৪০ লাখ টাকা রাখা হয়েছে। বিভিন্ন ইভেন্ট, সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
নির্বাচনী সামগ্রীতে বড় ব্যয়
নির্বাচনী সামগ্রী কেনার ক্ষেত্রে ১০ হাজার ১০০টি সিল করার মোম কিনতে ২০ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং ব্যালট বক্সের ২১ লাখ ৫০ হাজার তালা কিনতে ৮৬ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া ৪ লাখ ১০ হাজার কালির প্যাড কিনতে ২ কোটি ৬৬ লাখ ৭০ হাজার, ৪ লাখ ১০ হাজার অমোচনীয় কালির কলম কিনতে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৫৭ হাজার, ৩ লাখ ৬০ হাজার অফিসিয়াল সিল কিনতে ৬০ লাখ ৮৪ হাজার এবং ৭ লাখ ২০ হাজার মার্কিং সিল কিনতে ৫০ লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
৫১ হাজার ব্রাস সিলে ১৫ লাখ ৮০ হাজার, চটের ৭৩ হাজার ব্যাগ কিনতে ৯৫ লাখ ৬০ হাজার, ছোট-বড় ৬৮ হাজার হেসিয়ান ব্যাগ কিনতে ২৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা রাখা হয়েছে।
প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের জন্য ৯ লাখ ২৯ হাজার ৫০০টি ম্যানুয়াল ছাপাতে ৮ কোটি ১৮ লাখ ৪০ হাজার এবং ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের জন্য ৭ লাখ ১৫ হাজার গাইডলাইন বই তৈরিতে ৩ কোটি ৯৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। বিজি প্রেসে বিভিন্ন ধরনের ১ লাখ ৭০ হাজার মুদ্রণকাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ কোটি ৭৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
তথ্যপ্রযুক্তিতে ২৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা
ইসির তথ্যপ্রযুক্তি–সংশ্লিষ্ট কয়েকটি শাখার ক্রয় পরিকল্পনায় মোট প্রায় ২৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাব রয়েছে।
এর মধ্যে আইসিটি উইংয়ে ইসির ওয়েবসাইট ও ওয়েবসাইটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে ৭২ লাখ, বিদ্যমান ইসিএস সিস্টেমের সার্ভার ও স্টোরেজ উন্নয়নে ১ কোটি এবং সিসিটিভি সংগ্রহে ৪০ লাখ টাকা রাখা হয়েছে।
অ্যাপ্লিকেশন সার্ভার, ব্যাকআপ স্টোরেজ ও ভিএম ইসিএস সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণে ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং অনলাইন মনোনয়ন ব্যবস্থাপনা ও নির্বাচন ব্যবস্থাপনা সিস্টেমের উন্নয়নে ২ কোটি ৭২ লাখ টাকা রাখা হয়েছে।
জিআইএস সফটওয়্যারের লাইসেন্সে ৩ কোটি, জিআইএসের জন্য সার্ভার, জিপিইউ ও ডেস্কটপ কম্পিউটারসহ হার্ডওয়্যারে ২ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার এবং আইসিটি নিরাপত্তা নিরীক্ষা ও ভিএপিটি সেবায় ২ কোটি ১১ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
আইসিটি সিস্টেম সাপোর্ট শাখায় ডেটা সেন্টারের রক্ষণাবেক্ষণে ২ কোটি ৩০ লাখ, আইসিটি সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণে ২০ লাখ, অ্যান্টিভাইরাস, নেটওয়ার্ক ডিভাইস লাইসেন্সিং ও সহায়তায় ২ কোটি ৮০ লাখ, ভিপিএন স্থাপন ও টিবিএল ব্যবহারে ২০ লাখ এবং নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম সরবরাহ ও স্থাপনে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এ খাতে মোট ব্যয় প্রায় ৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
প্রচার ও জনসচেতনতায় ১০ কোটি টাকা
ইসির জনসংযোগ শাখায় বিভিন্ন প্রচার ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে প্রায় ১০ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনটি বড় প্যাকেজে যথাক্রমে ৪ কোটি ১৫ লাখ, ৬০ লাখ এবং ৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও দুটি প্যাকেজে ৯৮ লাখ ও ২০ লাখ টাকা রাখা হয়েছে।
এনআইডি–সংশ্লিষ্ট খরচ ৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা
জাতীয় পরিচয়পত্র–সংশ্লিষ্ট কাজে কম্পিউটার সফটওয়্যার ও অন্যান্য সামগ্রী কিনতে ২০ লাখ এবং ডার্ক ওয়েব মনিটরিং টুলস ও সফটওয়্যারে ২ কোটি টাকা রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া এনআইডি মোবাইল অ্যাপ তৈরিতে ৫ লাখ, ক্লাউড এআইয়ে ৩ লাখ, ইকেওয়াইসি সফটওয়্যারে ৫ লাখ, অফিস স্টেশনারিতে ১০ লাখ, নিরাপত্তা পরীক্ষা বা ভিএপিটিতে ৩০ লাখ, এনআইডি নিবন্ধনের ল্যাপটপে ৩ লাখ, কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জামে ৪০ লাখ এবং অফিস সরঞ্জাম ও আসবাবপত্রে ১৬ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। সব মিলিয়ে এনআইডি উইংয়ের ক্রয় পরিকল্পনায় প্রায় ৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা রাখা হয়েছে।
গ্রন্থাগার ও ডকুমেন্টেশন শাখায় বিভিন্ন সরকারি প্রকাশনা ও বই কিনতে ৬৮ লাখ এবং প্রকাশনা ও ডকুমেন্টেশন শাখায় বিভিন্ন প্রকাশনা সামগ্রীতে ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্বাচন সহায়তা খাতে গেট ব্যানার ও সংশ্লিষ্ট প্রচারসামগ্রীতে ১০ লাখ, র্যালিতে ১০ লাখ, আলোচনা ও সভায় ৬ লাখ, রোড ব্র্যান্ডিংয়ে ৮ লাখ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ৬ লাখ এবং আতিথেয়তায় ১৬ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এ খাতে মোট ব্যয় প্রায় ৫৬ লাখ টাকা।
নির্বাচনের জন্য আলাদা ব্যয় হবে
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন এই বরাদ্দ দিয়ে করা সম্ভব হবে না। কারণ, এটি মূলত ইসির কেনাকাটা ও নিজস্ব খরচের জন্য বরাদ্দ। নির্বাচনের সময় এর বাইরে আরও বিভিন্ন খরচ যুক্ত হবে।
কর্মকর্তারা আরও জানান, চলতি বছর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন পরীক্ষার কারণে তা আগামী বছর অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, নির্বাচন হবে, এটা নিশ্চিত। সেটা যেকোনো সময়ই হতে পারে। এ জন্য প্রস্তুতি রাখতে হবে। ইতিমধ্যে প্রায় সব প্রস্তুতি শেষ করা হয়েছে।
এর আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় নির্ধারণের আগে আরও কিছু সমন্বয়ের কাজ করার কথা জানিয়েছিলেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি বলেছিলেন, বাজেট পরিকল্পনাসহ এসব কাজ দ্রুত শেষ করা হবে।
তিনি বলেন, আরও দুই-একটি সাইডলাইন কাজ করতে হবে। সাইডলাইন সমন্বয়ের কাজ আছে, এর মধ্যে বাজেট পরিকল্পনাও রয়েছে। এগুলো অতি শিগগির শেষ করে যত দ্রুত সম্ভব নির্দিষ্ট তারিখ জানানো হবে।
স্থানীয় নির্বাচনে ৯৮ হাজার ১৯৬ কেন্দ্রে ভোট
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ইতিমধ্যে ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য আলাদা ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে। মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৯৮ হাজার ১৯৬টি। এসব কেন্দ্রে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোট গ্রহণ করবে ইসি।
স্থানীয় নির্বাচনে ভোটার প্রায় ১২ কোটি ৮৮ লাখ
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে গত ৩১ আগস্ট চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করে ইসি। তালিকা অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দেশে মোট ভোটার ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৫৫ লাখ ১০ হাজার ৬৬৫, নারী ৬ কোটি ৩২ লাখ ৬৫ হাজার ৭১১ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৬৭ জন।
ইউনিয়ন পরিষদের রোডম্যাপে বলা হয়েছে, ২০২১–২২ অর্থবছরের আগে ২৮৯টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২১–২২ অর্থবছরে ৩ হাজার ৯৮১টি, ২০২২–২৩ অর্থবছরে ১১০টি এবং ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ৯২টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
মামলা, সীমানা জটিলতাসহ নানা কারণে দীর্ঘদিন ধরে ১০৮টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হয়নি। দেশে মোট ইউনিয়ন পরিষদ ৪ হাজার ৫৮০টি। এর মধ্যে চলতি বছর ৩ হাজার ৯৮১টি নির্বাচন উপযোগী হবে। বাকিগুলো ২০২৭ ও ২০২৮ সালের দিকে নির্বাচন উপযোগী হবে।
পৌরসভার রোডম্যাপ অনুযায়ী, দেশের মোট ৩৩০টি পৌরসভার মধ্যে ৩২০টি নির্বাচন উপযোগী। আইনি জটিলতার কারণে ১০টি পৌরসভা এখনো নির্বাচন উপযোগী নয়।
উপজেলা পরিষদের রোডম্যাপ থেকে জানা যায়, নতুন ৫টি উপজেলাসহ দেশে মোট উপজেলা ৫০০টি। কোনো উপজেলাতেই নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় সব উপজেলাই নির্বাচন উপযোগী।
রোডম্যাপ অনুযায়ী, নতুন সিটি করপোরেশন বগুড়াসহ ১৩টি সিটি করপোরেশনের কোনোটিতেই নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই। ফলে সব কটি সিটি করপোরেশনই নির্বাচন উপযোগী।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলে ৬১টি জেলা পরিষদ ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে বিএনপি সরকার গঠনের পর ধাপে ধাপে ৫৬টি জেলা পরিষদে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে পৌরসভাগুলোও প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। শুধু ইউনিয়ন পরিষদগুলোতেই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালন করছেন।
এমএইচএইচ/এআর




