সাগরের বুক চিরে গড়ে তোলা কাতারের দোহা হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। চারিদিকে জলরাশি আর বালুর রাজ্যের মধ্যে নির্মিত এই ট্রানজিট জংশন বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে ঝকঝকে আধুনিক কোনো নগরী। এই চাকচিক্যের পাশাপাশি এখানে রয়েছে নিরাপদ যাত্রার জন্য কঠোর ও আপসহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ও সেরা এই এভিয়েশন হাবে নিরাপত্তা তল্লাশির ক্ষেত্রে ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, একদিকে ব্যবহার করা হচ্ছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি, অন্যদিকে দক্ষ কর্মীদের দিয়ে করানো হচ্ছে দফায় দফায় নিরাপত্তা তল্লাশি।
আন্তর্জাতিক এভিয়েশন স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী পরিচালিত এখানকার সিকিউরিটি সিস্টেম এতটাই নিখুঁত যে, যেকোনো ধরনের অনিয়ম বা নিষিদ্ধ বস্তু চোখের পলকে ধরা পড়ে যায়। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিমানবন্দরটিতে নামার পর ট্রানজিট বিরতি শেষে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে অন্য বিমানে ওঠার আগপর্যন্ত দুই দফায় কড়া তল্লাশির মুখে পড়েছেন যাত্রীরা।
প্রথম দফার তল্লাশিতে হাতঘড়ি থেকে শুরু করে সব ধরনের ইলেকট্রনিক্স দ্রব্য ও বেল্ট আলাদা করে বক্সে করে স্ক্যানারে দিতে হয়েছে। অন্যান্য বিমানবন্দরের মতো জুস, পানি কিংবা কোমল পানীয়ের বোতলও রেখে দিয়েছেন কর্মীরা। একদিকে স্ক্যানারে মালামাল আসার সময় একাধিক স্ক্রিনে চোখ রাখছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, অন্যদিকে সামনে দাঁড়ানো অন্যরা হাতে গ্লাভস পরে পুরো শরীর তল্লাশি করে একেকজনকে সামনে যেতে দেন। বিশেষ করে যাদের কাছে সন্দেহজনক কিছু পাওয়া গেছে, তাদের আলাদা করে তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
অবশ্য অনেকযাত্রী তল্লাশি শেষ মনে করে ঘড়ি ও বেল্ট আবার পরে ফেলেন। এরপর নির্বিঘ্নে বিমানের দিকে এগিয়ে যেতে গিয়ে আবারও তাদের পড়তে হয় তল্লাশির মুখে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, এটাই ফাইনাল চেক!
তবে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়েছে তাদের, যারা পারফিউম, লোশন বা এই জাতীয় জিনিস হ্যান্ডব্যাগে করে এনেছেন। বিশেষ করে পারফিউম বা এই জাতীয় কিছু পেলে সঙ্গে সঙ্গে মেশিনে চেক করে সমস্যা না থাকলে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। আর সন্দেহজনক মনে হলে পণ্যটি রেখে দিয়েই যাত্রীকে যেতে দেওয়া হয়। অনেককেই ঝামেলা এড়াতে শখের জিনিসটি ফেলে বিমানে উঠতে দেখা গেছে।

প্রযুক্তির কড়া নজরদারি ও সি-টু টেকনোলজি
হামাদ বিমানবন্দরের সিকিউরিটি চেকের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর অত্যাধুনিক সি-টু (C2) প্রযুক্তি এবং উন্নত এক্স-রে স্ক্যানার। এর ফলে যাত্রীদের হ্যান্ডব্যাগেজে থাকা ল্যাপটপ, ট্যাবলেট বা ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলো আলাদা করে বাইরে বের করার প্রয়োজন হয় না। তবে ব্যাগ বাইরে না বের করতে হলেও উন্নত অ্যালগরিদমের কারণে এর ভেতরে থাকা যেকোনো লুকানো বস্তু বা সম্ভাব্য ঝুঁকি নিখুঁতভাবে স্ক্যান করে নেয় এই সিস্টেম। অর্থাৎ, তল্লাশি এড়ানোর কোনো সুযোগই এখানে থাকে না।
তরল পদার্থ ও নিষিদ্ধ বস্তুতে ‘জিরো টলারেন্স’
বিমানবন্দরটির সিকিউরিটি ও কাস্টমস বিভাগ তরল পদার্থ বা লিকুইড বহনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর নিয়ম মেনে চলে। হ্যান্ডব্যাগেজে ১০০ মিলিলিটারের বেশি কোনো তরল বা জেল জাতীয় বস্তু বহনের জো নেই। নিয়ম না মেনে বড় বোতলে লিকুইড বহন করলে তা সঙ্গে সঙ্গেই বাজেয়াপ্ত করা হয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ দীর্ঘপাল্লার ফ্লাইটের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর গাইডলাইন নিখুঁতভাবে মানা হয়।

তরল পদার্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখানে ব্যবহার করা হয় বিশেষ লিকুইড স্ক্যানার বা এলএডিএস (LEDS)। এই অত্যাধুনিক স্ক্যানারগুলোর মাধ্যমে বোতলের ক্যাপ খোলা ছাড়াই ভেতরের তরলের রাসায়নিক প্রকৃতি মুহূর্তেই বিশ্লেষণ করা হয়। অ্যালকোহল বা অন্য কোনো পানীয়র মান যাচাই করা এর উদ্দেশ্য নয়; বরং এর মূল লক্ষ্য হলো তরলের আড়ালে কোনো ধরনের বিস্ফোরক বা বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ লুকিয়ে রাখা হয়েছে কি না, তা নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা।
এছাড়া অস্ত্র, ধারালো বস্তু, বিস্ফোরক কিংবা যেকোনো সংবেদনশীল বা নিষিদ্ধ সামগ্রীর ক্ষেত্রে রয়েছে কঠোর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি। ব্লেড বা ধারালো অস্ত্রের মাপ সামান্য বেশি হলেও তা সঙ্গে নেওয়ার কোনো উপায় থাকে না।
ব্যক্তিগত তল্লাশি ও কাস্টমসের কড়াকড়ি
যাত্রীদের ওয়াক-থ্রু মেটাল ডিটেক্টরের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় বেল্ট, ঘড়ি, মেটাল বা পকেটের খুচরা পয়সা পর্যন্ত ট্রেতে জমা দিতে হয়। সামান্য সংকেত বাজলেই মুখোমুখি হতে হয় শারীরিক তল্লাশির। নারী যাত্রীদের জন্য রয়েছে আলাদা নারী সিকিউরিটি অফিসারদের মাধ্যমে তল্লাশির ব্যবস্থা। অন্যদিকে, কাস্টমস বিভাগও সমানভাবে সক্রিয়; যাত্রীদের কাছে থাকা নগদ অর্থ বা মূল্যবান জিনিসপত্রের সঠিক ঘোষণা না দিলে সেখানেও আইনি জটিলতায় পড়ার ঝুঁকি থাকে।
আধুনিক এভিয়েশন জগতে হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কেবল জাঁকজমক বা স্থাপত্যশৈলীর জন্য সুপরিচিত নয়। যাত্রীদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রশ্নে কাতার কর্তৃপক্ষ যে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে নারাজ।
বিইউ/এএস




