ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় মেট্রোরেলের উপযোগিতা থাকলেও এটিকে একমাত্র পরিবহন সেবা হিসেবে বিবেচনা না করে বাস, রেল, বিআরটি ও পথচারীবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থায় সমন্বিত বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)।
একই সঙ্গে মেট্রোরেল প্রকল্পে অতিরিক্ত নির্মাণ ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণের চাপ কমাতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) আইপিডি আয়োজিত অনলাইন অনুষ্ঠানে মেট্রোরেলের ব্যয় বৃদ্ধি ও পরিকল্পনায় ন্যায্যতা শীর্ষক আলোচনায় এসব দাবি উঠে আসে।
বক্তারা বলেন, ঢাকার বাসব্যবস্থার উন্নয়ন, বাস রুট রেশনালাইজেশন ও বিআরটি কার্যকর করার মতো তুলনামূলক কম ব্যয়ের উদ্যোগগুলো দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে রয়েছে। এর বিপরীতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে একের পর এক মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন করা হচ্ছে। এতে পরিবহন পরিকল্পনায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধ ও ভর্তুকির চাপ জনগণের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মূল প্রবন্ধে আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, মেট্রোরেলের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ এবং মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় ঢাকাকে মেট্রোরেলনির্ভর পরিকল্পনার মধ্যে আটকে ফেলছে। ২০০৫ সালের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় বাস যোগাযোগ, বিআরটি ও পথচারীবান্ধব সুবিধাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হয়নি। একই সময়ে প্রাথমিক পরিকল্পনায় তিনটি মেট্রোরেলের প্রায় ৬০ কিলোমিটার প্রস্তাব থাকলেও পরবর্তী সংশোধিত পরিকল্পনায় ছয়টি মেট্রোরেলের ১৪০ কিলোমিটারের বেশি প্রস্তাব করা হয়েছে।
আইপিডি জানায়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে এমআরটি-৫ দক্ষিণ প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় প্রায় ২ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে জাইকার অর্থায়নে এমআরটি-১-এ প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ৩ হাজার ৬৬১ কোটি এবং এমআরটি-৫ উত্তর প্রকল্পে প্রায় ৪ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব রয়েছে। সংগঠনটির মতে, প্রকল্পগুলোর ব্যয়ের এই পার্থক্য উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ও ব্যয় যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে।
পরিবহন পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ মুনতাসীর মামুন বলেন, মেট্রোর পাশাপাশি কার্যকর বাস নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন জরুরি। বর্তমানে মোট যাতায়াতের তুলনায় মেট্রোরেলের অংশ খুবই সীমিত। ভবিষ্যতে সব মেট্রো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলেও মোট যাতায়াতের একটি অংশই মেট্রোর মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। তাই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ যাত্রীর জন্য বাস, রেল ও অন্যান্য পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি ড. মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বড় প্রকল্পে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, কোনো প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় প্রকৃতপক্ষে যৌক্তিক ও ন্যায্য কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অন্যদিকে আইপিডির রিসার্চ ফেলো কে এম আসিফ ইকবাল আকাশ বলেন, বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে বারবার ব্যয় বৃদ্ধি প্রকল্প পরিকল্পনা, ব্যয় প্রাক্কলন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
আলোচনায় বক্তারা কমলাপুর-এয়ারপোর্ট-জয়দেবপুর রেলপথে দ্রুতগতির কমিউটার ট্রেন চালু, বাস রুট রেশনালাইজেশন, বিআরটি ও অন্যান্য সাশ্রয়ী পরিবহনব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি মেট্রোরেল প্রকল্পে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ব্যয় যাচাই, প্রকল্পের জীবনচক্র ব্যয় প্রকাশ, দরপত্র ও চুক্তির তথ্য উন্মুক্ত করা এবং প্রকল্প অনুমোদনের আগে বিকল্প পরিবহনব্যবস্থার স্বাধীন লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
আইপিডি আরও বলেছে, মেট্রোরেল ও বাস টার্মিনালের সঙ্গে ফুটপাত, সাইকেলপথ ও নিরাপদ পথচারী সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পূর্বাচল, উত্তরা, কেরানীগঞ্জ ও সাভার-ধামরাই এলাকায় উপকেন্দ্রভিত্তিক উন্নয়ন এবং পরিবহন ও ভূমি ব্যবহারের সমন্বিত পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। এতে কেন্দ্রীয় ঢাকার ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে সমন্বিত ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।
মেট্রোরেল প্রকল্পে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে আইপিডির পক্ষ থেকে কয়েকটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
প্রতিযোগিতা ও দরপত্র কাঠামো সংস্কার
জাইকা বা অন্য কোনো দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতার শর্তের কারণে নির্দিষ্ট দেশের ঠিকাদার ও পরামর্শকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিশ্বব্যাপী উন্মুক্ত দরপত্র নিশ্চিত করা। দরপত্রের অপ্রয়োজনীয় প্রকৌশল ও চুক্তিভিত্তিক যোগ্যতার শর্ত শিথিল করে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সক্ষম ঠিকাদারদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো এবং সাব-কন্ট্রাক্টিং ও সিভিল ওয়ার্কসে দেশীয় প্রকৌশলী ও প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা।
ব্যয় যাচাই ও তথ্য প্রকাশ: প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ও দরপত্রের মূল্যের বড় ধরনের পার্থক্য রোধে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে তৃতীয় পক্ষের ব্যয় যাচাই করা। পাশাপাশি নির্মাণ ব্যয়ের সঙ্গে আগামী ২০ থেকে ৩০ বছরের পরিচালন ব্যয়, ঋণের কিস্তি, ভর্তুকি ও সম্ভাব্য টিকিটের মূল্যসহ জীবনচক্র ব্যয় প্রকাশ করা। প্রতিটি প্যাকেজের দরপত্র, চুক্তি, ব্যয়, সময়সীমা ও বাজেট সংশোধনের কারণ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
মেগা প্রকল্পের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ
নতুন মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদনের আগে বাস রুট রেশনালাইজেশন, বিআরটি, লাইট রেল, কমিউটার রেলসহ কম ব্যয়ের বিকল্পগুলোর স্বাধীন লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণ বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বারবার বাড়ার কারণ অনুসন্ধান করে দায় নির্ধারণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বাস ও রেল ব্যবস্থার উন্নয়ন: ঢাকার বিচ্ছিন্ন বাসগুলোকে ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থার আওতায় এনে প্রাতিষ্ঠানিক বাস কোম্পানি গঠন এবং প্রধান সড়কে ডেডিকেটেড বাস লেন চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি তেজগাঁও, বনানী, মহাখালী ও টঙ্গী করিডোরের বিদ্যমান রেলপথ উন্নয়ন করে উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির কমিউটার ট্রেন চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা
মেট্রোরেল ও বাস টার্মিনালের সঙ্গে পথচারীবান্ধব ফুটপাত, সাইকেল লেন ও নিরাপদ সংযোগ স্থাপন করে প্রথম ও শেষ মাইলের যোগাযোগ নিশ্চিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে মেট্রোরেল, বাস, রেল ও অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
বিকেন্দ্রীকরণ ও ভূমি ব্যবহারের সমন্বয়: মেট্রো স্টেশনকেন্দ্রিক পরিকল্পিত নগরায়ণ, মিশ্র ভূমি ব্যবহার এবং সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি পূর্বাচল, উত্তরা, কেরানীগঞ্জ ও সাভার-ধামরাই এলাকায় উপকেন্দ্রভিত্তিক উন্নয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে কেন্দ্রীয় ঢাকার ওপর পরিবহন ও জনসংখ্যার চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
সড়ক, বাস, রেল ও মেট্রোরেল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষকে একক পরিবহন নীতি-নির্ধারক হিসেবে শক্তিশালী করার প্রস্তাব করেছে আইপিডি। একই সঙ্গে নতুন প্রতিটি পরিবহন অবকাঠামোর ক্ষেত্রে মেট্রোরেল বা অন্য কোনো ব্যয়বহুল প্রযুক্তি বেছে নেওয়ার আগে বিআরটি, লাইট রেলসহ সাশ্রয়ী বিকল্পগুলোর কারিগরি ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।
এএইচ/এআরএম




