শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

প্রতিবন্ধীদের কণ্ঠস্বরেই তৈরি হবে অধিকারভিত্তিক পরিবর্তন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫৭ পিএম

শেয়ার করুন:

প্রতিবন্ধীদের কণ্ঠস্বরেই তৈরি হবে অধিকারভিত্তিক পরিবর্তন

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাদের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি বিদ্যমান ব্যবস্থা ও সেবাগুলোকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রবেশগম্যতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে ভিজুয়ালি ইমপেয়ার্ড পিপলস সোসাইটির (ভিআইপিএস) ইভেন্ট অর্গানাইজার শাহজাদী রিহাস সাবা বলেছেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা তৈরি করাই সমাধান নয়, বরং বিদ্যমান ব্যবস্থা ও সেবাগুলোকে সবার জন্য ব্যবহারযোগ্য করে তোলাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। সচেতনতা থেকে সক্ষমতা, সক্ষমতা থেকে কণ্ঠস্বর এবং কণ্ঠস্বর থেকে পরিবর্তনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই পরিবর্তন আনা সম্ভব।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ঢাকার আদাবরের রিং রোডের হোয়াইট প্যালেস কনভেনশন হলে সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠীর তৃণমূল সম্মেলন শীর্ষক সচেতনতামূলক সভায় তিনি মূল প্রবন্ধে এসব বিষয় তুলে ধরেন। ভিআইপিএস, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও ক্রিশ্চিয়ান এইডের সহযোগিতায় আয়োজিত সভায় শাহজাদী রিহাস সাবা মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রম, অর্জন, বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

শাহজাদী রিহাস সাবা বলেন, কোনো একটি ব্যবস্থা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকলেই সেটি প্রকৃত অর্থে সবার জন্য প্রবেশগম্য হয়ে যায় না। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কোনো ব্যক্তি ব্যাংকে গিয়ে সেবা নিতে চাইলে যদি প্রয়োজনীয় ফরম তার জন্য ব্যবহারযোগ্য না হয় কিংবা কোনো মোবাইল অ্যাপের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও বোতাম পর্দা পাঠকের মাধ্যমে ব্যবহার করা না যায়, তাহলে সমস্যাটি ওই ব্যক্তির নয়; বরং ব্যবস্থাটির।

তিনি জানান, শুধু অধিকার সম্পর্কে জানলেই পরিবর্তন আসে না, আবার শুধু অ্যাডভোকেসি করেও পরিবর্তন নিশ্চিত করা যায় না। মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি, সংগঠনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সামাজিক পর্যায়ে অ্যাডভোকেসি এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে বিষয়গুলোকে নীতিগত সিদ্ধান্তের পর্যায়ে নিয়ে যেতে হয়। অর্থাৎ সচেতনতা থেকে সক্ষমতা, সক্ষমতা থেকে কণ্ঠস্বর এবং কণ্ঠস্বর থেকে পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

তিনি আরও জানান, প্রকল্পের কাজ মূলত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছে। মানুষ তার অধিকার সম্পর্কে জানে কি না, সংগঠন সেই অধিকার নিয়ে কার্যকরভাবে কাজ করার সক্ষমতা রাখে কি না এবং বিদ্যমান ব্যবস্থা সেই অধিকার বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত কিনা— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শিক্ষা, বিচারব্যবস্থা, ব্যাংকিং, সরকারি সেবা, সচেতনতা ও সাংগঠনিক সক্ষমতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মোট ছয় হাজার ৫৪৯ জনের কাছে পৌঁছানোর তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, এর মধ্যে প্রত্যক্ষভাবে দুই হাজার ৫৫৯ জন এবং পরোক্ষভাবে তিন হাজার ৯৯০ জন উপকারভোগী ছিলেন। তবে এই সংখ্যাগুলোকে শুধু প্রকল্পের উপকারভোগীর হিসাব হিসেবে দেখলে প্রকৃত পরিবর্তনের বিষয়টি বোঝা যাবে না। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে কোনো ব্যক্তির নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া, সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে নিজের কথা বলতে পারা কিংবা সংগঠনের মাধ্যমে নিজের কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করার অভিজ্ঞতা।

প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম তুলে ধরে শাহজাদী রিহাস সাবা বলেন, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষকরাও ব্রেইল পাঠ্যপুস্তক পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এর মাধ্যমে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষকদের নিজেদের প্রয়োজনের জন্য আলাদাভাবে পিছিয়ে থাকার পরিস্থিতি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও জানান, সহায়ক প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও নীতিগত অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরে ২৫টি সহায়ক প্রযুক্তি ও উপকরণের জন্য এইচএস কোড এবং কর হ্রাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও উপকরণ সহজলভ্য করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Disable

মূল প্রবন্ধে অ্যাডভোকেসির ফলাফল সম্পর্কে শাহজাদী রিহাস সাবা বলেন, অ্যাডভোকেসির ফল সব সময় তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না। কখনো একটি সভার ফল আসে সিদ্ধান্তে, কখনো সেই সিদ্ধান্তের ফল আসে নীতিতে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই নীতির সুফল শেষ পর্যন্ত একজন মানুষের জীবনে পৌঁছায়। তাই একটি নীতি পরিবর্তনের জন্য ধারাবাহিকভাবে প্রমাণ উপস্থাপন, কারিগরি তথ্য, নীতিগত সংলাপ, অনুসরণ, প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয়।

ভবিষ্যৎ করণীয় তুলে ধরে শাহজাদী রিহাস সাবা বলেন, সামনে শক্তিশালী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন গড়ে তোলা, অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং ও ডিজিটাল অর্থসেবা নিশ্চিত করা, সহায়ক প্রযুক্তিকে আরও সহজলভ্য করা, কার্যকর আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা এবং মর্যাদাপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে অংশীদারত্বকে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজে লাগাতে হবে।

তিনি আরও বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার প্রতিষ্ঠা কোনো একটি সংগঠনের একক দায়িত্ব নয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তাদের সংগঠনের পাশাপাশি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অংশীজন এবং পুরো সমাজকে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে হবে। প্রতিষ্ঠান, নীতি, সেবা ও অধিকার— এই চারটি ক্ষেত্রকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে পারলে পরিবর্তন আরও টেকসই হবে।

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তরিকুল ইসলাম, সভাপতিত্ব করেন ভিআইপিএসের সভাপতি অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন মজুমদার।

এ ছাড়া আরও উপস্থিত ছিলেন ভিআইপিএসের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এ আমিন, ব্লাইন্ড এডুকেশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের নির্বাহী পরিচালক মো. সাইদুল হক, ভিআইপিএসের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান অমিত, ঢাকার সমাজসেবা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থাপক তাসলিমা আক্তার এবং আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহেদুল ইসলামসহ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা।

এএইচ/এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর