একটি অনলাইন পোর্টালের প্রকাশিত যাচাইহীন সংবাদের ভিত্তিতে দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শতাধিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং’ বা তদন্ত কমিটি গঠনের বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্ত্তী ও বিচারপতি এস কে তাহসীন আলীর হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেন।
আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান এবং ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) ও রেজিস্ট্রারসহ মোট ৪৭ জন বিবাদীকে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
গত ৩১ আগস্ট জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে আদালত এ আদেশ দেয়।
সুপ্রিম কোর্টের চার আইনজীবী— চঞ্চল কুমার বিশ্বাস, এ লিটন আহমেদ, রাশেদুল হক খোকন ও বিপ্লব কুমার দাস রিটটি দায়ের করেন।
আদালতে রিটের পক্ষে আইনজীবীরা ইন-পার্সন (নিজেদের শুনানি নিজেরা) শুনানি করেন।
রিট আবেদনে বলা হয়, গত ৪ আগস্ট ‘এশিয়া পোস্ট’ নামের একটি অনলাইন পোর্টালে যাচাইহীন একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই সংবাদের ভিত্তিতে ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০০ জনের বেশি শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো আইনি কর্তৃত্ব ছাড়াই ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং বা অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়।
রিটকারী আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ্বাস জানান, আদালত মূলত তিনটি বিষয়ে রুল জারি করেছে—
প্রথমত, গত ৩১ আগস্ট লিগ্যাল রিপ্রেজেন্টেশন বা নোটিশ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় আইনের দ্বারা অস্বীকৃত এসব ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটির কার্যক্রম বন্ধ করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু সেই আবেদনের নিষ্পত্তি না করা তথা সরকারের ‘ইনঅ্যাকশন’ (নিষ্ক্রিয়তা) কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না।
দ্বিতীয়ত, ‘এশিয়া পোস্ট’-এর সংবাদের ভিত্তিতে যে তদন্ত কমিটিগুলো করা হয়েছে, সেগুলোর গঠন কেন আইনি কর্তৃত্ববহির্ভূত, কার্যকরতাহীন ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না।
তৃতীয়ত, এসব তদন্ত কমিটির নামে শিক্ষকদের একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা, চিকিৎসার জন্য অনাপত্তিপত্র (এনওসি) না দেওয়া বা অনেককে বরখাস্ত করার মতো যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছে, সেগুলো প্রত্যাহার বা বাতিল করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং এই কমিটিগুলো কেন বিলুপ্ত করা হবে না।
আদালতের রুল জারির পর আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ্বাস বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান কোনো আইনেই কাভার করে না যে— কোনো শিক্ষক যদি স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ করেন, তবে তার কারণে তাকে কোনো ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির আওতায় আনা যাবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে এমন কোনো বিধান নেই।
শিক্ষকদের হয়রানির বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, যাদেরকে বিভিন্নভাবে ডাকা হচ্ছে, হয়রানি করা হচ্ছে, চিকিৎসায় ‘নো অবজেকশন’ দিচ্ছে না এবং একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হচ্ছে— আমরা চেয়েছি অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যাতে এসব বন্ধ থাকে। হাইকোর্ট আমাদের শুনানিতে সন্তুষ্ট হয়ে রুল জারি করেছেন।
যেহেতু বিষয়টি এখন হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন, তাই শিক্ষার মান বজায় রাখা ও শিক্ষকদের অযথা হয়রানি বন্ধের স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানান এই আইনজীবী।
তিনি বলেন, আমরা আশা করব রুলের জবাব সরকার দেবে। আর এই রুলের কারণে আমরা মনে করি, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, রেজিস্ট্রার মহোদয় এবং সিন্ডিকেট সদস্যরা এই অবৈধ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কার্যক্রম পরিচালনা থেকে বিরত থাকবেন। শিক্ষকদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করার স্বার্থে এবং একাডেমিক কার্যক্রম স্মুথলি ফাংশন করার ক্ষেত্রে তারা শিক্ষকদের অযথা হয়রানি থেকে দূরে থাকবেন।
শাবিপ্রবি’র বিজ্ঞপ্তি যুক্ত করা হয় রিটে
রিট আবেদনে উদাহরণ হিসেবে গত ৬ আগস্ট সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) রেজিস্ট্রার সৈয়দ ছলিম মোহাম্মদ আব্দুল কাদিরের সই করা একটি বিজ্ঞপ্তি যুক্ত করা হয়েছে।
ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, সম্প্রতি ‘এশিয়া পোস্ট’ পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো শিক্ষক রাষ্ট্রবিরোধী গোপন কার্যকলাপে জড়িত থাকার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে উক্ত প্রতিবেদনের আলোকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্বদ্যিালয়ের শিক্ষকদের এ সংক্রান্ত কাজে জড়িত থাকার বিষয়ে তদন্তপূর্বক যথাশীঘ্র রিপোর্ট প্রদানের জন্য কর্তৃপক্ষ নিম্নরূপ তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন।
শাবিপ্রবির প্রো ভাইস চ্যান্সেলরের নেতৃত্বে গঠিত ওই ৬ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির কার্যপরিধিতে দুটি বিষয়ের কথা বলা হয়। তার মধ্যে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত শিক্ষকদেরকে চিহ্নিতকরণ এবং করণীয় নির্ধারণে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান এবং ‘এশিয়া পোস্ট’ এ প্রকাশিত শাবিপ্রবি’র শিক্ষকগণ বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমন ও হুমকি প্রদানে লিপ্ত ছিলেন কিনা, তা অনুসন্ধান করা।
আরএনবি/এফএ




