অপতথ্য নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও এর নামে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা উচিত নয় মন্তব্য করে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান রফিকুজ্জামান রুমান বলেছেন, তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপতথ্য নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োজন। তবে সেই নিয়ন্ত্রণের একটি সুস্পষ্ট সীমা থাকতে হবে। সীমাহীন নিয়ন্ত্রণ গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের দ্বিতীয় তলায় জহুর হোসেন চৌধুরী হলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তথ্য ও সম্প্রচার বিভাগীয় কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬: নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ নাকি বাকস্বাধীনতা দমন’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন।
রফিকুজ্জামান রুমান বলেন, তথ্য মানুষের মৌলিক অধিকারের অংশ। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে মানুষের হাতের মুঠোয় পুরো বিশ্ব। তথ্যের অবাধ প্রবাহের মধ্যে অপতথ্যও ছড়িয়ে পড়ছে। তাই অপতথ্য নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে সেই নিয়ন্ত্রণের সীমা ও ধরন কী হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যের অবাধ প্রবাহ বজায় রেখেই অপতথ্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আইনের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও প্রতিটি আইনের একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কারণ, আইন কোনো না কোনোভাবে মানুষের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করে। একটি সভ্য সমাজে এই নিয়ন্ত্রণ কখনোই সীমাহীন হওয়া উচিত নয়।
সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০০৬ সালে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের মাধ্যমে এ ধরনের আইন প্রণয়নের যাত্রা শুরু হয়। পরে ২০০৯ ও ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধান ছিল। পরে ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করা হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ধারার কারণে সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে আইনের বিধান সাংবাদিকতার জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল।
তিনি আরও বলেন, ২০২৩ সালে সাইবার নিরাপত্তা আইন করা হয়। ওই আইনে সাইবার পরিসরে মানহানিকর বক্তব্যের জন্য কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছিল। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সাইবার নিরাপত্তা আইনের দমন-পীড়নমূলক ধারাগুলো বাদ দিয়ে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তী সময়ে অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করা হলেও পাঁচ মাসের মধ্যে দুইবার সংশোধন করতে হয়েছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগের পরিসংখ্যান তুলে ধরে রফিকুজ্জামান রুমান বলেন, ওই আইনের অধীনে পাঁচ বছরে অন্তত ২৩৭টি মামলা হয়েছিল এবং চার হাজার ৫২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলেন। সাংবাদিকরাও ওই আইনের প্রয়োগের শিকার হয়েছিলেন। ৫৭ জন সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানহানির অভিযোগে অন্তত ১৯০টি মামলা হয়েছিল। ফেসবুকে পোস্ট বা মন্তব্য করার কারণে ৯৮৬টি মামলা হয়েছিল। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সাইবার সুরক্ষা আইনে নাগরিকের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। অপতথ্য নিয়ন্ত্রণের নামে যেন স্বাধীনতার ওপর সীমাহীন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা না হয়, সেই বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার। এতে সভাপতিত্ব করেন লেখক ও প্রবীণ সাংবাদিক আবুল আসাদ।
এএইচ/এফএ




